আমেরিকার অতীতের এই ভাবমূর্তি উদার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৌলবাদী ইতিহাস ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রতি-সংস্কৃতির ফল। সকলেই পতন ও আমেরিকান ধার্মিক সূচনা থেকে অবনতি প্রত্যক্ষ করেছিল: সুপ্রিম কোর্টের রুলিংস, সামাজিক উদ্ভাবন ও অ্যাবরশনের আইন ‘মুক্তির’ নামে সেক্যুলারাইজেশনকে প্রশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭০-র দশকের শেষ নাগাদ মৌলবাদীরা বুঝতে শুরু করেছিল যে তাদেরও একই দোষ স্বীকার করে নিতে হবে।১১৯ স্কোপস ট্রয়ালের পর পিছু হটে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখে সেক্যুলার মানবতাবাদীদের ফাঁকা মাঠে দাবড়ে বেড়াতে দিয়েছে তারা। এখন নৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি অঙ্গীকারের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তারা। ১৯৭০ দশকের গোড়ার দিকে টিম লাহাই কখনওই মৌলবাদীদের রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কথা বলেননি, কিন্তু দশকের শেষ নাগাদ তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, মানবতাবাদীরা কয়েক বছরের মধ্যেই ‘আমেরিকাকে ধ্বংস’ করে দেবে ‘যদি না ক্রিশ্চানরা গত তিনটি দশক যেমন ছিল তারা তারচেয়ে নৈতিকতা ও শোভনতার পক্ষে লড়াই করার জন্যে আরও নিশ্চিত হয়ে ওঠার ইচ্ছা করে। ১২০
মৌলবাদীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা অন্যতম উপাদান ছিল তাদের প্রিমিলেনিয়লিজমঃ পৃথিবী যেহেতু অভিশপ্ত, একে সংস্কার করার কোনও অর্থ নেই। কিন্তু এখানেও একটা পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। ১৯৭০ সালে হাল লিন্ডসে দারুণ সফল একটি বই বের করেন, যার নাম ছিল দ্য লেট গ্রেট প্ল্যানেট আর্থ, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এটি ২৮ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। গতিশীল হাল নাগাদ ভাষায় পুরোনো প্রিমিলেনিয়াল ধারণাকে নতুন করে তুলে ধরেছে বইটি। অন্তিমকালে আমেরিকার কোনও বিশেষ ভূমিকা দেখতে পাননি লিন্ডসে, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহে আসন্ন সমাপ্তির ‘লক্ষণ’ শনাক্ত করেই ক্রিশ্চানদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু ১৯৭০-র দশকের শেষের দিকে তিনি টিম লাহাইয়ের মতো মত পাল্টে ফেলেন। দ্য নাইন্টিন এইটিজ, কাউন্টডাউন টু আর্মাগেদন-এ তিনি যুক্তি দেখান, আমেরিকার কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এলে গোটা সহস্রাব্দ জুড়েই সে বিশ্বশক্তি হিসাবে টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু তার মানে আমাদের অবশ্যই সক্রিয়ভাবে নাগরিক ও ঈশ্বরের পরিবারের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের সক্রিয় হতে হবে, এমন সব কর্মকর্তাদের নির্বাচিত করতে হবে যারা কেবল বাইবেলের নৈতিকতারই প্রতিফলন ঘটাবেন না, বরং আমাদের দেশ ও আমাদের জীবনধারাকে রক্ষা করার জন্যে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ নীতি নির্ধারণ করবেন।১২১
মৌলবাদীরা প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ করার মতো প্রতিপক্ষ ছিল তাদের। আমেরিকার কেমন হওয়া উচিত তার উদারপন্থী ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ছবি এবং শত ভয় সত্ত্বেও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ক্রুসেডে সফল হওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি তারা রাখে।
১৯৭০-র দশকের শেষের দিকে আমেরিকার প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা অনেক উঁচু প্রোফাইল ও বৃহত্তর আত্মবিশ্বাসের অধিকার লাভ করে। এটা ছিল ১৯৮০-র দশকে তাদের সংগঠিত হওয়ার তৃতীয় কারণ। তারা আর স্কোপস ট্রায়াল থেকে পালিয়ে বনে আশ্রয় নেওয়া দুর্বল বনবাসী ছিল না। সমাজকে সম্ভাব্য খোলামেলা করে তোলা প্রাচুর্য তাদেরও প্রভাবিত করেছিল। দক্ষিণের নব জাগরণ ও সেখানে মৌলবাদের উত্থান অনেকের মনেই এই ধারণা সৃষ্টি করেছিল যে এখন তাদের পক্ষে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। ১৯৬০-র দশকের দিক থেকেই উদারপন্থী মুলধারার গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংখ্যা কমে আসার কথা জানা ছিল তাদের, যেখানে ইভাঞ্জেলিকাল চার্চের সংখ্যা পাঁচ বছরে ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। ১২২ ক্রিশ্চান ধর্মকে মোড়কবদ্ধ করে বিপননের বেলায় টেলিভেঞ্জালিজমও অনেক দক্ষ হয়ে উঠেছিল। জনগণের জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন ঈশ্বরকে যেন আবার নাটকীয় ও স্পষ্ট উপস্থিতি দিয়েছে বলে মনে হয়েছে। পর্দায় পেন্টাকোস্টালিস্ট যাজক ওরাল রবার্টসকে আপাতদৃষ্টিতে অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের সারিয়ে তুলতে দেখে ঐশী শক্তিকে সক্রিয় হতে দেখেছে তারা। সপ্তাহে ১০০,০০০ আত্মাকে রক্ষা করার দাবিকারী দারুণ শক্তিমান টেলিভেঞ্জালিস্ট জিমি সোয়াগার্টকে রোমান ক্যাথলিক, সমকামী ও সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর ভাষায় মুখখিস্তি করতে দেখে কেউ একজন তাদের ভাবনাকেই প্রকাশ্যে ভাষা দিচ্ছে বলে মনে হয়েছে। প্যাট রবার্টসন বা বাক্কাররা প্রতি সপ্তাহের অনুষ্ঠানে চাঁদা হিসাবে অনেক টাকা সংগ্রহ করতে পারছেন জানতে পেরে মৌলবাদীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ঈশ্বরই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান। তারা জোরের সাথে বলেছেন যে, পেতে হলে ক্রিশ্চানদের অবশ্যই দান করতে হবে। ঈশ্বরের রাজ্যে, রবার্টসনের মতে, ‘কোনও অর্থনৈতিক মন্দা নেই, নেই কোনও ঘাটতি। ১২৩ এটা এমন এক সত্যি দশটি ক্রিশ্চান টেলিভিশন সাম্রাজ্যের সাফল্য যার সাক্ষ্য দিয়েছে বলে মনে হয়েছে, প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার আয় করত এগুলো, হাজারের বেশি লোককে চাকরি দিয়েছে ও দারুণ পেশাদারি পণ্য হাজির করেছে। ১২৪
