কিন্তু প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা সেক্যুলার মানবতাবাদীদের এই সংজ্ঞাকে মোটেই ক্যারিকেচার ভাবেনি। সেক্যুলার মানবতাবাদকে নিজস্ব ক্রিড, নিজস্ব লক্ষ্য ও একটি সুনির্দিষ্ট সংগঠন বিশিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্ম মনে করেছে তারা। এই বিশ্বাসের পক্ষে সমর্থন হিসাবে সুপ্রিম কোর্টের তোরকাসো বনাম ওয়াটকিন্স মামলার রায়ের পাদটীকার শরণ নিয়েছে তারা, যেখানে স্পষ্টভাবে ‘সাধারণভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস বিবেচিত বিষয়ের শিক্ষা দেয় না’ যেমন বুদ্ধধর্মমত, তাওবাদ, ও নৈতিক সংস্কৃতির মতো সেইসব বিশ্ব ধর্মের ভেতর ‘সেক্যুলার মানবতাবাদকে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।১৬ মৌলবাদীরা পরে রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদের মতো সরকার ও আইন প্রণেতাদের অনুসৃত ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’-এর মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে কঠোরভাবে জনগণের জীবন থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলার সময় একে কাজে লাগাবে।
অবশ্য সেক্যুলার মানবতাবাদ সম্পর্কে মৌলবাদী এই পূর্বধারণাকে ষড়যন্ত্র বা উদারনৈতিক প্রবণতাকে খাট করার লক্ষ্যে গৃহীত মেধাবী বিকৃতি মনে করা ভুল হবে। ‘সেক্যুলার উদারবাদ’ পরিভাষাটি এবং এর পক্ষের সমস্ত কিছুই মৌলবাদীদের ভয়াবহ ভীতিতে পূর্ণ করে তোলে। একে অশুভ শক্তির ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখে তারা, অন্যতম দ্রুতপ্রজ মৌলবাদী আদর্শবাদী টিম লাহাইয়ের ভাষায় যা ‘ঈশ্বর বিরোধী, নৈতিকতা বিরোধী, আত্মসংযম বিরোধী ও আমেরিকা বিরোধী।’ সেক্যুলার মানবতাবাদ একটি ক্ষুদে ক্যাডারে পরিচালিত হয়, ‘ক্রিশ্চানিটি ও আমেরিকান পরিবারকে ধ্বংস করার জন্যে’১০৭ এরা সরকার, সরকারী স্কুল ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে। ৬০০ মানবতাবাদী সিনেটর, কংগ্রেসম্যান এবং কেবিনেট মন্ত্রী রয়েছেন, আছে প্রায় ২৭৫,০০০ আমেরিকান সিভিল রাইটস ইউনিয়ন। ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর উওম্যান, ট্রেড ইউনিয়নসমূহ, দ্য কার্নেগি, ফোর্ড এবং রকেফেলার ফাউন্ডেশনসমূহ ও সকল ইউনিভার্সিটি ও কলেজও ‘মানবতাবাদী’। আইন প্রণেতাদের পঞ্চাশ ভাগ সেক্যুলার মানবতাবাদের ধর্মের প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ।১০৮ বাইবেল ভিত্তিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকা এখন সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, এই বিপর্যয়ের জন্যে জন হোয়াইটহেড (রক্ষণশীল রাদারফোর্ড ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট) প্রথম সংশোধনীর ব্যাপক ভ্রান্ত পাঠকে দায়ী করেছেন। হোয়াইটহেড বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে রক্ষা করার জন্যে জেফারসনের ‘বিচ্ছিন্নতার প্রাচীর’ প্রণীত হয়েছিল, উল্টোটি নয়।১০৯ কিন্তু এখন মানবতাবাদী বিচারকগণ রাষ্ট্রকেই উপাসনার বস্তুতে পরিণত করেছেন। “রাষ্ট্রকে সেক্যুলার হিসাবে দেখা হচ্ছে,’ যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, কিন্তু ‘রাষ্ট্র ধার্মিক, কারণ এর “পরম লক্ষ্য” খোদ রাষ্ট্রের স্থায়ীকরণ।’ সুতরাং সেক্যুলার মানবতাবাদ ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল, এবং এর রাষ্ট্রের উপাসনা বহুঈশ্বরবাদীতা।১১০
ষড়যন্ত্র কেবল আমেরিকার সমাজে সম্পূর্ণভাবে অনুপ্রবেশ করেনি, বরং বিশ্বকেই দখল করে নিয়েছে। মৌলবাদী লেখক প্যাট ব্রুকসের চোখে সেক্যুলার মানবতাবাদীরা “এক নতুন বিশ্বব্যবস্থায়” এক বিশাল বিশ্ব সরকার গঠনের নিজ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলা “বিশাল ষড়যন্ত্রমূলক নেটওয়ার্ক” গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বকে দাসত্বে পর্যবসিত করবে’১১১ অন্য মৌলবাদীদের মতো সর্বত্রই দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়া শত্রুকে দেখতে পেয়েছেন ব্রুক্স। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ওয়াল স্ট্রিট, যায়নবাদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকাণ্ডে তিনি এর কাজ দেখেছেন। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এই চক্রে রথশচাইল্ডস, রকেফেলার, কিসিঙ্গার, ব্রেযনিস্কি, শাহ এবং সাবেক পানামিয় স্বৈরাচার ওমর তোরিজো অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।১১২ সেক্যুলার মানবতাবাদের ত্রাস ছিল আমাদের আলোচিত অন্য বিকৃত ফ্যান্টাসির মতোই অযৌক্তিক ও সামাল দেওয়ার অতীত, এবং বিনাশের ভীতি থেকে এর উদ্ভব। আধুনিক সমাজ সম্পর্কে প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণভাবে ও বিশেষ করে আমেরিকায় ইসলামিস্টদের মতোই দানবীয়। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রাঙ্কি শেফারের চোখে পাশ্চাত্য পা বাড়াতে প্রস্তুত হয়েছে এক ইলেক্ট্রনিক অন্ধকার যুগে, যেখানে নতুন পৌত্তলিক বাহিনী তাদের হাতের সমস্ত প্রযুক্তিগত শক্তি নিয়ে সভ্য মানবতার শেষ শক্ত ঘাঁটিটি ধ্বংস করার দ্বারপ্রান্তে হাজির হয়েছে। আমাদের সামনে পড়ে আছে অন্ধকারের এক দৃশ্যপট। আমরা ক্রিশ্চান পাশ্চাত্য লোকদের পেছনে ফেলে যাবার সময় সামনে কেবল এক অন্ধকার উত্তাল হতাশার সাগরই বিছিয়ে আছে…যদি আমরা যুদ্ধ না করি। ১১৩
ইহুদি ও মুসলিম মৌলবাদীদের মতো আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরাও তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বলে ভেবেছে, বাঁচতে হলে যুদ্ধ ছাড়া গতি নেই।
উদারপন্থী মুসলিমদের পক্ষে যেমন সায়ীদ কুতবের আধুনিক জাহিলি নগরী শনাক্ত করা কঠিন ছিল ঠিক তেমনি আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের ফুটিয়ে তোলা আমেরিকার ছবি মূলধারার উদারপন্থীদের চেয়ে ব্যাপকভাবে ভিন্ন ছিল। মৌলবাদীরা নিশ্চিত ছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঈশ্বরের আপন রাষ্ট্র, কিন্তু তারা অন্য আমেরিকানদের অত্যন্ত প্রিয় ও প্রশংসিত মূল্যবোধসমূহকে ধারণ করে বলে মনে হয়নি। আমেরিকান ইতিহাস সম্পর্কে লেখার সময় তারা প্রায় সকলেই নস্টালজিকভাবে পিউরিটান প্রিলগ্রিম ফাদারদের শরণাপন্ন হয়েছে, কিন্তু কেবল সেইসব গুণেরই তারিফ করেছে যেগুলো উদারপন্থীদের কাছে মোটেই পছন্দনীয় নয়। পিউরিটানরা নিউ ইংল্যান্ডে কী ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস পেয়েছিল? প্রশ্ন তুলেছেন প্লাইমাউথ রক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রাস ওয়াল্টন। ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র? জীবন গেলেও না! আদি আমেরিকানরা নতুন বিশ্বে এমন কোনও ধারণাই সাথে করে আনেনি,’ অনুমোদনের ভঙ্গিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।১১৪ মুক্তির কথা ভাববার সময়ও ছিল না পিউরিটানদের, ‘গির্জা ও রাষ্ট্রে’ ‘অন্যদের সঠিক পথে কাজ করতে বাধ্যকারী’১১৫ ‘সঠিক সরকার প্রতিষ্ঠা’র ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিল তারা। একইভাবে বিপ্লবকে ‘গণতান্ত্রিক’ মনে করা হয়নি। আমেরিকান ইহুদি ও মুসলিম প্রতিপক্ষের মতো একই কারণে প্রটেস্টট্যান্ট মৌলবাদীরা গণতন্ত্রকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। প্যাট রবার্টসনের মতে, আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের ফাউন্ডিং ফাদারগণ ছিলেন কালভিনিস্ট, বাইবেলিয় আদর্শে অনুপ্রাণিত। তার ফলেই আমেরিকান বিপ্লব ফরাসী বা রাশিয়ান বিপ্লবের পথ ধরা থেকে রক্ষা পেয়েছে। আমেরিকান বিপ্লবীরা গণমানুষের শাসনের কথা ভাবতেই যাননি, তাঁরা এমন এক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসন করবে ও সাম্যের প্রবণতা বাইবেলিয় আইনে নিয়ন্ত্রিত হবে।১১৬ ফাউন্ডিং ফাদারগণ নিশ্চিতভাবেই একটি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ যা ইচ্ছে করতে পারবে, এমন খাঁটি, প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাননি।’১১৭ সরকার তার নিজস্ব আইন বাস্তবায়ন করছে, এমন ধারণায় মুসলিম মৌলবাদীদের মতোই সমান আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল তারা: সংবিধান [ঈশ্বরের] আইনের চেয়ে উন্নতর আইন প্রণয়ন করার অধিকার রাখে না, কেবল মানুষের উপলব্ধি ও অনুসরণের যোগ্য মৌল বিধিবিধানই পরিচালনা করতে পারে।’১১৮
