এক নতুন ধরনের তাগিদ দেখা দিয়েছিল। লোকজন মনে করেছে যে সত্যিকারের ধর্ম ধ্বংসের পথে। ক্রিশ্চানরা পাল্টা যুদ্ধ না করলে হয়তো বিশ্বাসীদের আরেকটি প্রজন্ম নাও থাকতে পারে। ১৯৭০-র দশকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক বাবা-মা পাবলিক স্কুল থেকে তাদের ছেলেমেয়েদের ক্রিশ্চান প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নিয়েছেন, যেখানে তাদের ক্রিশ্চান মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া যাবে, তাদের সামনে ক্রিশ্চান রোল মডেল খাড়া করা যাবে ও যেখানে সকল শিক্ষাই বাইবেলিয় প্রেক্ষিতেই সম্পন্ন হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৩ সালের ভেতর এইসব ইভাঞ্জেলিকাল স্কুলে ভর্তির সংখ্যা ছয়গুণ বেড়ে উঠেছিল আর প্রায় ১০০,০০০ মৌলবাদী শিশুকে বাড়িতেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।১০২ স্বাধীন ক্রিশ্চান স্কুল আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। এর আগে পর্যন্ত মৌলবাদী স্কুলগুলো বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন থাকলেও ১৯৭০-র দশকে এরা শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিবিধান পর্যালোচনা, ইনস্যুরেন্স প্যাকেজ সৃষ্টি, শিক্ষকদের নিয়োগ সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ও ফেডারেল পযায়ে লবিং গ্রুপ হিসাবে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্থা গঠন শুরু করে। এগুলোর বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ১৯৯০-র দশক নাগাদ আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অভ ক্রিশ্চান স্কুলস-এর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩৬০, অন্যদিকে অ্যাসোসিয়েশন অভ ক্রিশ্চান স্কুল ইন্টারন্যাশনালের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৯৩৯।১০৩ আমাদের বিবেচিত আরও অন্যান্য স্কুল, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো ‘হলিস্টিক’ শিক্ষার জন্যে একটা আকাঙক্ষা কাজ করছিল যেখানে সমস্ত কিছু-দেশপ্রেম, ইতিহাস, নৈতিকতা, রাজনীতি ও অর্থনীতি-ক্রিশ্চান প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যাবে। আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত সাফল্য মনে করা হয়েছে (যদিও সাধারণভাবে এটা সরকারী পর্যায়ে শিক্ষার তুলনায় ভালোই ছিল)। এটা ছিল অঙ্গীকারাবদ্ধ ও প্রয়োজনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্যুলারাইজেশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত উগ্র ক্রিশ্চানদের তৈরি করার ‘হটহাউস’ পরিবেশ। উদাহরণ স্বরূপ, আমেরিকার ক্রিশ্চান ইতিহাস পাঠ করেছে তারা, আব্রাহাম লিংকন ও জর্জ ওয়াশিংটনের মতো ব্যক্তিত্বদের ধর্মীয় পরিচয় পরখ করেছে, এবং কেবল সেইসব সাহিত্য ও দর্শনই পাঠ করেছে যেগুলো বাইবেলের সাথে ‘যথেষ্ট’ খাপ খায় ও বাইবেলিয় পারিবারিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়। ১০৪
আমরা যেমন দেখেছি, কার্যকরভাবে সংগঠিত হওয়ার লক্ষ্যে কোনও একটি গ্রুপের স্পষ্টভাবে শত্রুকে সংজ্ঞায়িত করে এমন একটি আদর্শের প্রয়োজন। ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদী আদর্শবাদীরা শত্রুকে ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। ‘পাশ্চাত্যের’ সেক্যুলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ইসলামপন্থী ও কুকবাদীদের বিপরীতে আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরা ভয়ঙ্কর রকম দেশপ্রেমিক ছিল, তাদের সামনে এমন সহজ কোনও লক্ষ্যবস্তু ছিল না। ‘ঘরের শত্রুর’ বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে। বছর পরিক্রমায় ‘সেক্যুলার মানবতাবাদ’ এক পিণ্ডারি শব্দে পরিণত হয়েছিল, মৌলবাদীরা তাদের অপছন্দের যেকোনও মূল্যবোধ বা বিশ্বাসকে এই তকমা এঁটে দিতে পারত। যেমন এখানে উদাহরণ হিসাবে ‘প্রো-ফ্যামিলি ফোরামের’ (এন.ডি.) দেওয়া মানবতাবাদের সংজ্ঞা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা:
ঈশ্বরের প্রভুত্ব, বাইবেলের অনুপ্রেরণা ও জেসাস ক্রাইস্টের ঐশ্বরিকতা অস্বীকার করে।
আত্মার অস্তিত্ব, মৃত্যু পরবর্তী জীবন, নিষ্কৃতি এবং স্বর্গ ও নরকের শাস্তি অস্বীকার করে।
সৃষ্টির বাইবেলিয় বিবরণ অস্বীকার করে।
বিশ্বাস করে যে পরম, সঠিক, ভ্রান্তি বলে কিছু নেই নৈতিক মূল্যবোধ স্বনির্ধারিত এবং পরিস্থিতি নির্ভর। নিজের কাজ নিজে করো, “যতক্ষণ না অন্যের ক্ষতি করছে।’
নারী-পুরুষের পৃথক ভুমিকার অপসারণে বিশ্বাস করে।
বয়স নির্বিশেষে সম্মত ব্যক্তিদের ভেতর প্রাক-বিবাহ যৌনতাসহ যৌন স্বাধীনতা, সমকামীতা, লেসবিয়ানিয়াজম ও অবৈধ সম্পর্কে বিশ্বাস করে। গর্ভপাত, ইউথানাশিয়া ও আত্মহত্যায় বিশ্বাস করে।
দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সাম্যতা প্রতিষ্ঠা করতে আমেরিকার সম্পদের সম বণ্টনে বিশ্বাস করে।
পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ, শক্তি নিয়ন্ত্রণ ও এর সীমাবদ্ধতায় বিশ্বাস করে।
আমেরিকান দেশপ্রেম বিনাশ, স্বাধীন উদ্যোগ ব্যবস্থা, নিরস্ত্রীকরণ ও একক বিশ্ব ব্যবস্থার সমাজতান্ত্রিক সরকার সৃষ্টিতে বিশ্বাস করে।১০৫
সম্ভবত সামান্য প্রভাব বিশিষ্ট সংগঠন আমেরিকান হিউম্যানিস্ট সোসায়েটি নামে এক সংগঠনের প্রথম ও দ্বিতীয় ইশতেহার থেকে নেওয়া হলেও এই তালিকাকে ষাটের দশকে বিকাশ ঘটা উদারবাদী মানসিকতার মোটামুটি যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা হিসাবে ধরা যেতে পারে।
তবে অধিকাংশ মতাদর্শের ধারা অনুযায়ী অব্যশ্যই এটা ক্যারিকেচার ও উদারবাদের অতিরঞ্জিত সরলীকরণও ছিল। যৌন সাম্য বা সম্পদের সুষম বণ্টন- আকাঙ্ক্ষী সকল উদারপন্থীই নাস্তিক ছিল না। সমকামীদের অধিকারে বিশ্বাসী উদারপন্থীরা কোনওদিনই অবৈধ সম্পর্কের অনুমোদন দেয়নি। কোনও উদারপন্থী ‘সঠিক বা ভ্রান্তি বলে কিছু নেই’ এমন কথা মানবে না; বরং অতীতের নৈতিক মানদণ্ডের কিছু পরিমার্জনার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশ্বাস করত তারা। অতীতের বৈরী জাতিগুলোর ইউরোপিয় ইউনিয়ন বা জাতি সংঘের মতো সংস্থার মাধ্যমে কাছাকাছি আসার আকঙ্ক্ষা কোনওভাবেই ‘একক সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের’ আকাঙ্ক্ষার কথা বোঝায়নি। তবে এই তালিকাটি অনেক উদার ক্রিশ্চান ও সেক্যুলারিস্ট সমানভাবে যেসব মূল্যবোধকে স্বপ্রকাশিতভাবে ভালো মনে করবে (যেমন দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি বা পরিবেশের জন্যে উদ্বেগ) সেগুলোকে মৌলবাদীদের চোখে দারুণভাবে অশুভ মনে হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরার ক্ষেত্রে উপকারী। এমন মনে হতে পারে যে এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকটা ইরান ও ইসরায়েলের মতোই ‘দুই জাতি’ ছিল। আধুনিক সমাজ এমনভাবে মেরুকৃত হয়ে গিয়েছিল যে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানরত মানুষের পক্ষে পরস্পরকে বোঝাই কষ্টকর হয়ে পড়ছিল। উপসংস্কৃতি বড্ড বেশি বিচ্ছিন্ন ও পৃথক হওয়ায় অনেকেই এমনকি সমস্যাটা কোথায় সেটাই হয়তো বুঝতে পারেনি।
