দ্বিতীয় যে উপাদানটি বহু ঐতিহ্যবাদীকে মৌলবাদীতে পরিণত করার পথে চালিত করেছিল সেটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্রুত প্রসার। বিপ্লবের পর থেকেই আমেরিকানরা কেন্দ্রিভূত সরকারের বেলায় অবিশ্বাসী ছিল, প্রায়শঃই সেক্যুলারিস্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিতৃষ্ণা বোঝাতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে তারা। মৌলবাদীরা জেফারসনের জারি করা রাজনীতি ও ধর্মকে বিচ্ছিন্ন রাখার ‘বিচ্ছিন্নতার দেয়াল’ বিধান লঙ্ঘিত হওয়ার যুক্তিতে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সরকারী স্কুলে বাধ্যতামূলক প্রার্থনা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে ক্ষিপ্ত ছিল। সেক্যুলারিস্ট বিচারপতিগণ উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে, কর থেকে আহরিত অর্থ সংশ্লিষ্ট না থাকলেও, এবং এমনকি প্রার্থনা স্বেচ্ছামূলক ও গোষ্ঠীবাদের উর্দ্ধে হলেও স্কুলে প্রার্থনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সরকারের পক্ষে অসাংবিধানিক। ১৯৪৮, ১৯৫২ ও ১৯৬২ সালে এই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট সরকারী স্কুলে প্রথম সংশোধনীর ধর্মীয় ধারা উদ্ধৃত করে বাইবেল পাঠও নিষিদ্ধ করেন। ১৯৭০-র দশকে আদালত যেকোনও আইন (১) ধর্মকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে, (২) এর পরিণতিতে ইচ্ছা যাই হোক না কেন, ধর্মের প্রসার ঘটাতে চায় এবং সবশেষে (৩) সরকারকে তা ধর্মীয় বিষয়ে জড়াতে চাইলে তা বাতিল হয়ে যাবে ঘোষণা দিয়ে বেশ কয়েকটি রায় প্রদান করেন।১০ আদালত আমেরিকান সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান বহুত্ববাদের প্রতি সাড়া দিচ্ছিলেন; ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ধর্মের বিরুদ্ধে এর কোনও বিরাগ নেই, কিন্তু জোরের সাথে একে ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলেছেন।
এইসব সিদ্ধান্ত সেক্যুলারকরণ ছিল, কিন্তু এদের ধর্মকে প্রান্তিকায়িত করার নাসের বা শাহর প্রয়াসের সাথে তুলনা করা যাবে না। তাসত্ত্বেও মৌলবাদী ও ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিশ্চানরা সমানভাবে তাদের চোখে ঈশ্বরহীন ক্রুসেডে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এভাবে ধর্মকে আইন সঙ্গতভাবে সীমানা দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যাবে বলে বিশ্বাস করেনি তারা, কারণ ক্রিশ্চানিটির দাবি ছিল সামগ্রিক ও সার্বভৌম হতে হবে। আদালত (প্রথম সংশোধনীতে দাবিকৃত) ধর্মবিশ্বাসের ‘স্বাধীন প্রকাশের নীতি এমনকি ক্রিশ্চান নয় এমন ধর্মের উপরও বিস্তৃত করতে চাইছেন দেখে আক্রান্ত বোধ করেছে, সকল ধর্মকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার বিচারপতিদের নীতিগত প্রয়াসে ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ যেন ধর্মকে মিথ্যা বলারই শামিল মনে হয়েছে। ব্যক্তি জীবনে আদালতের মাত্রাতিরিক্ত ও নজীরবিহীন হস্তক্ষেপ মনে হওয়া ঘটনার সাথে মেলানো হলে ধর্মকে ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে মৌলবাদীদের কাছে আরও বেশি ভয়ানক ঠেকেছে। ইন্টারনাল রেভেনিউ সার্ভিস বিশেষ কতগুলো মৌলবাদী কলেজের নিয়মকানুন সরকারী নীতির বিরোধী যুক্তি দেখিয়ে দাতব্য কর অবকাশ সুবিধা প্রত্যাহারের হুমকি দিলে তাকে উদার নৈতিক সমাজের তরফ থেকে যুদ্ধ ঘোষণার মতো মনে হয়েছে। কেবল মৌলবাদীদেরই বিশ্বাসের নীতিমালার ‘স্বাধীন চর্চা’য় বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়েছে। ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে সুপ্রিম কোর্ট আফ্রো-আমেরিকানদের ভর্তি না করায় উত্তর ক্যারোলিনার গোল্ডবরো ক্রিশ্চান স্কুল এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী না হলেও বাইবেলে নিষিদ্ধ দাবি করে ক্যাম্পাসে আন্তবর্ণ ডেটিং বাতিল করার কারণে বব জোন্স ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে দেওয়া আইআরএস রুলিংয়ের প্রত্যয়ন করে।
এটা ছিল ১৯২৫ সালের স্কোপস ট্রায়ালের অনুরূপ দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ ব্যবস্থার সংঘাত। দুই পক্ষই বিশ্বাস করছিল, তারাই চূড়ান্তভাবে সঠিক। গোটা জাতি সম্পূৰ্ণ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ক্রমবর্ধমানহারে ১৯৬০-ও দশকের শেষে ও ১৯৭০-র দশকে রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার সংক্রান্ত ধারণা প্রসারিত করার সাথে সাথে আধুনিক সমাজের একেবারে প্রান্তে অবস্থানরত রক্ষণশীল ক্রিশ্চানরা এইসব হস্তক্ষেপকে সেক্যুলার আক্রমণ হিসাবে অনুভব করেছে। নিজেদের ম্যানহাটান, ওয়াশিংটন ও হার্ভার্ডের ‘উপনিবেশ’ ভাবতে শুরু করেছিল তারা। তাদের এই অভিজ্ঞতা বিদেশী শক্তির অধিকারে যাওয়ার ব্যাপারে তিক্তভাবে অসন্তোষ প্রকাশকারী মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশগুলোর চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না। মনে হচ্ছিল সরকার যেন পরিবারের অন্দর মহলে হানা দিয়েছে: নারীদের সমান চাকরির অধিকার দিয়ে আনা সাংবিধানিক সংশোধনীকে ‘নারীদের অবস্থান বাড়িতে’ বাইবেলের এই আদেশের মুখে চপেটাঘাত বলে মনে হয়েছে। আইন করে শিশুদের উপর শারীরিক আঘাত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যদিও বাইবেলে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, এভাবে সন্তানদের শৃঙ্খলা শেখানো বাবার দায়িত্বের ভেতর পড়ে। সমকামীদের সিভিল রাইটস ও বাক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল এবং অ্যাবর্শন বৈধ করা হয়েছিল। সান ফ্রান্সিস্কো, বস্টন, বা ইয়েলে উদারপন্থীদের চোখে যেসব সংস্কার ন্যায়সঙ্গত ও নৈতিক মনে হয়েছে সেগুলোই আরকান-স ও আলাবামার রক্ষণশীলদের কাছে পাপাচারপূর্ণ ঠেকেছে, যারা বিশ্বাস করত যে, ঈশ্বর অনুপ্রাণিত বাণীকে অবশ্যই অক্ষরে অক্ষরে ব্যাখ্যা ও অনুসরণ করতে হবে। উদার সমাজে নিজেদের মুক্ত ভাবতে পারেনি তারা। তারা যখনই ভাবতে গেছে যে ১৯২০-র দশকে এই রাজ্যগুলোর দুই তৃতীয়াংশই মদপানের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল কিন্তু এখন গোটা উত্তর আমেরিকা জুড়ে মানুষ মারিয়াহুনাকে বৈধতা দিতে প্রচারণা চালাচ্ছে, তখন কেবল এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পেরেছে যে স্যাটানের প্রভাবে আক্রান্ত হচ্ছে আমেরিকা। ১০১
