অবশ্য আর কোনও ক্ষেত্রে কুকবাদীরা তেমন এটা সাফল্য পায়নি। মহা হতাশার সাথে তারা লক্ষ করেছে যে নিষ্কৃতি থমকে গেছে। শ্রমিক দলীয় সরকার দখলিকৃত ভুমি অধিগ্রহণ করেনি, সামরিক বসতি স্থাপন করলেও শান্তির বিনিময়ে ভূমি ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা অব্যাহত ছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ইসরায়েলি আত্মতুষ্টিবোধের দিকে পরিচালিত করেছিল, কিন্তু ১৯৭৩ সালে অক্টোবর মাসে ইহুদি ক্যালেন্ডারে সবচেয়ে গম্ভীর দিন ইয়োম কিপ্পুর দিবসে (প্রায়শ্চিত্ত দিবস) তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, মিশর ও সিরিয়া ইসরায়েলিদের সম্পূর্ণ স্তম্ভিত করে সিনাই ও গোলান উপত্যকায় হামলা করে বসে। এবার অবশ্য আরবরা আগের চেয়ে ভালো ফল দেখায়। কেবল কষ্টেসৃষ্টেই আইডিএফ তাদের ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল। হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল ইসরায়েলিরা। গোটা দেশ জুড়ে হতাশা ও সন্দেহের একটা বোধ চেপে বসেছিল। অসতর্ক অবস্থায় আক্রান্ত হয়েছে ইসরায়েল। প্রায় পরাস্ত অবস্থাকে আদর্শগত অবক্ষয়েরই পরিণতি মনে হয়েছে। কুকবাদীরা এতে একমত হয়। ১৯৬৭ সালে ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই বিজয়কে পুঁজি না করে এবং দখলিকৃত এলাকা অধিগ্রহণ না করে ইসরায়েলি সরকার গড়িমসি করেছে ও গোয়িম, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করে তোলার ভয় করেছে। ইয়োম কিপ্পুরের যুদ্ধ ঈশ্বরের শাস্তি ও স্মারক। এবার ধার্মিক ইহুদিদের অবশ্যই জাতিকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসতে হবে। এক কুকবাদী র্যাবাই সেক্যুলার ইসরায়েলকে বীরের মতো যুদ্ধ করে রণক্ষেত্রে লুটিয়ে পড়া সৈনিকের সাথে তুলনা করেছিলেন। বিশ্বাসী ইহুদিরা, যারা কোনওদিনই ধর্মকে ত্যাগ করেনি, দায়িত্ব গ্রহণ করবে ও তাঁর সেই ব্রতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
ছয়দিনের যুদ্ধ কুকবাদীদের তাদের দর্শনের ব্যাপারে নিশ্চিত করে তাদের বেশ কয়েকটি বসতি স্থাপনের পথে পরিচালিত করেছিল, কিন্তু ইয়োম কিপ্পুরের যুদ্ধের আগে তাদের আন্দোলন আসলে তেমন গতি পায়নি। কুকবাদী র্যাবাই ইয়েহুদা আমিতাল রচিত একটি নিবন্ধ এই নতুন জঙ্গী মনোভাব তুলে ধরেছে। ‘দ্য মিনিং অভ দ্য ইয়োম কিপ্পুর ওয়ার’-এ আমিতাল বহু মৌলবাদী আন্দোলনের অন্তরে বিরাজ করা নিশ্চিহ্নতার ভীতি তুলে ধরেছে। অক্টোবরের হামলা সকল ইসরায়েলিকে ম্যপ্রাচ্যে তাদের বিচ্ছিন্নতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা তাদের রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্যে বদ্ধ পরিকর মনে হওয়া শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে হলোকাস্টের অপচ্ছায়া জেগে উঠেছিল। এবার আমিতাল ঘোষণা করলেন, পুরোনো যায়নবাদ ব্যর্থ। সেক্যুলার রাষ্ট্র ইহুদি সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। অ্যান্টি-সেমিটিজম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট। ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র পৃথিবীতে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়ানো একমাত্র দেশ,’ যুক্তি দেখান তিনি। ইহুদিদের ‘স্বাভাবিকীকরণের’ কোনও উপায় নেই, সেক্যুলার যায়নবাদীদের প্রত্যাশা মোতাবেক অন্যান্য জাতির মতো হতে পারবে না তারা। কিন্তু র্যাবাই ভি কুক প্রবর্তিত আরেক ধরনের যায়নবাদ ছিল, যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, নিষ্কৃতির প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুদ্ধকে আরও একটি ইহুদি বিপর্যয় হিসাবে দেখার বদলে একে বরং পরিশুদ্ধিকরণের একটা প্রক্রিয়া হিসাবে দেখা উচিত। যাদের যায়নবাদ শোচনীয়ভাবে অপর্যাপ্ত থাকায় জাতিকে প্ৰায় বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সেই সেক্যুলার ইহুদিরা ইহুদিবাদকে আধুনিক পশ্চিমের অভিজ্ঞতালব্ধ যুক্তিবাদ ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত করার প্রয়াস পেয়েছিল। এই বিদেশী প্রভাবকে অবশ্যই নিশ্চিহ্ন করতে হবে।৯৫
সেই সময়ের মিশর ও ইরানে বিকাশমান মৌলবাদের সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ এক তত্ত্বের কথা বলছিলেন আমিতাল। ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধকে ঈশ্বর ইহুদিদের ফের নিজেদের দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্যে সতর্ক করে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। ‘পাশ্চাত্য-আসক্ত’ ইসরায়েলের প্রতি প্রকৃত মূল্যবোধে ফিরে আসার স্মারক ছিল এটা। সুতরাং, তা মেসিয়ানিক প্রক্রিয়ার একটা অংশ, পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধ। কিন্তু স্রোত ফিরে গেছে। যুদ্ধ এটাও দেখিয়েছে যে, কেবল ইহুদিরাই বেঁচে থাকার জন্যে সংগ্রাম করছে না। এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে, আমিতালের বিশ্বাস ছিল, জেন্টাইলরাও চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ইহুদি রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবন ও সম্প্রসারণ তাদের দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ঈশ্বর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন, স্যাটানের কোনও অবকাশ নেই, এবং ইসরায়েল অসাম্যের শক্তিকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ইসরায়েল ভুমি জয় করেছে; এখন নিষ্কৃতির আগে কেবল ইহুদিদের আত্মা থেকে পশ্চিমা সেক্যুলার চেতনায় অবশেষটুকুও নিশ্চিহ্ন করা বাকি। তাদের অবশ্যই আবার ধর্মে ফিরে আসতে হবে। যুদ্ধ সেক্যুলারিজমের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। কুকবাদীরা এখন সংগঠিত হয়ে সংগ্রামে আরও বেশি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে প্রস্তুত-এই সংগ্রাম ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদে বাধা দিতে ইচ্ছুক পশ্চিমের বিরুদ্ধে, আরবদের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলের উপর পশ্চিমের আরোপ করা সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে।
