১৯৬৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে, ছয় দিনের যুদ্ধের শুরু হওয়ার মোটামুটি তিন সপ্তাহ আগে, র্যাবাই কুক যথারীতি মারকায হারাভ ইয়েশিভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। সহসা ফুঁপিয়ে ওঠার মতো আওয়াজ করে উঠলেন তিনি, এমন কিছু শব্দ উচ্চারণ করলেন যা বক্তৃতার ধারাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিল: ‘কোথায় ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র থেকে ছিঁড়ে নেওয়া আমাদের হেব্রন, শেচেম, জেরিকো এবং আনাতোহ; কর্তিত অবস্থায় আমাদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে?’৮৮ তিন সপ্তাহ পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এর আগে আরবদের হাতে থাকা এইসব বাইবেলিয় স্থান দখল করে নেয়। র্যাবাই কুকের শিষ্যরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, ঈশ্বর কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়েই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনি। স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের শেষে ইসরায়েল মিশর থেকে গাযা মালভূমি, জর্দানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও সিরিয়া থেকে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েল ও জর্দানের ভেতর বিভক্ত পবিত্র জেরুজালেম নগরী এবার ইসরায়েল কর্তৃক অধিকৃত হয় ও ইহুদি রাষ্ট্রের চিরন্তন রাজধানী বলে ঘোষিত হয়। আরও একবার ইহুদিরা পশ্চিম দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করার সুযোগ লাভ করে। উল্লাসের মেজাজ ও প্রায় অতীন্দ্রিয়বাদী উল্লাস গোটা দেশকে অধিকার করে নিয়েছিল। যুদ্ধের আগে ইসরায়েলিরা রেডিও-তে ওদের সবাইকে সাগরে নিক্ষেপ করার নাসেরের শপথের কথা শুনত; এখন অপ্রত্যাশিতভাবে ইহুদি স্মৃতিতে পবিত্র সব স্থানের অধিকার লাভ করেছে তারা। চরম সেক্যুলারিস্টদের অনেকেই যুদ্ধকে লোহিত সাগর অতিক্রম করার স্মৃতিবাহী একটি ধর্মীয় ঘটনা হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছিল।৮৯
কিন্তু কুকবাদীদের জন্যে যুদ্ধ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একে নিষ্কৃতি একেবারে হাতের নাগালে এবং ঈশ্বর ইতিহাসকে চূড়ান্ত পূর্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তারই পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ মনে হয়েছে। প্রকৃত কোনও মেসায়াহর আগমন না ঘটার ব্যাপারটি গাহেলেতকে উদ্বিগ্ন করেনি; আধুনিক ছিল ওরা, নিখুঁতভাবে ব্যক্তি নয় বরং প্রক্রিয়াকেই ‘মেসায়াহ’ হিসাবে দেখতে প্রস্তুত ছিল।” যুদ্ধের ‘অলৌকিক’ ঘটনার একটি স্বাভাবিক ব্যাখ্যা থাকায়ও তারা অস্বস্তি বোধ করেনি: ইসরায়েলি বিজয় ছিল সম্পূর্ণ আইডিএফ-এর দক্ষতা ও আরব বাহিনীর অযোগ্যতার ফল। দ্বাদশ শতাব্দীর দার্শনিক মায়মোনাইদস ভবিষ্যদ্ববাণী করেছিলেন যে, নিষ্কৃতিতে অতিপ্রাকৃত কিছু থাকবে না: মহাজাগতিক বিস্ময় ও সর্বজনীন শান্তির কথা বলা ভবিষ্যদ্বাণীসূলভ অনুচ্ছেদগুলো মেসিয়ানিক রাজ্যের নয় বরং আসন্ন পৃথিবীর কথা বুঝিয়েছে। বিজয় কুকবাদীদের বিশ্বাস করিয়েছিল যে আন্তরিকতার সাথে সংগঠিত হওয়ার সময় হয়েছে।
বিজয়ের কয়েক মাস পরে র্যাবাই ও ছাত্ররা আরব প্রতিবেশীদের সাথে শান্তি স্থাপনের জন্যে শ্রমিক দলীয় সরকারের সদ্য অধিকৃত কিছু এলাকা ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নাকচ করার উপায়ের খোঁজে মারকায হারাভে এক অনির্ধারিত সভার আয়োজন করেন। কুকবাদীদের চোখে এমনকি এক ইঞ্চি পবিত্র ভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার মানে হবে অশুভ শক্তির বিজয়। বিস্ময়ের সাথে সেক্যুলারদের মিত্র হিসাবে পেয়ে যায় তারা। যুদ্ধের অব্যবহিত পর ইসরায়েলি কবি, প্রফেসর, অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিক ও সেনা কর্মকর্তাদের বিশিষ্ট একটি দল সরকারকে অঞ্চলগত ছাড় থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে ল্যান্ড অভ ইসরায়েল আন্দোলন গঠন করেন। বছর পরিক্রমায় এই আন্দোলন কুকবাদীদের এমনভাবে তাদের আদর্শ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে যা সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টি করবে এবং তাদের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন যোগাবে। আস্তে আস্তে কুকবাদীরা মূল ধারায় যোগ দিচ্ছিল।
১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে মোশে লেভিংগার হেব্রনে পাসওভারের অনুষ্ঠানে কুকবাদীদের একটি ছোট দল ও সেগুলোর পরিবারের নেতৃত্ব দেন, যেখানে আব্রাহাম, ইসাক ও জ্যাকবের সমাধি আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। মুসলিমরা যেহেতু ইহুদি গোত্রপিতাদের মহান পয়গম্বর হিসাবে শ্রদ্ধা করে, হেব্রন তাদের চোখেও পবিত্র নগরী। শত শত বছর ধরে প্যালেস্তাইনিরা হেব্রনকে ঈশ্বরের ‘বন্ধু’ আব্রাহামের সাথে সম্পর্কের কারণে আল-খালিল ডেকে এসেছে। কিন্তু হেব্রন অন্ধ স্মৃতিও জাগিয়ে তোলে। ২৪শে আগস্ট, ১৯২৯ প্যালেস্তাইনে আরব ও যায়নবাদীদের এক মহা টানাপোড়েনের সময় উনপঞ্চাশজন ইহুদি নারী-পুরুষ ও শিশু ব্রেনে গণহত্যার শিকার হয়। লেভিংগার ও তার দল সুইস পর্যটকের পরিচয়ে পার্ক হোটেলে অবস্থান করছিলেন, কিন্তু পাসওভার শেষ হয়ে গেলেও বিদায় নিতে অস্বীকার করে স্কোয়ার্টার হিসাবে থেকে যান। ইসরায়েলি সরকারের পক্ষে ব্রিতকর ব্যাপার ছিল এটা, কেননা জেনিভা কনভেনশন বৈরিতার সময় অধিকৃত যেকোনও এলাকায় বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে, এবং জাতি সংঘ অধিকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলকে প্রত্যাহারের চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু কুকবাদীদের চুতপা স্বর্ণযুগে তাদের শ্রমিক দলীয়দের তাদের অগ্রদূতদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল, সুতরাং সরকার তাদেরকে উৎখাত করতে অনীহ ছিল। ৯২
লেভিংগারের দলটি কেভ অভ দ্য প্যাট্রিয়ার্কে সাথে সাথে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সামরিক সরকার বৈরিতার সময় বন্ধ থাকা উপসনালয়টি আবার উপাসনার জন্যে খুলে দিয়েছিল, আরবদের বিরক্ত না করে প্রার্থনার জন্যে ইহুদিদের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করেছিল। ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের পক্ষে এটা যথেষ্ট ছিল না, গুহায় আরও সময় ও স্থান বাড়ানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিল তারা। শুক্রবার মুসলিমদের সমবেত প্রার্থনার সময় তারা উপসনালয় ছেড়ে যেতে অস্বীকার করছিল, অনেক সময় দরবার ঘর ছেড়ে গেলেও মুল প্রবেশপথ অবরোধ করে রাখত, যাতে মুসলিম উপাসকরা ভেতরে ঢুকতে না পারে। গুহায় কিদ্দুশ ধরে মদ পান করত, জানত মুসলিমরা একে আক্রমণাত্মক মনে করবে। ১৯৬৮ সালের স্বাধীনতা দিবসে, সরকারী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উপসনালয়ে ইসরায়েলি পতাকা ওঠায় তারা। উত্তেজনা বেড়ে ওঠে এবং সম্ভবত অনিবার্যভাবে-মসজিদের বাইরের কোনও প্যালেস্তাইনি তরুণ ইসরায়েলি পর্যটকদের প্রতি গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। ৩ ইসরায়েলি সরকার অনীহার সাথে হেব্রনের বাইরে বসতি স্থাপনকারীদের জন্যে একটি ছিটমহল প্রতিষ্ঠা করে; নতুন বসতি আইডিএফ-এর হেফাযতে ছিল। লেভিংগার এর নাম দিয়েছিলেন কিরিয়াত আরবা (হেব্রনের বাইবেলিয় নাম), এবং তা সবচেয়ে চরম, সহিংস ও উস্কানিদাতা যায়নবাদী মৌলবাদীদের ঘাঁটি হয়েছিল। ১৯৭২ সাল নাগাদ কিরিয়াত আরবা আনুমানিক পাঁচ হাজার অধিবাসীর একটা ছোট শহরে পরিণত হয়। কুকবাদীদের কাছে পবিত্র যুদ্ধে ‘অন্যপক্ষে’র সীমানা ঠেলে ঈশ্বরের জন্যে পবিত্র ভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুক্ত করা বিজয়ের প্রতীক ছিল এটা।
