ইসরায়েলি পণ্ডিত ইরমিয়াহু ইয়োভেলের মতে ধর্মের প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠাটা মারানোদের পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল।২৩ এমনকি ১৪৯২ সালের ব্যাপক উচ্ছেদের আগেও বিখ্যাত স্প্যানিশ পরিবারের সদস্য পেদ্রো এবং ফার্নান্দো দে লা কাবেল্লেরিয়ার মতো কেউ কেউ নিজেদের স্রেফ রাজনীতি, শিল্পকলা ও সাহিত্যে জড়িয়ে নেন, ধর্মে তাদের কোনও রকম আগ্রহ না থাকার আভাস দেন তাঁরা। প্রকৃতপক্ষেই পেদ্রো প্রকাশ্যে ভুয়া ক্রিশ্চান হওয়ার ব্যাপারে গলাবাজি করতেন; তিনি দাবি করতেন ব্যাপারটা তাঁকে পবিত্র আইন ও নিয়মকানুন নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ করে দিয়েছে।২৪ ১৪৯২ সালের অল্প কিছুদিন আগে আলবারো দে মন্তালবান নামে এক লোককে লেন্টের সময় পনির ও মাংস খাওয়ার অপরাধে ইনকুইজিটরদের সামনে হাজির করা হয়; এভাবে সে কেবল ক্রিশ্চান উপবাসই ভঙ্গ করেনি, বরং ইহুদি বিধানও লঙ্ঘন করেছে, যেখানে মাংস ও দুধ জাতীয় খাবার একসাথে খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। স্পষ্টই কোনও ধর্মের প্রতিই তার কোনও অঙ্গীকার ছিল না। এই ক্ষেত্রে আলবারো জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়। ক্যাথলিসিজমে ঠেলে দেওয়ায় তার আর তেমন একটা উষ্ণ বোধ হওয়ার কারণ ছিল না। গোপনে ইহুদি ধর্মাচার পালনের দায়ে ইনকুইজিশনের হাতে নিহত হয়েছিল তার বাবা-মা। ওদের লাশ কবর থেকে তুলে আনার পর হাড়গোড় পোড়ানো হয়; সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।২৫ ইহুদি ধর্মের সাথে এমনকি ক্ষীণ সম্পর্ক রাখতে ব্যর্থ হয়ে আলবারো ধর্মীয় শূন্যতার দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। সত্তর বছর বয়স্ক বৃদ্ধ হিসাবে শেষ পর্যন্ত পরকালের মতবাদের ইচ্ছাকৃত ও পৌনঃপৌনিক অস্বীকৃতির অপরাধে ইনকুইজিশনের হাতে কারাবন্দি হয় সে। ‘আমাকে এখানেই আরামে থাকতে দাও,’ একাধিকবার বলেছিল সে। কারণ এর পর আর কিছু আছে কিনা আমার জানা নেই।’২৬
আলবারোর বিশ্বাস বোঝায় যে তার মেয়েজামাই ট্র্যাজিকমিক রোমান্স লা সেলেস্তিনা’র রচয়িতা ফার্নান্দো দে রোয়াসও (c. ১৪৬৫-১৫৪১) সন্দেহের আওতায় এসে পড়েছিল। ফলে সম্মানিত ক্রিশ্চানিটির একটা সযত্ন ভাব ধারণ করেছিল সে। কিন্তু ১৪৯৯ সালে প্রথম প্রকাশিত তাঁর লা সেলেস্তিনায় স্থূল বাড়াবাড়ির আড়ালে এক ধরনের ক্ষীণ সেক্যুলারিজমের আভাস দেখতে পাই আমরা। ঈশ্বর বলে কেউ নেই। ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। কিন্তু ভালোবাসার মরণ ঘটলে বিরান ভুমিতে পরিণত হয় বিশ্ব। নাটকের শেষে প্লেবেরিও মেয়ের আত্মহত্যার জন্যে মাতম করছে, কেবল সেই তাকে জীবনের একটা অর্থ যোগাত। ‘হে পৃথিবী, হে পৃথিবী,’ উপসংহার টানছে সে, ‘যখন তরুণ ছিলাম, ভেবেছিলাম তোমাকে আর তোমার কর্মকাণ্ডকে পরিচালনার কোনও নিয়ম কানুন আছে।’ কিন্তু এখন
তোমাকে ভ্রান্তি, ভীতিকর মরুভূমি, বুনো জানোয়ারের আস্তানা, লোকে কেবল ঘুরে বেড়ায় এমন একটা খেলার মতো লাগছে…পাথুরে প্রান্তর, সাপে ভরা ময়দান, ফুলে ভরা কিন্তু বিরান বাগিচা, উদ্বেগের ফোয়ারা, অশ্রুজলের নদী, কষ্টের সাগর, ব্যর্থ আশা মনে হচ্ছে।২৭
পুরোনো ধর্ম পালন করতে না পেরে, ইনকুইজিশনের অত্যাচারে নতুন ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রোয়াস এমন এক হতাশায় ডুবে গিয়েছিল যে নিয়মকানুনের আর কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছিল না সে, পাচ্ছিল না কোনও পরম মূল্যও।
ফান্দিনান্দ ও ইসাবেলা ইহুদিদের আর যাই হোক সংশয়বাদী অবিশ্বাসী হয়ে যাবার ব্যাপারটা চাননি মোটেই। কিন্তু আমাদের সম্পূর্ণ কাহিনী জুড়ে আমরা দেখতে পাই যে তাঁরা যে ধরনের নিপীড়ন আরোপ করেছিলেন সেটা নেতিবাচক ফল দিয়েছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানুষকে তৈরি হওয়ার আগেই চলমান বিশ্বাস গ্রহণ করতে বাধ্য করার প্রয়াস এমন সব ধারণা বা চর্চার পথ খুলে দেয় যা কিনা খোদ নিপীড়নকারী কর্তৃপক্ষের চোখে দারুণভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে দাঁড়ায়। ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা ছিলেন আগ্রাসী আধুনিকায়নবাদী, সব ধরনের ভিন্ন মত দমন করতে চেয়েছিলেন তাঁরা, কিন্তু তাঁদের ইনকুইজিশনাল পদ্ধতি গোপন ইহুদি দল গঠন ও প্রথমবারের মতো ইউরোপে সেক্যুলারিজম ও নাস্তিক্যবাদের ঘোষণার দিকে চালিত করেছে। পরে কিছু সংখ্যক ক্রিশ্চানও এই ধরনের ধর্মীয় স্বেচ্ছাচারে এতটাই বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছিল যে তারাও প্রত্যাদিষ্ট ধর্মে আস্থা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সেক্যুলারিজমও সমান হিংস্র হতে পারে। বিংশ শতাব্দীতে প্রগতির নামে সেক্যুলার রীতিনীতি আরোপ উগ্র মৌলবাদের উত্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে কাজ করেছে, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর পক্ষে যা মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৪৯২ সালে খৃস্টধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো প্রায় ৮০,০০০ ইহুদিকে পর্তুগালে আশ্রয় দিয়েছিলেন রাজা দ্বিতীয় হোয়াও। এইসব পর্তুগিজ ইহুদি এবং তাদের উত্তরপুরুষদের ভেতরই নাস্তিক্যবাদের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ নাটকীয় নজীর দেখতে পাই। এই ইহুদিদের কেউ কেউ মরিয়াভাবে তাদের ইহুদি ধর্মকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পর্যাপ্ত কাল্ট না থাকায় সেটা অসম্ভব বা কঠিন আবিষ্কার করেছে। ১৪৯২ সালে পর্তুগালে পালিয়ে যাওয়া ইহুদিরা স্প্যানিশ কনভার্সোদের চেয়ে কঠিন ছিল: বিশ্বাস ত্যাগ করার বদলে দেশান্তরী হওয়ার পথ বেছে নিয়েছিল তারা। ১৪৯৫ সালে প্রথম ম্যানুয়েল সিংহাসনে আসীন হলে শ্বশুর-শাশুড়ির কারণে তিনি রাজ্যের ইহুদিদের জোর করে ব্যাপ্টাইজ করার নির্দেশ দিতে বাধ্য হন, তবে এক প্রজন্মের জন্যে তাদের ইনকুইজিশন থেকে রেহাই দিয়ে আপোস করেন। এই পর্তুগিজ মারানোরা গোপন সংগঠন গড়ে তোলার জন্যে প্রায় পঞ্চাশ বছর সময় পেয়েছিল, এই সংগঠনে একটি সংখ্যালঘু অংশ গোপনে ইহুদি ধর্ম পালন করে চলে ও অন্যদেরও পুরোনো ধর্মবিশ্বাসে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস পায় ২৮
