১৯৭২ সালের নিবন্ধে খোমেনি প্রস্তাব করেন যে, মোল্লা সদ্রার বর্ণিত অধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে নিয়োজিত একজন ফাকিহ ইমামদের মতো একই ‘ভ্রান্তি হীনতা’ (ইসমাহ) অর্জন করতে পারেন। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে জুরিস্ট ইমামদের সমপর্যায়ের হয়ে গেছেন, বরং অতীন্দ্রিয়বাদী আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তাঁকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা অহমবাদ থেকে মুক্ত করেছেন। তাকে ‘অন্ধকারের পর্দা’, ‘জাগতিকতার সাথে সংশ্লিষ্টতা’ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা থেকে মুক্ত করতে হয়েছে। আল্লাহ’র অভিমুখে যাত্রার চূড়ান্ত পর্যায়ে এভাবে তিনি পাপ প্রবণতা থেকে পরিশুদ্ধ হয়েছেন: ‘কেউ সর্বশক্তিমান আল্লাহয় বিশ্বাস করলে হৃদয়ের চোখ দিয়ে যেভাবে সে সূর্যকে দেখতে পায় সেভাবে তাঁকে দেখলে তার পক্ষে পাপ করা অসম্ভব।’ ইমামদের অনন্য উপহার, বিশেষ স্বর্গীয় জ্ঞান ছিল, তবে খোমেনি বিশ্বাস করতেন আধ্যাত্মিকতার সাধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই নিম্নতর ভ্রান্তিহীনতা অর্জন করেছেন তাঁরা। এভাবে ইসলামি আইনের বিশেষজ্ঞ ও অতীন্দ্রিয়বাদীভাবে নব জন্মলাভকারী একজন ফাকিহর পক্ষে জনগণকে আল্লাহ’র পথে পরিচালিত করা অসম্ভব হবে না। এখানে সম্ভাব্য বহুঈশ্বরবাদীতার ব্যাপার রয়েছে, কিন্তু আবারও জোরের সাথে বলা প্রয়োজন যে ১৯৭২ সালে কেউই, এমনকি খোমেনিও না, ইসলামি প্রবণতাসম্পন্ন বিপ্লবের মাধ্যমে শাহকে উৎখাত করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করতেন না। খোমেনি সত্তর বছর বয়সী ছিলেন তখন। নিশ্চয়ই তিনিই যে শাসক ফাকিহতে পরিণত হবেন এমনটা ভাবতে যাননি। ইসলামিক গভর্নমেন্ট ও দ্য গ্রেটার জিহাদে’ খোমেনি শিয়াহ পুরাণ ও অতীন্দ্রিয়বাদ কীভাবে অভিযোজিত করে শত শত বছরের পবিত্র ঐতিহ্যকে ভেঙে ইরানে যাজকীয় শাসনের অনুমতি দেওয়া যায় সেটাই দেখার চেষ্টা করেছেন। বাস্তব ক্ষেত্রে এই মিথোস কীভাবে কাজ করে সেটা দেখা তখনও বাকি ছিল তাঁর।
*
ইসরায়েলে এক নতুন ধরনের ইহুদি মৌলবাদ ইতিমধ্যে মিথকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুবাদ করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। ধর্মীয় যায়নবাদে ছিল এর শেকড়, প্যালেস্তাইনে রাষ্ট্র-পূর্ববর্তী সময়ে সেক্যুলার যায়নবাদের ছায়ায় পরিপুষ্ট হয়েছে। এইসব ধর্মীয় যায়নবাদীরা ছিল আধুনিক অর্থডক্স, বেশ আগে থেকেই তারা সমাজতান্ত্রিক কিব্বুতযিমের পাশাপাশি নিজস্ব নিবেদিত বসতি স্থাপন করে আসছিল। হেরাদিমের বিপরীতে ধার্মিক ইহুদিদের এই ক্ষুদ্র দলটি যায়নবাদকে অর্থডক্সির সাথে বেমানান মনে করেনি। বাইবেলকে আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে তারা: তোরাহয় ঈশ্বর আব্রাহামের বংশধরদের ভুমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবং এভাবে ইহুদিদের প্যালেস্তাইনের উপর বৈধ অধিকার দান করেছেন। তাছাড়া, এরেত্য ইসরায়েলে ইহুদিরা ডায়াসপোরার চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে আইন অনুসরণ করতে পারবে। ঘেটোতে কৃষি ও ভূমিতে বসতি স্থাপনের অনেক বিধান কিংবা রাজনীতি ও সরকারের আইন বাস্তব কারণেই পালন করা সম্ভব ছিল না। ফলে প্রয়োজনের তাগিদেই ডায়াসপোরার ইহুদিবাদ বিভাজিত ও গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এখন নিজেদের দেশে আসার পর অবশেষে ইহুদিরা ফের সম্পূর্ণ তোরাহ আবার পালন করতে পারবে। যায়নবাদী অর্থডক্সির অন্যতম অগ্রদূত পিনচাস রোজেনব্লাথ ব্যাখ্যা করেছেন :
আমরা নিজেদের উপর সম্পূর্ণ তোরাহ গ্রহণ করেছি, এর নির্দেশনা ও ধারণাসমূহ। [প্রাচীন] অর্থডক্সি আসলে তোরাহর ছোট একটা অংশ তুলে ধরেছে…সিনাগগ বা পরিবারে পালন করা হয়…কিংবা জীবনের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে। আমরা সব সময় সব জায়গায় তোরাহ অনুসরণ করতে চাই, [তোরাহ] ও এর বিধিবিধানকে ব্যক্তি ও সর্বসাধারণের জীবনে সার্বভৌমত্ব দিতে চাই।
আধুনিকতার সাথে বেমানান হওয়া দূরের কথা, আইন একে সম্পূর্ণতা দান করবে। জগৎ দেখবে যে, ইহুদিরা ঈশ্বর পরিকল্পিত বলে সম্পূর্ণ প্রগতিশীল একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থার পত্তন ঘটাতে পারে।৭৮
সামগ্রিকতার প্রতি সবসময়ই এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা ছিল ধর্মীয় যায়নবাদকে সব সময়ই যা বৈশিষ্ট্যায়িত করবে। নির্বাসনের আঘাত ও বিধিনিষেধের পর এটা ছিল উপশম ও অধিকতর হলিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি খোঁজার উপায়। তবে এটা সেক্যুলার যায়নবাদীদের যৌক্তিক দর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও ছিল, যারা ধার্মিক বসতিস্থাপনকারীদের গুরুত্বের সাথে নেয়নি এবং এরেতয ইসরায়েলে তাদের তোরাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে কেবল পশ্চাদপদই নয় বরং বিতৃষ্ণা জাগানো মনে করেছে। ধার্মিক যায়নবাদীরা বিদ্রোহী হওয়ার বেলায় দারুণ সজাগ ছিল। ১৯২৯ সালে তারা নিজস্ব তরুণ আন্দোলন নেই আকিভা (‘সান্স অভ আকিভা’) সূচিত করার সময় এই তরুণ দল রোমে ইহুদি আন্দোলনের সমর্থনকারী দ্বিতীয় সিই শতাব্দীর মহান অতীন্দ্রিয়বাদী ও পণ্ডিত র্যাবাই আকিভাকে আদর্শ হিসাবে নিয়েছিল। সেক্যুলার যায়নবাদীরাও বিদ্রোহী ছিল, কিন্তু সেটা ধার্মিক ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে। এবার বনেই আকিভার ধারণা জেগেছিল যে তাদের অবশ্যই ‘বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাতে হবে, ইহুদিবাদ ও ইহুদি ঐতিহ্যের বিরোধিতাকারী [সেক্যুলার] তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে।’৭৯ ঈশ্বরের নামে যুদ্ধ করছিল তারা। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকে ধর্মকে বাদ বা প্রান্তিকায়িত করার বদলে তারা চাইছিল ‘সর্বক্ষণ ও সকল ক্ষেত্রে’ তাদের অস্তিত্বকে ধর্ম দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলতে। সেক্যুলারিস্টদের সম্পূর্ণভাবে যায়নবাদ ‘দখল’ করে নিতে দিতে চায়নি তারা। সংখ্যালঘু হলেও সেক্যুলারিস্টদের সম্পূর্ণ যৌক্তিক আদর্শের বিরুদ্ধে একটা ক্ষুদে অভ্যুত্থান ঘটাচ্ছিল তারা।
