খোমেনি জানতেন তাঁর যুক্তিগুলো দারুণভাবে বিতর্কিত ও মৌল শিয়া বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু কুতবের মতোই এই উদ্ভাবন বর্তমান জরুরি অবস্থায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। শরিয়তির মতো ধর্মকে আর ব্যক্তি পর্যায়ে সীমিত রাখা যাবে বলে বিশ্বাস করতেন না। পয়গম্বর, ইমাম আলি এবং ইমাম হুসেইন-এঁরা সবাই একাধারে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন, সক্রিয়ভাবে তাঁদের সময়ের নির্যাতন ও বহুঈশ্বরবাদীতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কোনও ব্যাপার ছিল না বরং ‘মানুষকে কর্মে চালিতকারী’ এক প্রবণতা ছিল:
ইসলাম হচ্ছে বিশ্বাস ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ জঙ্গী ব্যক্তি বিশেষের ধর্ম। এটা তাদের ধর্ম যারা মুক্তি ও স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা করে। এটা তাদের স্কুল যারা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।৭১
খুবই আধুনিক বার্তা ছিল এটা। শরিয়তির মতো খোমেনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে ইসলাম মধ্যযুগিয় কোনও ধর্ম নয়, বরং সব সময় পশ্চিম যেসব মূল্যবোধ আবিষ্কার করেছে বলে মনে করে সেগুলোকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। কিন্তু ইসলাম সাম্রাজ্যবাদীদের কারণে আক্রান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। জনগণ পশ্চিমা আদর্শের ভিত্তিতে ধর্ম ও রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছে, এবং এটা বিশ্বাসকে বিকৃত করেছে: ‘ইসলাম এমনভাবে মানুষের মাঝে বাস করে যেন অচেনা কেউ,’ বিলাপ করেছেন খোমেনি। ‘কেউ ইসলামকে তার প্রকৃত রূপে উপস্থাপন করতে চাইলে জনগণকে তা বিশ্বাস করাতে কষ্ট হবে। ইরানিরা আধ্যাত্মিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়েছে। ‘আমরা নিজেদের পরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে গেছি। একে পশ্চিমা পরিচয় দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছি,’ বলতেন খোমেনি। ইরানিরা ‘নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে, নিজেদের তারা চেনে না, বিদেশী আদর্শের দাসত্বে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সম্পূর্ণ ইসলামের আইন ভিত্তিক একটি সমাজ নির্মাণ করাই এই বিচ্ছিন্নতার নিরাময়ের উপায়; এসব আইন ইরানিদের কাছে আমদানি করা পশ্চিমের আইনি বিধানের চেয়ে অনেক কাছেরই নয়, বরং সেগুলোর স্বর্গীয় উৎস রয়েছে। তারা স্বর্গীয়ভাবে নির্ধারিত পরিবেশে বাস করে, দেশের আইন অনুযায়ী ঠিক যেভাবে আল্লাহ চেয়েছেন সেভাবে বাস করতে বাধ্য হলে তারা নিজেরা এবং তাদের জীবনের অর্থ বদলে যাবে। ইসলামের শৃঙ্খলা, অনুশীলন ও আচার তাদের মাঝে মানবজাতির পক্ষে আদর্শ মুহাম্মদীয় চেতনা সৃষ্টি করবে। খোমেনির চোখে ধর্মবিশ্বাস স্রেফ ক্রিডের ধারণাগত স্বীকারোক্তিমাত্র ছিল না, বরং আল্লাহ মানবজাতির পক্ষে যে সুখ ও অখণ্ডতা চেয়েছেন তার জন্যে বিপ্লবী সংগ্রামকে ধারণ করা এক প্রবণতা ও জীবনযাত্রার ধরণ। ‘একবার বিশ্বাস সৃষ্টি হলে, বাকি সব কিছু এমনি এসে যাবে। ৭৪
পাশ্চাত্য চেতনার আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ধারণ করে বলে এই ধরনের বিশ্বাস বিপ্লবী ছিল। পশ্চিমা কারও চোখে খোমেনির তত্ত্ব বেলায়েত-ই ফাকিহ (‘দ্য গভর্নমেন্ট অভ জুরিস্ট’) ভয়ানক, নিপীড়নমূলক মনে হবে, কিন্তু ইরানিদের ‘আধুনিক’ সরকারের অভিজ্ঞতা তাদের জন্যে ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণের নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া মুক্তি এনে দেয়নি। খোমেনি পাহলভী শাসকের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজস্ব একটি বিকল্প শিয়া আদর্শ ধারণ করতে যাচ্ছিলেন। অতীন্দ্রিয়বাদী হিসাবে পরিচিত ছিলেন তিনি এবং হুবহু ইমামদের মতো না হলেও কাছকাছি স্বর্গীয় জ্ঞানের ধারক ছিলেন বলে মনে করা হত তাঁকে। হুসেইনের মতো তিনি স্বৈরাচারের দুর্নীতিপরায়ণ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন; ইমামদের মতো তাঁকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে, তাঁকে তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন নাজাফে ইমাম আলির সমাধির পাশে বাসরত খোমেনিকে অনেকটা বরং গোপন ইমাম বলেই মনে হচ্ছিল: জাতির পক্ষে দৈহিকভাবে এখনও প্রবেশাধিকার রুদ্ধ, দূর থেকে তিনি তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন, একদিন ফিরে আসবেন। গুজব ছিল যে বর্তমান নির্বাসন সত্ত্বেও কুমে ইন্তেকাল করার স্বপ্ন দেখেছেন খোমেনি। পশ্চিমের লোকেরা একজন রাজনৈতিক নেতার মাঝে যেমন আকর্ষণ বা ক্যারিশমা আশা করে তার কোনওটাই না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে খোমেনি ইরানি জনগণের এমন ভক্তি লাভ করতে পেরেছেন সেটা কিছুতেই বুঝতে পারে না। শিয়াবাদ সম্পর্কে ধারণা থাকলে হয়তো একে তেমন রহস্যজনক ভাবত না।
ইসলামিক গভর্নমেন্ট রচনা করার সময় সম্ভবত খোমেনির ধারণাই ছিল না যে বিপ্লব অত্যাসন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বেলায়েত-ই ফাকিহ’র জন্যে প্রস্তুত হতে ইরানের আরও দুইশো বছর লাগবে।৭৫ এই সময় পর্যন্ত তাঁর তত্ত্বে রাজনৈতিক দিকের চেয়ে ধর্মীয় আদর্শ নিয়েই বেশি ভাবিত ছিলেন খোমেনি। ১৯৭২ সালে, ইসলামিক গভর্নমেন্ট প্রকাশিত হওয়ার এক বছর পর বিতর্কিত বেলায়ত-ই ফাকিহর পক্ষে অতীন্দ্রিয়বাদী যৌক্তিকতার সন্ধান লাভকারী একটি প্রবন্ধ লিখেন খোমেনি, যার নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য গ্রেটার জিহাদ’। শিরোনাম তাঁর একটি প্রিয় হাদিসের উল্লেখ করে, এক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে পয়গম্বর বলেছিলন: ‘আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’ এটা নিখুঁতভাবে খোমেনির বিশ্বাস তুলে ধরে যে রাজনীতির যুদ্ধ ও প্রচারণা ‘নিম্নপর্যায়ের’ সংগ্রাম, সমাজের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনা ও কারও হৃদয় আর মনকে সংহত করার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বহীন। শরিয়তির মতো তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ইরানের গভীরতর ধর্মীয় পুনর্জাগরণ ছাড়া রাজনৈতিক সমাধান সফল হতে পারে না।
