শরিয়তি সম্পূর্ণভাবে সাফাভিয় শিয়াবাদের উসুলি মতবাদের প্রতি পুরোপুরি ন্যায় আচরণ করেননি। বিশেষ প্রয়োজনের প্রতি সাড়া হিসাবে এগুলোর আবির্ভাব ঘটেছিল, সব সময়ই বিতর্কিত থাকলেও প্রাক আধুনিক যুগের আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরেছে সেগুলো, ব্যক্তিকে যেখানে বেশি স্বাধীনতা দান সম্ভব ছিল না। কিন্তু জগৎ বদলে গেছে। স্বায়ত্তশাসন ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার মতো পাশ্চাত্য আদর্শে প্রভাবিত ইরানিরা আর পূর্বপুরুষদের মতো মুজতাহিদদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিল না। সাধারণ মানুষকে তাদের সমাজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে ও স্থিতাবস্থার কাছে আত্মসমর্পণে সাহায্য করতে রক্ষণশীল আধ্যাত্মিকতা প্রণয়ন করা হয়েছিল। হুসেইনের মিথ শিয়াদের মাঝে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে আবেগকে জীবন্ত রেখেছে, কিন্তু তাঁর কাহিনী ও ইমামদের কাহিনী এও দেখায় যে রেডিক্যাল পরিবর্তনকে স্থান দিতে অক্ষম এক বিশ্বে স্বর্গীয় আইন বাস্তবায়ন কত কঠিন। ৬৪ কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এটা আর প্রয়োগযোগ্য ছিল না। ইরানিরা ভয়াবহ গতির পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করছিল; একইভাবে প্রাচীন আচার ও প্রতীকের প্রতি সাড়া দিতে পারছিল না তারা। শরিয়তি শিয়াবাদকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন যাতে তা গভীরভাবে পরিবর্তিত বিশ্বে শিয়াদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
শরিয়তি জোরের সাথে বলেছেন, অন্য ধর্মবিশ্বাস থেকে ইসলাম ঢের বেশি গতিশীল। খোদ এর পরিভাষাই প্রগতিশীল ধাক্কা তুলে ধরে। পশ্চিমে ‘রাজনীতি’ শব্দটি নেওয়া হয়েছে স্থির প্রশাসনিক একক গ্রিক পোলিস (‘নগর’) থেকে, কিন্তু ইসলামি সমার্থক শব্দ সিয়াসাত, আক্ষরিকভাবে যার অর্থ ‘বুনো ঘোড়াকে বশ মানানো,’ অন্তস্থঃ সহজাত সম্পূর্ণতাকে বের করে আনার জোরাল সংগ্রামের কথা বোঝানো প্রক্রিয়া।৬৫ আরবী শব্দ উম্মাহ ও ইমাম, দুটিই এসেছে মূল শব্দ আমম (‘যাওয়ার সিদ্ধান্ত’) থেকে: সুতরাং ইমাম হচ্ছেন একজন আদর্শ যিনি মানুষকে নতুন দিকে নিয়ে যাবেন। সম্প্রদায় (উম্মাহ) কেবল কয়জন ব্যক্তির সমাবেশ নয়, বরং লক্ষ্যমুখী, চিরন্তন বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত।৬৬ ইজতিহাদের ধারণা (“স্বাধীন বিবেচনা’) নবায়ন ও পুননির্মাণের এক অবিরাম বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস বোঝায়; এটা, জোরের সাথে বলেছেন শরিয়তি, মুষ্টিমেয় উলেমার অধিকার নয়, বরং সকল মুসলিমের দায়িত্ব।৬৭ মুসলিম অভিজ্ঞতায় হিজরার (‘অভিবাসন’) কেন্দ্রিকতা পরিবর্তনের পক্ষে প্রস্তুতির কথা এবং মুসলিমকে অস্তিত্বের নতুনত্বের সাথে সম্পর্কিত রাখা উনুলতার কথা বোঝায়।৬৮ এমনকি ইন্তিযার (‘গোপন ইমামের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা’) পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতি চিরন্তন সচেতনতা ও স্থিতাবস্থার প্রত্যাখ্যান বোঝায়: ‘এটা মানুষের দায়িত্বকে তার নিজস্ব করে তোলে, সত্যির ধারা, মানুষের ধারা, ভারি, অবিলম্ব, যৌক্তিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। আলির শিয়াবাদ ছিল এমন এক বিশ্বাস যা মুসলিমদের রুখে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলতে বাধ্য করেছিল।৬৯
শাসকগোষ্ঠী এই ধরনের কথাবার্তা চলতে দিতে পারেনি। ১৯৭৩ সালে হুসাইনিয়াহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শরিয়তিকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাবন্দি করা হয়। এরপর ইরানে অভ্যন্তরীণ নির্বাসন দণ্ড ভোগ করে শেষে দেশ ত্যাগের অনুমতি পান। তাঁর বাবা স্মৃতিচারণ করেছেন, মারা যাবার আগে এক রাতে কেঁদে কেঁদে পয়গম্বর ও ইমাম আলিকে বিদায় জানাতে শুনেছেন তিনি। ১৯৭৭ সালে লন্ডনে প্রায় নিশ্চিতভাবেই সাভাকের এজেন্টদের হাতে মারা যান শরিয়তি। শিক্ষিত পাশ্চাত্যকৃত ইরানিদের একটি ইসলামি বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন শরিয়তি। ষাটের দশকের আল-ই আহমাদের মতো ১৯৭০-র দশকের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালের বিপ্লবের দিকে অগ্রসরমান দিনগুলোতে খোমেনির পাশাপাশি তাঁর ছবিও মিছিলে বহন করা হত।
অবশ্য ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পথ নির্দেশের জন্যে খোমেনির মুখের দিকে তাকিয়েছিল। বিপরীত দিক থেকে কুমের চেয়ে ইরাকে নির্বাসনে থাকার সময়ই তিনি বিরোধিতাকে ভাষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢের বেশি স্বাধীন ছিলেন। তাঁর বই ও টেপ চোরাপথে পাচার হয়ে দেশে আসত; এবং তাঁর ফতওয়া, যেমন ক্যালেন্ডার বাতিল করার পর শাহর শাসনকে ইসলামের সাথে বেমানান ঘোষণা করে দেওয়া সিদ্ধান্তটি, বেশ গুরুত্বের সাথে গৃহীত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে তিনি তাঁর ল্যান্ডমার্ক গ্রন্থ হুকুমাত-ই ইসলামি (‘ইসলামি সরকার’) প্রকাশ করেন, এখানে যাজকীয় শাসনের শিয়া আদর্শ রূপায়িত হয়েছিল। তাঁর থিসিস ছিল হতবুদ্ধিকর ও বিপ্লবী। শত শত বছর ধরে শিয়ারা গোপন ইমামের অনুপস্থিতিতে সকল সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে এসেছে, উলেমাদের পক্ষে রাষ্ট্র শাসন করা সঠিক বলে কখনওই ভাবেনি। কিন্তু ইসলামিক গভর্নমেন্ট-এ খোমেনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব নিরাপদ করার স্বার্থে উলেমাদের অবশ্যই ক্ষমতা দখল করতে হবে। একজন ফাকিহ-ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্সে বিশেষজ্ঞ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান সমূহের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিলে, শরীয়াহর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারবেন তিনি। ফাকিহ পয়গম্বর ও ইমামদের মতো সমপর্যায়ের না হলেও স্বর্গীয় বিধি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান বোঝায় যে তিনি তাঁদের মতোই সমান কর্তৃত্ব ধারণ করতে পারেন। কেবল আল্লাহই প্রকৃত বিধান প্রদানকারী, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শরীয়া আইন প্রয়োগ করার জন্যে নিজস্ব মানব রচিত আইন সৃষ্টিকারী পার্লামেন্টের পরিবর্তে একটা সংসদ থাকা প্রয়োজন।
