শরিয়তি ছিলেন সৃজনশীল বুদ্ধিজীবী, আবার আধ্যাত্মিক মানুষও। তাঁর জীবনে পয়গম্বর ও ইমামগণ ছিলেন বাস্তব সত্তা। তাঁদের প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল পরিষ্কার। শিয়া ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ স্রেফ সপ্তম শতাব্দীর ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা ছিল না, বরং এক সময়হীন বাস্তবতা যা বর্তমানের মানুষকে অনুপ্রাণিত ও পথ দেখাতে পারে। গোপন ইমাম, তিনি ব্যাখ্যা করতেন, জেসাসের মতো উধাও হয়ে যাননি। এখনও এই জগতেই আছেন তিনি, কিন্তু অদৃশ্যে; শিয়ারা কোনও বণিক বা ভিখিরির মাঝে তাঁর দেখা পেয়ে যেতে পারে। আত্মপ্রকাশের জন্যে অপেক্ষা করে আছেন তিনি, শিয়াদের অবশ্যই তাঁর কাড়ানাকাড়ার আওয়াজ শুনতে সব সময় প্রস্তুত অবস্থায় জীবন যাপন করতে হবে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান শোনার জন্যে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। গোপন সত্তা (যাত)-এর আভাস পাওয়ার জন্যে শিয়াদের অবশ্যই প্রাত্যহিক জীবনে তাদের ঘিরে রাখা বাস্তবতার নিরেট হতবৃদ্ধিকর বাস্তবতা ভেদ করে দেখতে হবে।৫৬ আধ্যাত্মিকতা যেহেতু ভিন্ন কোনও বলয় নয়, সুতরাং শাসকগোষ্ঠী যেভাবে প্রয়াস পাচ্ছে সেভাবে ধর্ম থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। মানুষ দুই মাত্রার প্রাণী; তাদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক অস্তিত্ব উভয়ই রয়েছে। তাদের লেগোসের মতোই মিথোসের প্রয়োজন, এবং সব রাজনীতিরই একটি দুর্ভেয় মাত্রা থাকা উচিত। এটাই ইমামতের মতবাদের আসল অর্থ: জনগণকে একাধারে তাদের আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়তা যোগাতে সমাজ একজন ইমাম, স্বর্গীয় নির্দেশক ছাড়া টিকে থাকতে পারে না, এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে একটা প্রতীকী স্মারক ছিল। ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করার মানে মুসলিমকে স্বর্গীয় একত্বে প্রতিপলিত অখণ্ডতা অর্জনে সাহায্যকারী ইসলামের মৌল বিশ্বাস তাওহিদের (‘ঐকবদ্ধকরণ’) নীতির সাথে বেঈমানি।৫৭
তাওহিদ পাশ্চাত্য-আসক্ত ইরানিদের বিচ্ছিন্নতারও উপশম ঘটাবে। শরিয়তি বাজগাশত বেহ খিশতান—‘নিজের কাছে প্রত্যাবর্তন’-এর উপর জোর দিয়েছেন। গ্রিক চেতনা যেখানে দর্শন দিয়ে বৈশিষ্ট্যায়িত হয়েছে, রোমানি চেতনা শিল্প ও সামরবিদ্যায়, ইরানের আদিআদর্শ সত্তা ধর্মীয় ও ইসলামি। পশ্চিমের যৌক্তিক প্রায়োগিক বিজ্ঞান যেখানে অস্তিত্ববানের উপর দৃষ্টি দেয়, অরিয়েন্ট সেখানে আসন্ন সত্যিও সন্ধান করে। ইরানিরা বেশি নিবিড়ভাবে পশ্চিমা আদর্শ অনুসরণ করলে পরিচয় হারিয়ে ফেলবে এবং নিজেদের জাতিগত নিশ্চিহ্নতাতেই সহযোগিতা করবে।৫৮ শাহর মতো প্রাচীন পারসিয় সংস্কৃতিতে মাহাত্ম্য খোঁজার বদলে তাদের শিয়া ঐতিহ্যকে উদযাপন করা উচিত। কিন্তু এটা লোক দেখানো বা একেবারেই ধারণাগত প্রক্রিয়া হতে পারবে না। অসাধারণ সুন্দর মনোগ্রাফ হাজ্জ-এ শরিয়তি নিখুঁতভাবে রক্ষণশীল চেতনা মূর্ত করে তোলা কাবাহ ও মক্কায় তীর্থযাত্রার সাথে প্রাচীন কাল্টের পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে সেগুলো আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে মুসলিমদের কাছে পৌঁছতে পারে। শরিয়তির গ্রন্থে তীর্থযাত্রা আল্লাহ’র পথে অভিযাত্রায় পরিণত হয়েছে, মোল্লা সদ্রার বর্ণিত চার ধাপের অন্তস্থঃ যাত্রার সাথে এর খুব পার্থক্য নেই। সবার অতীন্দ্রিয়ার ক্ষমতা নেই, এর জন্যে বিশেষ মেধা ও মেজাজ প্রয়োজন, কিন্তু হজ্জের আচারগুলো সকল মুসলিম নারী-পুরুষের বোধগম্য। তীর্থযাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ-অধিকাংশ মুসলিমের পক্ষে জীবনের একমাত্র অভিজ্ঞতা—এক নতুন পরিচয় তুলে ধরে। তীর্থযাত্রীকে অবশ্যই বিভ্রান্ত ও বিচ্ছিন্ন সত্তাকে পেছনে ফেলে যেতে হবে। কাবাহকে ঘিরে সাতবার প্রদক্ষিণ করার সময় বিশাল ভীড়ের প্রচণ্ড চাপ, ব্যাখ্যা করেছেন শরিয়তি, তীর্থযাত্রীর মনে ‘ছোট জলধারার বিরাট কোনও নদীর সাথে মিলিত হওয়ার’ কথা মনে করিয়ে দেয়:
মানুষের ভিড় আপনার উপর এমন চাপ সৃষ্টি করে যে আপনি নতুন জীবন লাভ করেন। এখন আপনি জনতার একটা অংশ; একজন মানুষ, জীবিত ও চিরন্তন…আল্লাহকে ঘিরে প্রদক্ষিণের সময় আপনি অচিরেই নিজেকে ভুলে যাবেন।৫৯
উম্মাহর সাথে এই ঐক্যে অহমবাদ অতিক্রম করা হয়েছে এবং এক নতুন ‘কেন্দ্র’ অর্জিত হয়েছে। আরাফাতের ময়দানে রাত্রি জাগরণের সময় তীর্থযাত্রীরা স্বর্গীয় জ্ঞানের আলোর কাছে নিজেদের উন্মুক্ত করেছে এবং এবার তাদের অবশ্যই আল্লাহর শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে জগতে প্রবেশ করতে হবে (মিনার তিনটি স্তম্ভ লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ার আচারের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা এক জিহাদ)। এরপর হাজ্জি প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে পবিত্র দায়িত্ব ন্যায় ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্যে সংগ্রামের সাথে অবিচ্ছেদ্য এই আধ্যাত্মিক সচেতনতা নিয়ে জাগতে ফিরে আসতে প্রস্তুত হয়। এতে অন্তর্ভুক্ত যৌক্তিক প্রয়াস কাল্ট ও মিথে অনুপ্রাণিত আধ্যাত্মিকতার প্রদত্ত অর্থের উপর নির্ভর করে।
শরিয়তির চোখে ইসলামকে অবশ্যই কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। সত্তার মূলে শিয়ারা যে সময়হীন বাস্তবতা দেখতে শিখেছে সেটাকে বর্তমানে সক্রিয় করে তুলতে হবে। কারবালায় ইমাম হুসেইনের উদাহরণ, শরিয়তি বিশ্বাস করতেন, সারা বিশ্বের সকল নির্যাতিত ও বিচ্ছিন্ন মানুষের পক্ষে অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত। শরিয়তি নিজেদের মাদ্রসায় বন্দি করে রাখা ও তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামকে স্রেফ ব্যক্তিগত ক্রিডে পরিণত করে বিকৃতকারী শান্তিবাদী উলেমাদের প্রতি বিরক্ত ছিলেন। অকাল্টেশনের কাল নিষ্ক্রিয়তার কাল হতে পারে না। শিয়ারা হুসেইনের নজীর অনুসরণ করে তৃতীয় বিশ্বের জনগণকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারলে গোপন ইমামকে আত্মপ্রকাশে বাধ্য করতে পারত। কিন্তু উলেমাগণ তরুণ ইরানিদের জন্যে ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, তাদের বিচ্যুতিতে একঘেয়েমিতে ফেলেছেন আর পশ্চিমের হাতে তুলে দিয়েছেন তাদের। ইসলামকে তারা একেবারেই আক্ষরিক অর্থে দেখে, অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মতো কিছু স্পষ্ট নির্দেশের বিন্যাস। অথচ আসলে প্রতীকীবাদই শিয়ামতবাদের বিশেষত্ব। মুসলিমদের তা পার্থিব বাস্তবতায় অদৃশ্যের ‘নিদর্শন’ দেখতে শিখিয়েছে।৬১ শিয়াদের প্রয়োজন সংস্কার। আলি ও হুসেইনের মূল শিয়াবাদ ইরানে শরিয়তির ভাষায় ‘সাফাভিয় শিয়াবাদের’ কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একটি সক্রিয় গতিশীল ধর্মকে ব্যক্তিগত, নিষ্ক্রিয় বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। অথচ গোপন ইমামের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পয়গম্বর ও ইমামদের ব্রত আসলে সাধারণ মানুষদের কাঁধে বর্তানোর কথা বুঝিয়েছিল। সুতরাং, অকাল্টেশনের কাল আসলে গণতন্ত্রের যুগ। সাধারণ মানুষকে আর মুজতাহিদদের কাছে বন্দি করে রাখা যাবে না, তাদের সাভাভীয় শিয়াবাদে আবশ্যক ধর্মীয় আচরণের অনুকরণে (তাকলিদ) বাধ্য করা যাবে না। প্রত্যেক মুসলিমকে অবশ্যই একাকী আল্লাহ’র কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং তার নিজস্ব জীবনের দায়িত্ব নিতে হবে। বাকি সবকিছু বহুঈশ্বরবাদীতা এবং ইসলামের বিকৃতি, একে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের প্রাণহীন অনুসরণে পরিণত করা। জনগণকেই তাদের নেতা নির্বাচিত করতে হবে; শুরার নীতিমালার দাবি অনুযায়ী অবশ্যই তাদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। ঐকমত্যের (ইজমাহ) ভেতর দিয়ে নেতাদের সিদ্ধান্তের বৈধতা দেবে তারা। যাজকীয় নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাতে হবে। উলেমাদের বদলে ‘আলোকিত বুদ্ধিজীবীগণ’ (রওশানফেকরুন) দের হতে হবে উম্মাহর নতুন নেতা।৬২
