শেষ পর্যন্ত অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলেন খোমেনি। ২৭শে অক্টোবর, ১৯৬৪ আমেরিকান সামরিক সদস্য ও অন্যান্য উপদেষ্টাকে দেওয়া সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইম্যুনিটি ও অস্ত্র ক্রয়ের জন্যে শাহর ২০০ মিলিয়ন ডলার গ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর আক্রমণ সূচিত করেন। তিনি দাবি করেন, ইরান কার্যত আমেরিকার উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। অন্য কোনও দেশ কি এমনি অসম্মান মেনে নিত? ইরানে সংঘটিত মারাত্মক অপরাধের জন্যে একজন আমেরিকান পরিচারিকা বিনা শাস্তিতে পার পেয়ে যাবে, অথচ একজন আমেরিকানের কুকুরকে মাড়িয়ে যাওয়ার দোষে ইরানিকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তিনি উপসংহার টানেন:
ইরানি জনগণের পক্ষে আর কোনও নিরাময় নেই। আগামী শীতে দরিদ্র জনসাধারণের কী হবে ভেবে আমি উদ্বিগ্ন, আমার ধারণা, আল্লাহ না করুন, অনেকেই শীত ও অনাহারে প্রাণ হারাবে। মানুষের উচিত গরীবের কথা ভাবা, গত শীতের নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর পদক্ষেপ নেওয়া। উলেমাদের এই লক্ষ্যে চাঁদা চাইতে হবে।৪৯
এই ভাষণের পর খোমেনিকে দেশান্তরী করা হয়, শেষ পর্যন্ত পবিত্র শিয়া নগরী নাজাফে অবস্থান নেন তিনি।
কাসকগোষ্ঠী এবার যাজকদের বাকরুদ্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। খোমেনির বিদায়ের পর সরকার ধর্মীয়ভাবে দান করা সম্পত্তি (ওয়াকফ) বাজেয়াপ্ত করা শুরু করে ও মাদ্রাসাসমূহকে কঠোর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এর ফলে ১৯৬০-র দশকের শেষের দিকে ধর্মতাত্ত্বিক ছাত্রের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল।° ১৯৭০ সালে আয়াতোল্লাহ রিযা সায়দিকে ইরানে আমেরিকান বিনিয়োগ বৃদ্ধির পক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনের বিরোধিতা ও শাসকগোষ্ঠীকে ‘সাম্রাজ্যবাদের স্বৈরাচারী চর’ হিসাবে নিন্দা করার দায়ে নিপীড়ন করে হত্যা করা হয়। কুমে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে, এদিকে তেহরানে আয়াতোল্লাহ সায়দির মসজিদের সামনে আয়াতোল্লাহ তালেকানির ভাষণ শোনার জন্যে এক বিরাট জনতা সমবেত হয়।৫১ একই সময়ে সরকার রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত এক ধরনের ‘সরকারী ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায়: গ্রামাঞ্চলে ডিপার্টমেন্ট অভ রিলিজিয়াস প্রপাগান্ডা ডিপার্টমেন্টের সাথে নিবিড় সহযোগিতায় কাজ করার জন্যে সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতাত্ত্বিক অনুষদ থেকে পাস করা সাধারণ স্নাতকদের নিয়ে একটি ধর্মীয় বাহিনী গঠন করা হয়। ‘আধুনিকায়নের এই মোল্লাহদের সাধারণ কৃষকদের কাছে শ্বেত বিপ্লবের ব্যাখ্যা করতে হত, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, সেতু ও জলাধার নির্মাণ, গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধক টিকা দানের কাজ করতে হত। ঐতিহ্যবাহী উলেমাদের খাট করার পরিষ্কার প্রয়াস ছিল এটা।৫২ কিন্তু ইরান ও শিয়াহ মতবাদের সম্পর্কচ্ছেদের জন্যে শাহ যাপরনাই উদগ্রীব ছিলেন। ১৯৭০ সালে ইসলামি ক্যালেন্ডার বাতিল করে দেন তিনি, পরের বছর প্রাচীন ইরানি রাজন্ত্রের ২৫০০ তম বার্ষিকী স্মরণে পারসেপোলিসে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটা কেবল ইরানে ধনী ও দরিদ্রদের ভেতর বিশাল ফারাকের অশ্লীল প্রদর্শনীই ছিল না, বরং ইসলামের প্রাক ইসলামি ঐতিহ্যের মাঝে শাসকগোষ্ঠীর ইরানের আত্মপরিচয় খোঁজার ইচ্ছা সম্পর্কে জনগণের মনে প্রবল ধারণা জেগেছিল।
ইরানিরা ইসলামকে হারিয়ে ফেললে, নিজেদেরই হারাবে তারা। এটাই ছিল ক্যারিশম্যাটিক তরুণ দার্শনিক ডক্টর আলি শরিয়তির (১৯৩৩-৭৭) বার্তা, ১৯৬০- র দশকের শেষের দিকে যাঁর লেকচার হলে পাশ্চাত্য শিক্ষিত তরুণরা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ভীড় জমাতো।৫৩ শরিয়তির প্রচলিত মাদ্রাসার শিক্ষা ছিল না, বরং ইউনিভার্সিটি অভ মাশাদ ও সরবোর্নে পড়াশোনা করেছেন তিনি, সেখানে পারসিয় দর্শনের উপর অভিসন্দর্ভ লিখেছেন ও ফরাসি অরিয়েন্টালিস্ট লুই মাসির্গ, অস্তি ত্ববাদী দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র ও তৃতীয় বিশ্ব আদর্শবাদী ফ্রান্য ফানোর রচনা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, আধুনিক ইরানিদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না করেই তাদের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটানোর মতো একটি ভিন্ন শিয়া আদর্শ গড়ে তোলা সম্ভব। ইরানে ফিরে শেষ পর্যন্ত উত্তর তেহরানের ১৯৬৫ সালে দানবীর মুহাম্মদ হুমায়ুন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষালয় হুসাইনিয়াহতে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নেন শরিয়তি। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে সংস্কারবাদী উলেমাদের ভাষণে আলোড়িত হয়ে ইরানি তরুণ সমাজের কাছাকাছি পৌঁছতে হুসাইনিয়াহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হুমায়ুন। ইরানে হুসাইনিয়াহ ছিল ইমাম হুসেইনের প্রতি নিবেদনের একটি কেন্দ্র; সাধারণত মসজিদের পাশে নির্মাণ করা হত এগুলো। কারবালার কাহিনী হুসাইনিয়াহতে পড়তে আসা ছাত্রদের উন্নত সমাজের জন্যে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে, এমন আশা করা হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের অব্যবহিত পরে মধ্যপ্রাচ্যে আবির্ভূত ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল ইরান। ১৯৬৮ সাল নাগাদ এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সহায়তাকারী অন্যতম সংস্কারক আয়াতোল্লাহ মোতাহারি লিখতে পেরেছিলেন যে, হুসাইনিয়াহকে ধন্যবাদ, ‘আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজ বিস্ময়ের একটি পর্ব অতিক্রম করার পর, এমনকি [ধর্মের] দ্বারা বিতৃষ্ণ হয়েও এখন মনোযোগ দিচ্ছে এবং একে অগ্রাহ্যকারীর বেলায় উদ্বেগ দেখাচ্ছে।’৫৪ আর কোনও বাগ্মী শরিয়তির মতো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেননি। ছাত্ররা দুপুরের খাবার সময় বা কাজের পর তাঁর ভাষণ শোনার জন্যে ছুটে যেত, তাঁর বাগ্মীতার আবেগ ও প্রাবল্যে অনুপ্রাণিত ছিল তারা। তাঁর সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারত তারা, অনেকে তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো মনে করেছে।৫৫
