কেন মুখ খোলার জন্যে এই মুহূর্তটিকে বেছে নিয়েছিলেন খোমেনি? সারা জীবন মোল্লা সদ্রার তালিম দেওয়া ইরফানের অতীন্দ্রিয়বাদী অনুশীলন চর্চা করেছেন তিনি। সদ্রার মতো খোমেনির কাছেও অতীন্দ্রিয়বাদ ও রাজনীতি অবিচ্ছেদ্য ছিল। আধ্যাত্মিক সংস্কারের সাথে পরিচালিত না হলে সমাজের কোনও রকম সামাজিক সংস্কার হতে পারে না। পরলোকগমনের আগে ইরানের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর শেষ ভাষণে খোমেনি ইরফানের পাঠ ও তার চর্চা চালিয়ে যাবার আবেদন রেখেছেন, উলেমাগণ এই অনুশীলনটিকে অবহেলা করে এসেছেন। খোমেনির চোখ মিথোসের সাথে সম্পর্কিত অতীন্দ্রিয়বাদী অনুসন্ধানকে অবশ্যই লোগোসের বাস্তব কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে। খোমেনির সাথে যারা সাক্ষাৎ করেছেন তারা সব সময়ই আধ্যাত্মিকতায় তাঁর স্পষ্ট মগ্নতায় বিস্মিত হয়েছেন। তাঁর উদাস মনোভোব, অন্তর্মুখী দৃষ্টি ও ভাষণের ইচ্ছাকৃত একঘেয়েমি (পশ্চিমারা যাকে বিতৃষ্ণ মনে করেছে) শিয়াদের কাছে অনায়াসে ‘সোবার’ অতীন্দ্রিয়বাদীর লক্ষণ মনে হয়েছে। অন্তস্থঃ যাত্রা কালে প্রায়শঃই উন্মুক্ত হওয়া আবেগীয় চরম অবস্থার কাছে নতি স্বীকার করে ‘মাতাল’ সুফি ও অতীন্দ্রিয়বাদীদের বিপরীতে ‘সোবার’ অতীন্দ্রিয়বাদীগণ বাড়াবাড়িকে দূরে ঠেলে রাখার জন্যে ইস্পাত কঠিন আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা করেন। মোল্লা সদ্রা উম্মাহর নেতার (ইমাম) আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়েছেন। রাজনৈতিক মিশন শুরুর আগে তাকে অবশ্যই মানুষ থেকে আল্লাহর উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে, নিজেকে আল্লাহর পরিবর্তনকারী দর্শনের কাছে উন্মুক্ত করতে হবে, এবং নিজেকে আত্মউপলব্ধির পথে বাধা অহমকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কেবল এই দীর্ঘ ও শৃঙ্খলিত যাত্রার শেষেই তিনি, যেমন বলা হয়েছে, জাগতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে এসে আল্লাহ’র বাণী প্রচার করতে এবং সমাজে স্বর্গীয় বাণীর বাস্তবায়ন ঘটাতে পারবেন। আমেরিকান পণ্ডিত হামিদ আলগার বলছেন, ১৯৬৩ সালে শাহর বিরুদ্ধ বক্তব্য রাখতে শুরু করার সময় প্রাথমিক ও আবশ্যক ‘আল্লাহর অভিমুখে যাত্রা’ শেষ করেছিলেন খোমেনি।৪৪
কয়েকদিন কারাগারে আটক রাখার পর খোমেনিকে মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু সাথে সাথে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় সাভাকের আক্রমণের চল্লিশ দিন পরে ছাত্ররা নিহতদের স্মরণে ঐতিহ্যবাহী শোক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এখানে দেওয়া ভাষণে খোমেনি এই আক্রমণকে ১৯৩৫ সালে মাশাদের উপাসনালয়ে রেযা শাহর পরিচালিত আক্রমণের সাথে তুলনা করেন, তখন শত শত বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছিল। গোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে থাকেন তিনি। শেষে কারবালায় ইমাম হুসেইনের শাহাদৎ বার্ষিকী আশুরার উৎসবে (৩রা জুন, ১৯৬৩) একটি শোকগাথা পাঠ করেন খোমেনি, রওদাহয় এই সময় প্রথা অনুযায়ী জনগণ কান্নাকাটি করছিল। খোমেনি দাবি করেন, শাহ হচ্ছেন কারবালার খলনায়ক ইয়াযিদের মতো। গত মার্চে ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় আক্রমণ চালানোর সময় পুলিস কেন কোরান ছিঁড়ে ফেলল? তারা কেবল উলেমাকে গ্রেপ্তার করতে চেয়ে থাকলে কেন তবে মাত্র আঠার বছরের এক ছাত্রকে হত্যা করতে গেল, যে কিনা কোনওদিন শাসকদের বিরুদ্ধে কিছু করেনি? উত্তর হচ্ছে শাহ খোদ ধর্মকেই ধ্বংস করতে চান। তাঁর প্রতি সংস্কারের আবেদন জানান তিনি:
আমাদের দেশ, আমাদের ইসলাম বিপদাপন্ন। যেসব ঘটনা ঘটছে, ঘটতে যাচ্ছে, আমাদের তা উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ণ করে তুলছে। আমরা আমাদের এই বিধ্বস্ত দেশের অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ন। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যাতে একে সংস্কার করা যায়।৪৫
পরদিন সকালে আবার গ্রেপ্তার হন খোমেনি। এবার ঘটে বিস্ফোরণ। খবর শোনামাত্র হাজার হাজার ইরানি তেহরান, মাশাদ, শিরাজ, কাশান ও ভারামিনে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় সাভাক বাহিনীকে; তেহরানের জনগণকে শুক্রবারের জুম্মার নামাজ পড়া থেকে বিরত রাখতে ট্যাংক দিয়ে মসজিদ ঘেরাও করে ফেলা হয়। তেহরান, কুম আর শিরাজে নেতৃস্থানীয় উলেমাগণ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। অন্যরা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিহাদের আহবান জানান। কেউ কেউ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকার প্রমাণ দিতে কাফনের শাদা কাপড় পরেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্র, আর মোল্লাহ ও সাধারণ জনগণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে। তলে তলে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা বিশাল টানাপোড়েন ও অসন্তোষ তুলে ধরা এই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েকদিন সময় লাগে সাভাকের। ১১ই জুন অবশেষে যখন শৃঙ্খলা ফিরে আসে, শত শত ইরানি প্রাণ হারিয়েছিল।৪৬
স্বয়ং খোমেনি অল্পের জন্যে বেঁচে গিয়েছিলেন। অন্যতম প্রবীন মুজতাহিদ আয়াতোল্লাহ মুহাম্মদ কাযিম শরিয়তমাদারি (১৯০৪-৮৫) গ্র্যান্ড আয়াতোল্লাহ পদে উন্নীত করে খোমেনিকে রক্ষা করেছিলেন, ফলে তাঁকে হত্যা করা শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।৪৭ মুক্তির পর খোমেনি জনগণের কাছে নায়কে পরিণত হন। বিরোধিতার প্রতীক হিসাবে সর্বত্র তাঁর ছবি আবির্ভূত হয়। নিজেকে সঠিক স্থানে স্থাপন করে শাহর প্রতি আরও বহু ইরানির মনের অপ্রকাশিত বিতৃষ্ণাকে ভাষা দিয়েছিলেন তিনি। খোমেনির দর্শন সাধারণ মৌলবাদী বিকৃতিতে ভ্রান্তিময়। তিনি তাঁর ভাষণে অবিরাম ইহুদি, ক্রিশ্চান ও সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে গেছেন, সাভাকের সাথে সিআইএ ও মোসাদের সংশ্লিষ্টতার কারণে বহু ইরানি একে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছে। এটা ছিল ক্ষোভের ধর্মতত্ত্ব।৪৮ তবে খোমেনি ইরানিদের বোধগম্য ভাষায় বৈধ অসন্তোষ প্রকাশে সক্ষম করে তুলেছিলেন। মার্ক্সবাদী বা উদারনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত সমালোচকরা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অনাধুনিকায়িত ইরানিদের বাদ দিতেন, সেখানে প্রত্যেকে কারাবালার প্রতীকীবাদ বুঝতে পেরেছিল। অন্য আয়াতোল্লাহদের বিপরীতে খোমেনি দূরবর্তী, কেতাবি ঢঙে কথা বলেননি; তাঁর ভাষণ ছিল প্রত্যক্ষ, মাটি ঘেঁষা, সাধারণ মানুষের উদ্দেশে দেওয়া। পশ্চিমা জনগণ খোমেনিকে মধ্যযুগে প্রত্যাবর্তনকারী মনে করে, কিন্তু আসলে তাঁর অধিকাংশ বার্তা ও বিকাশমান ধর্মতত্ত্বই ছিল আধুনিক। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও প্যালেস্তাইনিদের প্রতি সমর্থন এই সময় অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলনের অনুরূপ; জনগণের কাছে তাঁর সরাসরি আবেদনও তাই।
