ইরানি উলেমাগণ মিশরিয় যাজকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলেন। অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে সাধারণ জনগণকে সমর্থন দিতে হলে নিজেদের ও তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহকেও আধুনিকায়তি করতে হবে। মৌলিক শিয়া নীতিমালাকে আহত করে চলা শাহর স্বৈরাচরী শাসন এবং ধর্মের প্রতি স্পষ্ট নিরাসক্ততায় ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিলেন তাঁরা। ১৯৬০ সালে যাজকদের যেকোনও রকম রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণাকারী প্রধান মারজা আয়াতোল্লাহ বোরুজারদি শাহর ভূমি সংস্কার আইনের নিন্দা জানাতে এগিয়ে আসেন। তাঁর এই ইস্যু হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপারটা ছিল দুঃখজনক, কারণ উলেমাদের তা স্বার্থপর ও প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে তুলে ধরেছিল, যাদের অনেকেই ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। আসলে বোরুজারদির হস্তক্ষেপ সম্ভবত এটাই কীলকের সংকীর্ণ ডগা হয়ে থাকার এই সহজাত ভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল। ভূমি সংস্কার মালিকানার শরীয়াহ বিধানের পরিপন্থী ছিল, বোরুজারদি হয়তো কোনও একটি ক্ষেত্রে জনগণকে ইসলামি আইনে প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ব্যাপারটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে এবং তা আরও খারাপ হয়ে উঠতে পারে ভেবে ভয় পেয়েছিলেন। পরের বছর মার্চে বোরুজারদি মারা যাবার পর মারজা’র পদ আর পূরণ করা হয়নি। উলেমাদের একটি গ্রুপ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন যে, শিয়া মতবাদকে আরও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে হবে, জটিল নতুন বিশ্বে একজন মাত্র ব্যক্তির পরম নির্দেশকে পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা বাস্তব সম্মত নয়। প্রত্যেকের নিজস্ব বিশেষত্ব সম্পন্ন কয়েকজন মারাজিকে নিয়ে নতুন নেতৃত্ব হতে পারে। স্পষ্টই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া ছিল এটা, ইসলামি বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখা বেশ কয়েক জন যাজক সংস্কারবাদী উলেমাদের এই দলে ছিলেন: আয়াতোল্লাহ সায়ীদ মুহাম্মদ বিহিশতি; বিজ্ঞ ধর্মবেত্তা মোতা মোতাহারি; আল্লামাহ মুহাম্মদ-হুসেইন তাবাতাবাতি; এবং সবচেয়ে রেডিক্যাল ইরানি যাজক আয়াতোল্লাহ মাহমুদ তালেকানি। ১৯৬০ সালে বসন্তে বেশ কিছু বক্তৃতা অনুষ্ঠান করেন তাঁরা, এবং পরের বছর শিয়া মতবাদকে হালনাগাদ করার বিষয়ে বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করা একটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ করেন।
একটা বিষয়ে সংস্কারকগণ নিশ্চিত ছিলেন যে, ইসলামে যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, তাই উলেমাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার বেলায় এতটা সতর্ক থাকা উচিত নয়। যাজকীয় শাসন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেননি তাঁরা, তবে রাষ্ট্র স্বৈরাচরী বা জনগণের চাহিদার প্রতি নির্বিকার হয়ে উঠছে অনুভব করার পর বিশ্বাস করেছেন যে, ঠিক তামাক সংকট ও সাংবিধানিক বিপ্লবের সময় যেমন করেছিলেন, শাহদের বিরুদ্ধে ঠিক সেভাবে উলেমাদের রুখে দাঁড়ানো উচিত। ফিকহ’র উপর অতিরিক্ত মনোযোগ হ্রাস করার জন্যে মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমকে পর্যালোচনা করে নতুন করে সাজানোর যুক্তি দেখিয়েছেন তাঁরা। যাজকদের তাদের আর্থিক ব্যবস্থাকেও যৌক্তিক করতে হবে: বর্তমানে স্বেচ্ছা দানের উপর বেশি নির্ভরশীল তাঁরা, লোকজন যেহেতু রক্ষণশীল মানসিকতার, তাই এটা তাদের মৌলিক পরিবর্তন থেকে দূরে রেখেছে। ইজতিহাদের গুরুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সত্যিই জনগণের সেবা করতে চাইলে শিয়াদের অবশ্যই ব্যবসা, কূটনীতি ও যুদ্ধের মতো আধুনিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। সবার উপরে ছাত্রদের কথা শুনতে হবে। ১৯৬০-র দশকের তরুণ সমাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত, এরা পুরোনো প্রপাগান্ডা হজম করবে না। ধর্ম থেকে এদের দূরে সরে যাওয়ার কারণ তাদের সামনে তুলে ধরা শিয়াবাদের রূপ প্রাণহীন, প্রাচীন ধরনের। পশ্চিমে তরুণ সংস্কৃতি পুরোপুরিভাবে বিকশিত হওয়ার আগেই ইরানি যাজক সমাজ তরুণদের সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের সংস্কার আন্দোলনে মুষ্টিমেয় কয়েকজন উলেমা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; সাধারণ জনগণের কাছে তা পৌছেনি, শাসকেদের সমালোচনা করার কোনও প্রয়াস পাননি তাঁরা। কেবলই শিয়াদের অভ্যন্তরীণ বিষয়-আশয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু ধর্মীয় বলয়ে প্রচুর আলোচনার জন্ম দিয়েছে ও যাজকগোষ্ঠীর সিংহভাগকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে গেছে।৪২ কিন্তু সহসা এপর্যন্ত অলক্ষ্যে থাকা একজন যাজক পত্রিকার শিরোনাম কেড়ে নিলে উলেমাগণ বিস্মিত হয়ে পড়েন, আরও রেডিক্যাল অবস্থানে চলে যান তাঁরা।
১৯৬০-র দশক নাগাদ ক্রমেই অধিক সংখ্যায় ছাত্ররা কুমের ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় আয়াতোল্লাহ খোমিনির ইসলামি নৈতিকতার উপর শিক্ষাক্রমের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল। কথিত আছে, ক্লাস চলার সময় তিনি পুলপিট ছেড়ে নেমে এসে, ‘অফ দ্য রেকর্ড’ ছাত্রদের সাথে মেঝেয় বসে প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করতেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে অকস্মাৎ এই আড়াল ছেড়ে বের হয়ে পুলপিট থেকেই স্বীয় ক্ষমতাবলে শাহর বিরুদ্ধে অবিরাম প্রত্যক্ষ আক্রমণ শুরু করেন, তাঁকে ইসলামের শত্রু হিসাবে চিত্রায়িত করেন। যখন শাসকের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার মতো সাহস ছিল না কারও, শাহর শাসনের নিষ্ঠুরতা ও অবিচার, তাঁর অসাংবিধানিকভাবে মজলিস ভেঙে দেওয়া, নির্যাতন, সকল বিরোধী দলের অপ নিষিদ্ধকরণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শাহর ভীরু আত্মসমর্পণ এবং প্যালেস্তাইনিদের আবাস থেকে বঞ্চিতকারী ইসরায়েলের প্রতি তাঁর সমর্থনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন খোমেনি। বিশেষ করে গরীবের অসহায় অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি: শাহর উচিত তাঁর চোখ ধাঁধানো প্রাসাদ থেকে বের হয়ে দক্ষিণ তেহরানের বস্তি এলাকায় একবার ঘুরে আসা। একবার নাকি এক হাতে কোরানের একটি কপি ও অন্য হাতে ১৯০৬ সালের সংবিধানের কপি নিয়ে এগুলো রক্ষার জন্যে নেওয়া তার নেওয়া শপথ ভঙ্গ করার অভিযোগ তোলেন তিনি। ২২শে মার্চ, ১৯৬৩ ষষ্ঠ ইমামের (যাঁকে ৭৬৫ সালে খলিফা আল-মনসুর বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিলেন) শাহাদৎ বার্ষিকীতে সাভাক বাহিনী মাদ্রাসা ঘেরাও করে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা করে। খোমেনিকে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয় পদক্ষেপ নেওয়ার বেলায় শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে আনাড়ী ও আত্মধ্বংসী দিন ছিল এটা। খোমেনির সাথে দীর্ঘ সংগ্রামে অবিরাম শাহ যেন স্বাভাবের বাইরে গিয়ে নিজেকে স্বৈারচারী শাসক ও ইমামদের শত্রু হিসাবে তুলে ধরেছেন।
