কৃষিক্ষেত্রে অবনতির কারণে গ্রাম এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের শহরে অভিযাত্রা ঘটেছে: ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৮ সালের ভেতর শহরের জনসংখ্যা শতকরা ৩৮ ভাগ থেকে ৪৭ ভাগে বৃদ্ধি পায়। এই বছরগুলোতে তেহরানের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হয়ে ওঠে, ২.৭১৯ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪.৪৯৬ মিলিয়নে দাঁড়ায়। গ্রামের অভিবাসীরা ঠিকভাবে মিশে যেতে পারেনি, শহরের উপকণ্ঠে বস্তি এলাকায় বাস করত তারা; কুলি, ট্যাক্সি ড্রাইভার ও রাস্তার হকার হিসাবে কোনওমতে জীবন যাপন করত। অধুনিক ও প্রচলিত ধারায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল তেহরান: পুরোনো শহর থেকে পাশ্চাত্যকৃত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী নতুন আবাসিক এলাকা এবং শহরের উত্তরের বার আর ক্যাসিনোর অবস্থান রয়েছে, মহিলারা যেখানে পশ্চিমা কায়দায় পোশাক পরে, এবং প্রকাশ্যে পুরুষের সাথে খোলামেলাভাবে মেশে সেই বাণিজ্যিক এলাকায় চলে আসে। পুরোনো শহর ও সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলে রয়ে যাওয়া বাজারি ও হতদরিদ্রদের কাছে একে বিদেশী কোনও শহর মনে হয়েছে।
ইরানের বিপুল সংখ্যাগিরিষ্ঠ জনগণ এভাবে যারপরনাই মানসিক আবেগে অস্বস্তিকর অবস্থার মোকাবিলা করছিল। পরিচিত বিশ্ব অচেনা হয়ে উঠেছে; শহর থেকেও যেন নেই; অসুস্থতার কারণে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়া কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। ১৯৬০-র দশকে ইরান যেভাবে দ্রুত বদলে গেছে বিশ্ব যখন সেভাবে বদলে যায়, নারী-পুরুষ নিজেদের আগন্তুক ভাবতে শুরু করে। ক্রমবর্ধমানহারে উদ্বেগজনক সংখ্যক ইরানি কোথাওই স্বস্তি বোধ করছে না বলে আবিষ্কার করেছিল। ১৯৫৩ সালের বিপর্যয় অনেককেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে পরাজয় ও অপমানের ক্ষয়িষ্ণু বোধে তাড়িত করেছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষাধারী অল্প কজন যারা বাবা-মা ও পরিবারের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেছে, দুটো জগতের মাঝখানে পড়ে কোনওটাতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না। জীবন অর্থহীন মনে হয়েছে। ১৯৬০-র দশকের দ্রুতপ্রজ সাহিত্যে সবচেয়ে পুনরাবৃত্ত প্রতীক বেড়ে ওঠা বিচ্ছিন্নতা তুলে ধরেছে: দেয়াল, একাকীত্ব, অর্থহীনতা, নৈঃসঙ্গ ও কপটতা। সমসাময়িক ইরানি সমালোচক ফাযানেহ মিলানি ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে ‘সংরক্ষণ ও গোপনীয়তার মেধাবী’ নাছোড় ইমেজারির কথা উল্লেখ করেছেন।
দেয়াল ঘিরে রাখে বাড়িকে। বোরখা মেয়েদের। ধর্মীয় তাকিয়াহ বিশ্বাসকে রক্ষা করে। তারোফ [ডিসকোর্সের আচরিক ধরণ] প্রকৃত ভাবনা ও আবেগকে আড়াল করে। বাড়িঘর দারনি [অন্দরমহল], বিরুনি [বহির্মহল] আর বাতিনি [গোপন] বলয়ে বিভক্ত হয়ে গেছে।৩৫
ইরানিরা নিজেদের কাছ থেকে এবং অন্যদের কাছ থেকে নিজেদের আড়াল করছিল। দারুণ ভীতিকর জায়গায় পরিণত হয়ে ওঠা পাহলভী রাষ্ট্রে তারা আর নিরাপদ বোধ করছিল না।
কেবল স্বৈরাচারী শাসন ও সকল বিরোধিতাকে স্তব্ধ করে সংস্কারকে এগিয়ে নিতে পারবেন ভেবে মজলিসকে নিষিদ্ধ করে শ্বেত বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন শাহ। ১৯৫৭ সালে আমেরিকার সিআইএ ও ইসরায়েলি মোসাদের সহযোগিতায় তৈরি গোপন পুলিস সাভাক সহায়তা দেয় তাঁকে। সাভাকের নিষ্ঠুর কায়দা, অত্যাচার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজত্ব জনগণের মনে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশে নিজ দেশে কারাবন্দি থাকার ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিল।৩৬ ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে এই সময়ে উন্নয়নশীল দেশে আবির্ভূত হতে চলা গেরিলা গ্রুপের আদলে দুটি প্যারামিলিটারি দল গঠন করা হয়েছিল: বর্তমানে নিষিদ্ধ তুদেহ ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টির সদস্যদের নিয়ে গঠিত মার্ক্সবাদী গ্রুপ ফেদাইন-ই খালক ও ইসলামি বাহিনী মুজাহিদিন-ই খালক। শক্তিকেই সকল স্বাভাবিক বিরোধিতার পথ রুদ্ধকারী সম্মতি নয় বরং নির্যাতনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একমাত্র উপায় মনে করা হয়েছে।
বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন ধারণার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রয়াস পেয়েছেন। দেশের অস্থিরতার কারণে অস্বস্তিতে ছিলেন তাঁরা, বুঝতে পারছিলেন যে আধুনিকায়ন মাত্রাতিরিক্ত দ্রুত গতিতে চলায় ব্যাপকবিস্তৃত বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে। ১৯৬০-র দশকের শেষের দিকে ইউনিভার্সিটি অভ তেহরানের প্রফেসর পদে উন্নীত অসাধারণ মেধাবী দার্শনিক আহমাদ ফরিদ (১৯১২-৯৪) ইরানি টানপোড়েনকে বোঝাতে গার্বজাদেগি (‘পাশ্চাত্য আসক্তি’) শব্দটি তৈরি করেন: মানুষ পশ্চিমের কারণে বিষে আক্রান্ত ও দূষিত হয়েছে; তাদের অবশ্যই একটা ভিন্ন পরিচয় গড়ে তুলতে হবে।৭ সেক্যুলারিস্ট ও এককালের সমাতন্ত্রী জালাল আল-ই আহমাদ (১৯২৩-৬৯) এই ধারণাটি আরও বিস্তৃত করেন, তাঁর গার্বজাদেগি (১৯৬২) ১৯৬০-র দশকে ইরানিদের কাছে একটি কাল্ট গ্রন্থে পরিণত হয়েছিল। এই ‘শেকড়হীনতা’ ও ‘অক্সিডেন্টোসিস’ এক রকম ‘উপযুক্ত পরিবেশে বিস্তার ঘটা বাইরের রোগ। ‘কোনও রকম সমর্থক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক পটভূমিহীন, পরিবর্তনের কোনও রকম উপাদান বিহীন’ এক জাতির দুঃখ।৩৮ এই মহামারী ইরানের অখণ্ডতাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারে, এর রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিনাশ ঘটাতে পারে, ধ্বংস করে দিতে পারে অর্থনীতিকে। কিন্তু আল-ই আহমাদ নিজেই টানাপোড়েনে ভুগছিলেন: সার্ত্র এবং হেইদেগারের মতো পাশ্চাত্য লেখকদের রচনায় আকৃষ্ট ছিলেন তিনি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মতো পাশ্চাত্য আদর্শের আকর্ষণ বোধ করেছেন; কিন্তু ইরানের অচেনা ভূমিতে কেমন করে তাকে রোপন করা যাবে সেটা বুঝতে পারেননি। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত দুই দিকে আকর্ষণবোধকারী ইরানিদের যাকে বলে ‘অ্যাগোনাইজড সিযোফ্রেনিয়া’ তুলে ধরেছেন৩৯ এবং সমস্যাটাকে স্মরণীয়ভাবে প্রকাশ করতে পারলেও কোনও সমাধান প্রস্তাব করতে পারেননি-যদিও মনে হয় যে, জীবনের শেষদিকে তিনি শিয়াবাদকে প্রকৃত জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি ও পাশ্চাত্যকরণের রোগের উপশমসুলভ বিকল্পে পরিণত হতে পারার মতো প্রকৃত ইরানি প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। ৪০
