বাস্তব বলয়ে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করেছে, কিন্তু তা আমাদের বিষাদ প্রশমিত করতে পারে না। স্পেনিয় বিপর্যয়ের পর কাব্বালিস্টরা আবিষ্কার করেছিল যে আল-আন্দালুসের ইহুদিদের ভেতর জনপ্রিয় দর্শনের যৌক্তিক অনুশীলন তাদের বেদনার প্রশমন ঘটাতে পারছে না।২১ জীবনকে মনে হয়েছে অর্থহীন; আর জীবনে অর্থ না থাকলে মানুষ হতাশায় ডুবে যেতে পারে। জীবনকে সহনীয় করে তুলতে মিথোস ও অতীন্দ্রিয়বাদের শরণাপন্ন হয়েছিল নির্বাসিতরা; এটা তাদের বেদনা, ক্ষতি ও আকাঙ্ক্ষার অবচেতন উৎসের সাথে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম করে তোলে ও এমন এক দৃশ্যের সাথে তাদের জীবনকে বেঁধে দিয়েছিল যা তাদের জন্যে স্বস্তি বয়ে এনেছে।
অবশ্য এটা লক্ষণীয় যে, ইগনাশিয়াস অভ লায়োলার বিপরীতে লুরিয়া ও তাঁর শিষ্যগণ ইহুদিদের রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কোনও বাস্তব পরিকল্পনা নির্মাণ করেননি। কাব্বালিস্টরা ইসরায়েলের ভূমিতে থিতু হয়েছিল, কিন্তু তারা যায়নিস্ট ছিল না। লুরিয়া ইহুদিদের পবিত্র ভূমিতে পাড়ি জমানোর মাধ্যমে নির্বাসনের ইতি টানার তাগিদ দেননি। তিনি তাঁর মিথলজি বা অতীন্দ্রিয় দর্শনকে সক্রিয় কর্মকাণ্ডের নীলনকশা সৃষ্টি করার মতো কোনও আদর্শ গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করেননি। মিথোসের কাজ ছিল না এটা, এই ধরনের সমস্ত বাস্তব পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল লোগোসের এখতিয়ার-যৌক্তিক আলোচনামূলক চিন্তাভাবনা। লুরিয়া জানতেন, তাঁর মিশন হচ্ছে ইহুদিদের অস্তিত্বমূলক ও আধ্যাত্মিক হতাশা থেকে রক্ষা করা। পরে এইসব মিথকে রাজনীতির বাস্তব বিশ্বে প্রয়োগ করা হলে তার ফল ছিল প্রলয়ঙ্করী, যেমনটা আমরা এই অধ্যায়ে দেখতে পাব।
কাল্ট বিহীন, প্রার্থনা বিহীন ও আচার বিহীন মিথ ও মতবাদের কোনও অর্থ থাকে না। কাব্বালিস্টদের কাছে মিথকে বোধগম্য করে তোলা বিশেষ অনুষ্ঠান ও আচার বিনা লুরিয়ার সৃষ্টি-কাহিনী অর্থহীন একটা গল্পই রয়ে যেত। কেবল কোনও ধরনের ধর্মীয় শাস্ত্রীয় পরিপ্রেক্ষিতেই একটি ধর্মীয় বিশ্বাস অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ যদি এই ধরনের আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত হয়, তারা তবে বিশ্বাস হারাবে। ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষা নিয়ে ইবারিয় পেনিনসুলায় থেকে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কিছু সংখ্যক ইহুদির বেলায় ঠিক তাই ঘটেছিল। ধ্যান করে না, আচার অনুষ্ঠান পালন করে না বা আনুষ্ঠানিক লিটার্জিতে অংশ নেয় না, এমনি অনেক আধুনিক মানুষের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে যারা পরে আবিষ্কার করেছে যে ধর্মের মিথগুলো তাদের কাছে কোনও অর্থ বহন করছে না। কনভার্সোদের অনেকেই নিজেদের ক্যাথলিসিজমের সাথে একাত্ম করে নিতে পেরেছিল। কেউ কেউ প্রকৃতপক্ষেই, যেমন সংস্কারক হুয়ান দে ভালদেস (১৫০০-৪১) ও হুয়ান লুইস ভিভে (১৪৯২- ১৫৪০)-এর মতো ব্যক্তিরা কাউন্টার রিফর্মেশনের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন ও প্রাথমিক কালের আধুনিক সংস্কৃতিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন ঠিক যেভাবে কার্ল মার্ক্স, সিগমান্ড ফ্রয়েড, এমিলি দার্কহেইম, আলবার্ট আইনস্টাইন ও লুদভিগ ভিগেইস্তাইনের মতো সেক্যুলারায়িত ইহুদিরা মূলধারার সমাজে একীভূত হওয়ার পর পরবর্তীকালের আধুনিকতায় অবদান রেখেছেন।
এই প্রভাবশালী কনভার্সোদের অন্যতম বর্ণাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন তেরেসা অভ আভিলা (১৫১৫-৮২), জন অভ দ্য ক্রসের শিক্ষক ও পরামর্শদাতা এবং ডক্টর অভ চার্চ উপাধি লাভকারী প্রথম নারী। স্পেনে আধ্যাত্মিকতার সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন তিনি। তিনি বিশেষ করে ভালো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ও প্রায়শঃই অদক্ষ আধ্যাত্মিক নির্দেশকদের হাতে অস্বাস্থ্যকর অতীন্দ্রিয় অনুশীলনের শিকার হওয়া নারীদের ধর্মীয় বিষয়ে যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা করার বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, হিস্টিরিয়াসুলভ ঘোর, দিব্যদৃষ্টি ও উন্মত্ততার সাথে পবিত্রতার কোনও সম্পর্ক নেই। অতীন্দ্রিয়বাদ চরম দক্ষতা, শৃঙ্খলিত মনোসংযোগ, ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রফুল্ল, বিচক্ষণ শারীরিক অবস্থা দাবি করে এবং তাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত ও সতর্কভাবে স্বাভাবিক জীবনে সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে। জন অভ দ্য ক্রসের মতো তেরেসা ছিলেন আধুনিকায়নকারী ও মেধাসম্পন্ন অতীন্দ্রিয়বাদী, তবু তিনি ইহুদি ধর্মে থেকে গেলে তাঁর পক্ষে এই গুণটি গড়ে তোলা সম্ভব হত না, কারণ কেবল পুরুষদেরই কাব্বালাহ অনুশীলনের অনুমতি ছিল। তারপরেও কৌতূহলোদ্দীপকভাবে তাঁর আধ্যাত্মিকতা ইহুদিবাদীই রয়ে গিয়েছিল। দ্য ইন্টেরিয়র ক্যাসল-এ সাতটি স্বগীয় দরবারের ভেতর দিয়ে আত্মার ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর যাত্রাপথের বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এই প্রকল্পের সাথে ইহুদি বিশ্বে একেবারে প্রথম থেকে শুরু করে দ্বাদশ শতাব্দী সিই পর্যন্ত বিকশিত থ্রোন মিস্টিসিজমের লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে। নিবেদিতপ্রাণ ও বিশ্বস্ত ক্যাথলিক ছিলেন তেরেসো, কিন্তু তারপরেও ইহুদির কায়দায় প্রার্থনা করতেন, নানদেরও একইভাবে প্রার্থনা করার শিক্ষা দিতেন।
তেরেসার ক্ষেত্রে ইহুদিবাদ ও ক্রিশ্চানিটি সফলভাবে মিশে যেতে পেরেছিল, কিন্তু কম মেধা সম্পন্ন অন্য কনভার্সোর্রা বিরোধ মোকাবিলা করেছে। এমনি একটি ঘটনা হচ্ছে প্রথম গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর তোমাস দে তোরকেমাদা (১৪২০-৯৮)-র। ২২ তিনি যেমন উৎসাহ নিয়ে স্পেন থেকে ইহুদিবাদের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন সেটা হয়তো অবচেতনভাবে তাঁর নিজের মন থেকেই পুরোনো ধর্মবিশ্বাসকে উৎক্ষিপ্ত করার প্রয়াস হয়ে থাকবে। বেশিরভাগ মারানোই নিপীড়নের মুখে ক্রিশ্চান ধর্ম গ্রহণ করেছিল। মনে হয় তাদের অনেকেই কখনওই পুরোপুরিভাবে নতুন ধর্মবিশ্বাস মেনে নিতে পারেনি। এটা মোটেও তেমন বিস্ময়কর নয়; কেননা দীক্ষা দেওয়ার পর ইনকুইজিটরদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের অধীনে ছিল তারা, তুচ্ছ অভিযোগে যখন তখন আটক হওয়ার ভয়ে ছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালানো, কিংবা শেলফিশ খেতে অস্বীকৃতি কারাদণ্ড, নির্যাতন, মৃত্যু কিংবা আর কিছু না হোক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির মতো ব্যাপারে পর্যবসিত হতে পারত। ফলে অনেকেই ধর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের জীবনকে দুর্দশাগ্রস্ত করে তোলা ক্যাথলিক মতবাদের সাথে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে মানিয়ে নিতে না পারেনি তারা। ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে ব্যাপক উৎখাতের পর স্পেনে আর ধর্মাচারী ইহুদির কোনও অস্তিত্ব ছিল না। মারানোরা গোপনে ইহুদি ধর্ম চর্চা করতে চাইলেও ইহুদি বিধান বা অনুশীলন শিক্ষার কোনও উপায় ছিল না তাদের হাতে। এর পরিণামে কোনও ধর্মের প্রতিই সত্যিকারের আনুগত্য ছিল না তাদের। সেক্যুলারিজমের বহু আগেই নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মের প্রতি নির্লিপ্ততা বাকি ইউরোপে মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়। আমরা ইবারিয় পেনিনসুলার মারানো ইহুদিদের ভেতর এইসব আবিশ্যিকভাবে আধুনিক প্রবণতার উদাহরণ দেখতে পাই।
