মুসলিম দর্শনে জিহাদকে কেন্দ্রিয় অবস্থানে এনে কুতব আসলে পয়গম্বরের জীবনকে বিকৃত করেছেন। প্রচলিত জীবনীকারগণ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রথম উম্মাহকে টিকে থাকার জন্যেই লড়াই করতে হয়েছিল, মুহাম্মদ (স) তলোয়ারের সাহায্যে বিজয় লাভ করেননি, বরং অহিংসার সৃজনশীল ও মেধাবী কৌশলে সেটা অর্জিত হয়েছে। কোরান সকল সহিংসতাকে ঘৃণিত হিসাবে প্রবলভাবে নিন্দা করে। কেবল আত্মরক্ষায় যুদ্ধের অনুমোদন দিয়েছে। কোরান ধর্মীয় বিষয়ে শক্তিপ্রয়োগের ঘোর বিরোধী। এর দর্শন অন্তর্ভুক্তিমূলক, অতীতের সকল মহান পয়গম্বরের প্রশংসা করেছে।২৬ পরলোকগমনের আগে তাঁর সম্প্রদায়ের উদ্দেশে মুহাম্মদ (স) শেষ যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি সকল মানুষ যেহেতু ভাই, তাই ধর্মকে ব্যবহার করে তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্যে মুসলিমদের তাগিদ দিয়েছেন: ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার।২৭ বর্জন ও বিচ্ছিন্নতার কুতবের এই দর্শন এই গ্রহণের সহিষ্ণুতা বিরোধী। কোরান স্পষ্টভাবে এবং গুরুত্বের সাথে জোর দিয়ে বলেছে ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।২৮ কুতব একে সীমিত করেছেন: ইসলামের রাজনৈতিক বিজয় প্রকৃত মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই কেবল সহিষ্ণুতা থাকতে পারে।২৯
নতুন আপসোহীনতা মৌলবাদী ধর্মের মূল ভিত্তি গভীর ভীতি থেকে উৎসারিত। কুতব ব্যক্তিগতভাবে আধুনিক জাহিলিয়াহর খুনে ও বিধ্বংসী ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। নাসের যেন ইসলামকে মুছে ফেলতে বদ্ধ পরিকর বলে মনে হয়েছে। তিনি একা ছিলেন না। ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানোর সময় কুতবের মনে হয়েছে ইসলামকে ধ্বংস করার জন্যে একের পর জাহিলি লেগে ছিল: পৌত্তলিক, ইহুদি, ক্রিশ্চান, ক্রুসেডার, মঙ্গোল, কমিউনিস্ট, পুঁজিবাদী, উপনিবশেবাদী এবং যায়নবাদী। আজ এরাই আবার এক বিশাল ষড়যন্ত্রে একজোট হয়েছে। অনেক দূর ঠেলে দেওয়া প্রকৃত মৌলবাদীর ভ্রান্তি নিয়ে কুতব সর্বত্র সম্পর্ক লক্ষ করেছেন। আরবদের প্যালেস্তাইন থেকে বিতাড়িত করতে ইহুদি ও ক্রিশ্চান সাম্রাজ্যবাদীরা একসাথে ষড়যন্ত্রে মেতেছে; পুঁজিবাদ ও কমিউনিজম, দুটোরই জন্ম দিয়েছে ইহুদিরা; ইসলামকে বিতাড়িত করতেই ইহুদি ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা আতাতুর্ককে ক্ষমতায় বসিয়েছে; মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তুরস্কের নজীর অনুসরণ না করায় নাসেরকে সমর্থন দিয়েছে তারা ৩১ অধিকাংশ বৈকল্যবাদীর মতো এই ষড়যন্ত্র ভীতি বাস্তবতার কাছে উড়ে যায়, কিন্তু যখন মানুষের মনে এই অনুভূতি জাগে যে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্যেই তারা বিরাট বিপদের মোকাবিলা করছে, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর যুক্তিসঙ্গত থাকতে পারে না।
কুতব বাঁচতে পারেননি। ১৯৬৪ সালে সম্ভবত ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কারাবাসের সময় বোন তাঁর লেখা চালান করে গোপনে বিলি করেছিলেন, কিন্তু মুক্তির পর কুতব মাইলস্টোনস প্রকাশ করেন। পরের বছর সরকার নাসেরকে হত্যার ষড়যন্ত্র লিপ্ত বলে অভিযুক্ত সন্ত্রাসী দলের এক নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব উন্মোচন করে। কুতবসহ শত শত ব্রাদারকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৬ সালে নাসেরের জবরদস্তির ফলে কুতবকে ফাঁসি দেওয়া হয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভকারীর বদলে কুতব বরং একজন আদর্শবাদীই হয়ে ছিলেন। তিনি সব সময় যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ১৯৫৪ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্যেই ব্রাদারদের অস্ত্র সংগ্রহ কেবল আত্মরক্ষামূলক কাজ। তিনি সম্ভবত ভেবেছিলেন, জিহাদ শুরুর সময় হয়নি। জাহিলিয়াহর উপর আক্রমণ শানানোর আগে আধ্যাত্মিক ও কৌশলগতভাবে তৈরি হওয়ার জন্যে ভ্যানগার্ডকে মুহাম্মদীয় কর্মসূচির প্রথম তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে। সব ব্রাদারই তাঁকে অনুসরণ করবে না। অধিকাংশই অধিকতর মধ্যপন্থী সংস্কারপন্থী হুদাইবির দর্শনের প্রতি অনুগত ছিল, কিন্তু কারাগার ও নির্যাতন শিবিরে মুসলিমদের একটা বিরাট সংখ্যা কুতবের রচনা পাঠ করেছে, সেসব নিয়ে আলোচনা করেছে, এবং ছয় দিনের যুদ্ধের পর অধিকতর ধর্মীয় পরিবেশে ক্যাডার তৈরি শুরু করেছে।
ইরানের শিয়া মুসলিমরাও ১৯৬২ সালে শাহ মুহাম্মদ রেযা পাহলবী শ্বেত বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার পর সেক্যুলারিস্ট আগ্রাসনের নতুন ঢেউয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের জন্যে বর্ধিত মুনাফা ভাগাভাগির প্রতিষ্ঠান ও জমির মালিকানার আধা সামন্তবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটানো ও স্বাক্ষরতা বাহিনী সৃষ্টি।৩২ শাহর কিছু প্রকল্প সফল হয়েছিল। শিল্প, কৃষি ও সামাজিক প্রকল্পগুলোকে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ১৯৬০-র দশকে মোট জাতীয় উৎপাদনে ব্যাপক বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করা গেছে। শাহ ব্যক্তিগতভাবে নারীদের নিম্নপর্যায়ের মনে করলেও তাদের মর্যাদা ও শিক্ষার মান উন্নত করা সংস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন; যদিও তাতে কেবল সমাজের উঁচু পর্যায়ের মহিলারাই উপকৃত হয়েছিল। পশ্চিমে উৎসাহের সাথে শাহর সাফল্যের তারিফ করা হয়েছে: ইরানকে যেন মধ্যপ্রাচ্যে প্রগতি ও সুস্থতার আলোকবর্তিকা মনে হয়েছে। মুসাদ্দিক সংকটের পর আমেরিকাকে তোয়াজ করে চলছিলেন শাহ, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছেন ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা বিদেশী বিনিয়োগে পুরস্কৃত হয়েছেন। কিন্তু এমনি একটা সময়েও দক্ষ পর্যবেক্ষক লক্ষ করেছিলেন যে, এইসব সংস্কার যথেষ্ট প্রসারিত হয়নি। ধনীদের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে সেগুলো, শহুরে নাগরিকদের প্রতি কেন্দ্রিভূত ছিল এবং সাধারণ মানুষকে অবহেলা করেছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে অর্জিত মুনাফা দক্ষতার সাথে ব্যবহৃত হয়নি, বরং লোকদেখানো ও সামরিক প্রযুক্তির সর্বশেষ সরঞ্জামের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। এর ফলে সমাজের মূল কাঠামো স্পর্শের বাইরে রয়ে গেছে ও পাশ্চাত্যকৃত ধনীক গোষ্ঠী ও প্রাচীন কৃষিভিত্তিক রীতিনীতির অধীনে ফেলে আসা সাধারণ দরিদ্রদের ভেতরকার ফারাক আরও প্রসারিত হয়েছে।
