ক্রিশ্চানদের বিপরীতে মুসলিমরা সবসময় স্বর্গীয় সত্তাকে মতবাদের চেয়ে বরং এক ধরনের ঔচিত্যবোধ হিসাবেই অনুভব করেছে; মুসলিম মৌলবাদ সব সময়ই সক্রিয় থাকবে ও উম্মাহ কেন্দ্রিক হবে। কিন্তু কুতব পয়গম্বরের জীবনের মিথোসকে একটি আদর্শে রূপান্তরিত করার পর অনিবার্যভাবে সরলীকরণ করে এর আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেন, এবং একে খাট করেন। তিনি আধুনিক আদর্শের জন্যে প্রয়োজনীয় এক শৃঙ্খলিত কর্মসূচি প্রণয়নের জন্যে পয়গম্বরের ব্যক্তিগত বহুমুখী সংগ্রামের জটিলতা, দ্ব্যর্থবোধকতা ও বৈপরীত্যকে সরিয়ে দেন; কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় এর সাথে অন্তর্ভুক্ত নিষ্ঠুর নির্বাচন ইসলামি দর্শনকে বিকৃত করেছে।
পয়গম্বরের জীবনকে চারটি পর্যায়ে অগ্রসর হতে দেখেছেন কুতব; বিংশ শতাব্দীতে সঠিকপথে পরিচালিত একটি সমাজ গড়ে তোলার জন্যে মুসলিমদের অবশ্যই এই চারধারা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।২৩ প্রথমে আল্লাহ একজন ব্যক্তি মুহাম্মদের কাছে তাঁর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন, এরপর তিনি আল্লাহ’র ইচ্ছা বাস্তবায়ন ও মক্কার জাহিলিয়াহ অপসারণ করে একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক, সাম্যবাদী সমাজ গঠনের শপথ গ্রহণকারী অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তিদের দল, যা কেবল আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে, উম্মাহ গঠনের পথে অগ্রসর হয়েছেন। প্রথম পর্যায়ে মুহাম্মদ এই ভ্যানগার্ডদের সম্পূর্ণ ভিন্ন মূল্যবোধে পরিচালিত পৌত্তলিক জাহিলি প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। অন্য মৌলবাদীদের মতো কুতব বিচ্ছিন্নতার নীতিকে (মাফাসালাহ) গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন। পয়গম্বরের কর্মসূচি দেখিয়েছে যে সমাজ দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত শিবিরে বিভক্ত। আজকের মুসলিমদেরও, যুক্তি দেখিয়েছেন কুতব, অবশ্যই তাদের নিজস্ব কালের জাহিলিয়াহকে প্রত্যাখ্যান করে এর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে একটি খাঁটি মুসলিম ছিটমহল নির্মাণ করতে হবে। তারা তাদের সমাজের অবিশ্বাসী ও ধর্মদ্রোহীদের প্রতি সৌজন্য দেখাতে পারে, দেখানো উচিতও, কিন্তু সেই সম্পর্ক একেবারে নিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে এবং সাধারণভাবে শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অসহযোগিতার নীতি অনুসরণ করতে হবে।২৪
জাহিলি মূলধারা থেকে এই বিচ্ছিন্নতা মক্কার পৌত্তলিক প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন শুরু এবং শেষ পর্যন্ত ৬২২ সালে তাদের মক্কা থেকে আনুমানিক ২৫০ মাইল উত্তরের মদীনার বসতিতে অভিবাসনে (হিজরাহ) বাধ্য করলে প্রকট হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের বিশ্বাসী ও তাদের খোদাহীন সমাজের ভেতর সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ছিল অনিবার্য। কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ে পয়গম্বর মদীনায় একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা ছিল সংহতি, ভ্রাতৃত্বমূলক নিশ্চয়তা ও সমন্বিতকরণের একটা পর্যায়; এই সময় আসন্ন সংগ্রামের লক্ষ্যে জামাহ নিজেকে প্রস্তুত করেছে। কর্মসূচির চতুর্থ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে মুহাম্মদ (স) মক্কার বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র সংগ্রামের কাল সূচনা করেন, প্রথমে মক্কার বাণিজ্য ক্যারাভানের উপর ছোট মাত্রার আক্রমণ, এবং পরে মক্কান সেনাবাহিনীর উপর অব্যাহত হামলা। সমাজের মেরুকরণ বিবেচনায় রেখে ঠিক আজকের মুসলিমদের মতোই সহিংসতা ছিল অনিবার্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৬৩০ সালে মক্কা স্বেচ্ছায় মুহাম্মদকে (স) তার দুয়ার খুলে দেয়, স্বীকার করে নেয় ইসলামের শাসন ও আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব।
কুতব সব সময় জোর দিয়ে বলেছেন, আল্লাহ’র পক্ষে সশস্ত্র সংগ্রাম শক্তি দিয়ে ইসলাম কায়েমের লক্ষ্যে নির্যাতনমূলক, নিপীড়ক অভিযান হবে না। মাওদুদির মতো তিনি তাঁর আল্লাহ’র সার্বভৌমত্বের ঘোষণাকে স্বাধীনতার ঘোষণা মনে করেছেন। এটা ছিল
অন্য মানুষ বা মানবীয় ইচ্ছার বন্ধন থেকে সর্বজনীন মানবীয় মুক্তির ঘোষণা… আল্লাহ’র সার্বভৌমত্ব ঘোষণার অর্থ: সকল ধারণা, ধরন, পদ্ধতি ও শর্তের দিক থেকে মানবীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সামগ্রিক বিপ্লব, এবং মানব জাতি যেসব ক্ষেত্রে সর্বভৌম তার প্রতিটি শর্তের প্রতি উপেক্ষা ২৫
কুতবের আদর্শ আবিশ্যিকভাবে আধুনিক ছিল; তাঁর ভাবনায় আল্লাহ’র ‘কেন্দ্রিকতা ছাড়া অনেক দিক থেকেই তিনি আধুনিক পদ্ধতির প্রত্যাখানে ষাটের দশকের মানুষ ছিলেন। পয়গম্বরের কর্মসূচির বর্ণনায় কোনও আদর্শের প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই রয়েছে। এটা ছিল সহজ; শত্রুকে শনাক্ত করেছে, সমাজকে পুনর্গঠনকারী জামাহকে চিহ্নিত করেছে। কুতবের আদর্শ সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও নতুন করে দিক নির্ধারণে অস্বস্তিতে ভোগা অনেক মুসলিমের কাছে ইসলামি পরিভাষায় আধুনিক রীতিনীতির জটিল বৈশিষ্ট্যসমূহকে অনুবাদ করেছে যাতে তারা নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারে। নিশ্চিতভাবেই ব্রিটিশদের দান ‘স্বাধীনতাকে’ মুক্তিদায়ী বা ক্ষমতায়নকারী হিসাবে অনুভব করেনি তারা। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ছয় দিনের যুদ্ধে নাসেরের শোচনীয় পরাজয় অনেক মানুষের কাছে নাসেরবাদের সেক্যুলার, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের ধর্মীয় পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছিল, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম কুতবের আদর্শে অনুপ্রেরণার সন্ধান লাভ করবে।
