আধুনিক বিশ্বের মানুষ ছিলেন কুতব এবং একটি আকর্ষণীয় লোগোস সৃষ্টি করবেন, কিন্তু মিথের জগৎ সম্পর্কেও গভীরভাবে সজাগ ছিলেন তিনি। যুক্তি ও বিজ্ঞানকে শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু একে সত্যের পথে একমাত্র পথপ্রদর্শক মনে করেননি। কারাগারে কাটানো দীর্ঘ সময়ে নতুন মৌলবাদী তত্ত্বের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি কোরানের উপর একটি বিশাল ধারাভাষ্য রচনা করেন তিনি, তাতে অদৃশ্য ও দুয়ের প্রতি তাঁর আধ্যাত্মিক সচেতনতা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি যত যৌক্তিকই হয়ে উঠুক না কেন, লিখেছেন তিনি, ‘অজানার সাগরে’ অবিরাম ভেসে চলেছে তা। সকল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিকাশ নিঃসন্দেহে এক ধরনের প্রগতির কথা বোঝায়, কিন্তু সেগুলো স্রেফ চিরস্থায়ী মহাজাগতিক বিধানের ঝলকমাত্র, ‘কোনও মহাসাগরের’ তরঙ্গের মতো উপরিতলের; ঢেউকে তা বদলে দেয় না, ধ্রুব প্রাকৃতিক উপাদানে তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।’১৬ আধুনিক যুক্তিবাদ যেখানে জাগতের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে, কুতব সেখানে সময় ও পরিবর্তনের অতীত বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরাতে জাগতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে দেখার প্রচলিত অনুশীলনের চর্চা করছিলেন। জাগতিক ঘটনাপ্রবাহকে মোটামুটি চিরন্তন আদি আদর্শ বাস্তবতার প্রতিফলন হিসাবে দেখা এই অত্যাবশ্যকমূলক অতীন্দ্রিয় মানসিকতা তাঁর ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর আপাত অনুপস্থিতি তাতে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। যখনই আধুনিক সেক্যুলার সংস্কৃতির কথা ভেবেছেন, অন্য মৌলবাদীদের মতো কুতবও তাঁকে আতঙ্কে ভরে তোলা পবিত্রতা ও নৈতিক তাৎপর্যরহিত স্থান নরকের দেখা পেয়েছেন।
মানুষ আজকের দিনে এক বিশাল পতিতালয়ে বাস করছে! একবার কেবল পত্রিকা, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, বল রুম, মদের বার ও সম্প্রচারকেন্দ্রগুলোর দিকে তাকানোই যথেষ্ট! কিংবা নগ্নদেহ, উস্কানিমূলক অঙ্গভঙ্গি ও সাহিত্যে অসুস্থ ও ইঙ্গিতময় বর্ণনা, শিল্পকর্ম ও গণমাধ্যমে লালসা! আর এর সাথে যোগ করুন মানুষের টাকার জন্যে প্রলোভনকে ইন্ধন যোগানো ও এর সংগ্রহ ও বিনিয়োগের লক্ষ্যে আইনের পোশাকে প্রতারণা, কূটকৌশল ও ব্ল্যাকমেইলের পাশাপাশি দুষ্ট কৌশল বের করতে প্ররোচিতকারী সুদের পদ্ধতি।১৭
এই সেক্যুলার শহরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এবং আধুনিক সমাজের উপর আধ্যাত্মিকতার একটা বোধ পুনঃস্থাপন করতে চেয়েছিলেন কুতব।
ইতিহাসকে অতীন্দ্রিয়ভাবে দেখেছেন কুতব। তিনি এইসব ঘটনাকে অনন্য এবং সুদূর অতীতের মনে করে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদের মতো পয়গম্বরের জীবনের শরণাপন্ন হননি। ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক হওয়ায় তিনি জানতেন যা ঘটে গেছে তার পেছনের সত্যিতে উপনীত হওয়ার অন্য উপায় আছে। কুতবের চোখে মুহাম্মদের ব্রত তখনও আদি আদর্শ ছিল, এমন এক মুহূর্ত যখন পবিত্র ও মানুষ এক হয়ে ঐকতানে কাজ করেছে। গভীরতর অর্থে এটা ছিল জাগতিক কর্মকাণ্ডকে ঐশী জগতের সাথে সম্পর্কিত করা একটা ‘প্রতীক’। এভাবে মুহাম্মদের জীবন ইতিহাস, সময় ও স্থানের অতীত এক আদর্শ তুলে ধরেছে; এবং ক্রিশ্চান অপুদীক্ষার মতো পরম বাস্তবতার সাথে মানবজাতির এক ‘অবিরাম সাক্ষাতের’ ব্যবস্থা করেছে।১৮ সুতরাং এটা একটা এপিফ্যানি ছিল; আর পয়গম্বরের ব্রতের বিভিন্ন পর্যায় নারী-পুরুষকে তাদের ঈশ্বরের দিকে চালিতকারী ‘মাইলফলক’ বোঝায়। একইভাবে জাহিলিয়াহ কথাটি প্রচলিত মুসলিম ইতিহাসবিজ্ঞানের মতো কেবল আরবের প্রাক ইসলামি কালকে বোঝাতে পারে না। ‘জাহিলিয়াহ সময়ের কোনও পর্ব নয়,’ তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত গ্রন্থ মাইলস্টোনস-এ লিখেছেন কুতব। ‘এটা সমাজ যখনই ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়, তখনই দেখা দেওয়া এক অবস্থা, সেটা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতে হতে পারে।’১৯ আল্লাহ’র বাস্তবতা ও সার্বভৌমত্ব অস্বীকারের যেকোনও রকম প্রয়াসই জাহিলি। জাতীয়তাবাদ (রাষ্ট্রকে পরম মূল্য দেয়), কমিউনিজম (নাস্তিক্যবাদী), ও গণতন্ত্র (যেখানে জনগণ আল্লাহ’র ক্ষমতা কেড়ে নেয়) সবই আল্লাহ’র পরিবর্তে মানুষের উপাসনাকারী জাহিলিয়াহর প্রকাশ। এটা খোদাহীনতা ও ধর্মদ্রোহিতার একটা অবস্থা। কুতবের চোখে মিশর ও পাশ্চাত্যের আধুনিক জাহিলিয়াহ পয়গম্বরের আমলের জাহিলিয়াহর চেয়ে ঢের খারাপ ছিল, কারণ এটা ‘অজ্ঞতা’ ভিত্তিক ছিল না, বরং আল্লাহ’র বিরুদ্ধে নীতিগত বিদ্রোহ ছিল।
কিন্তু প্রাক আধুনিক আধ্যাত্মিকতায় ইসলামের আচার ও নীতিগত আনুশীলনের মাধ্যমে প্রতিটি মুসলিম সত্তার অন্তস্তলে মুহাম্মদীয় আদিআদর্শ রূপ গড়ে তোলা হয়েছিল। এভাবে নিশ্চিতভাবে তা কুতবের পক্ষে একটা মিথোস ছিল, কিন্তু তিনি এবার একে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করেছেন যাতে মিথ কর্মকাণ্ডের নীলনকশা আদর্শে পরিণত হয়। মদীনায় পয়গম্বর প্রতিষ্ঠিত প্রথম উম্মাহ ছিল আল্লাহ পরিকল্পিত এক ‘উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা’, ‘যাতে এই অনন্য ইমেজ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বাস্তবায়িত করা যায় এবং মানবীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ভেতর একে পুনাবৃত্তি করার জন্যে এর কাছেই সাহায্য চাওয়া যায়। সত্যিই ‘এক ব্যতিক্রমী প্রজন্মের মানুষদের হাতে’ মদীনার আদি আদর্শমূলক সমাজ অর্জিত হয়েছিল, তবে সেটা ‘অননুকরণীয় অলৌকিক’ ঘটনা ছিল না; এটা ছিল ‘মানবীয় প্রয়াসের ফল,’ এবং যথার্থ প্রয়াস নিলেই অর্জন করা সম্ভব।২১ মুহাম্মদের জীবনে, যুক্তি দেখিয়েছেন কুতব, স্বর্গীয় পরিকল্পনা (মানহাজ) তুলে ধরেছেন আল্লাহ, সুতরাং এটা মানব রচিত সকল আদর্শের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল। পয়গম্বরের জীবনের ‘মাইলফলক’ পর্যবেক্ষণ করে আল্লাহ মানব সন্তানকে সঠিকভাবে নির্দেশিত সমাজ গঠনের একমাত্র উপায় দেখিয়ে দিয়েছেন। ২২
