যেকোনও আদর্শবাদীর মতো কোনও বিমূর্ত পণ্ডিতি তত্ত্ব গড়ে তুলছিলেন না মাওদুদি, বরং যুদ্ধের আহবান জানাচ্ছিলেন। তিনি সর্বজনীন জিহাদের দাবি করেছেন, একেই ইসলামের মূল ভিত্তি ঘোষণা করেছিলেন। এর আগে অন্য কোনও মহান মুসলিম চিন্তাবিদ এধরনের দাবি করেননি। মাওদুদির চোখে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে এটা ছিল প্রয়োজনীয় উদ্ভাবন। পশ্চিমারা যেমন বিশ্বাস করে, জিহাদ (‘সংগ্রাম’) বিধর্মীদের ধর্মান্তরিত করার যুদ্ধ নয়, আবার আব্দুহ যেমন যুক্তি দেখিয়েছেন, কেবল আত্মরক্ষার উপায়ও নয়। মাওদুদি জিহাদকে গোটা মানবজাতির কল্যাণে ক্ষমতা দখলের বিপ্লবী সংগ্রাম হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এখানেও আবার ১৯৩৯ সালে এই ধারণা গড়ে তোলা মাওদুদি মার্ক্সবাদের মতো উগ্র মতাদর্শের মতো একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছেন। পয়গম্বর যেভাবে প্রাক ইসলামি যুগের অজ্ঞতা ও বর্বরতা জাহিলিয়াহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, ঠিক সেভাবে সকল মুসলিমকে অবশ্যই সকল উপায়ে পশ্চিমের আধুনিক জাহিলিয়াহকে ঠেকাতে হবে। জিহাদ নানা রূপ নিতে পারে। কেউ কেউ নিবন্ধ লিখবে, অন্যরা বক্তৃতা দেবে, কিন্তু শেষ উপায় হিসাবে তাদের অবশ্যই সশস্ত্র সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।১০
এর আগে কখনও ইসলামি আনুষ্ঠানিক ডিসকোর্সে জিহাদ এমন কেন্দ্ৰিয় ভূমিকায় আসেনি। মাওদুদির দর্শনের উগ্রতা প্রায় নজীরবিহীন, কিন্তু আব্দুহ ও বান্না ইসলামকে সংস্কারের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আধুনিক পাশ্চাত্য রীতিনীতিকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করার পর পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে উঠেছিল। মুসলিমদের কেউ কেউ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত ছিল। মাওদুদির রচনায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিতদের একজন হলেন সায়ীদ কুতব (১৯০৬–৬৬), তিনি ১৯৫৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দিয়েছিলেন, ১৯৫৪ সালে নাসেরের হাতে কারাভোগ করেছেন এবং পনের বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তি ভোগ করেছেন, ইসলামপন্থীদের প্রতি শাসকদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছেন।১১ নাসেরের নির্যাতন শিবিরের অভিজ্ঞতা তাঁকে বিক্ষত করেছে, ফলে মাওদুদির চেয়ে আরও বেশি রেডিক্যাল হয়ে উঠেছিল তাঁর ধারণা। কুতবকে সুন্নি মৌলবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলা যেতে পারে। কারাগারে তাঁর প্রণীত আদর্শের উপরই প্রায় সকল রেডিক্যাল ইসলামপন্থী নির্ভর করেছে,১২ কিন্তু সব সময় পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি বৈরী বা চরমপন্থী ছিলেন না তিনি। কায়রোর দার আল-উলুম কলেজে পড়াশোনা করেছেন কুতব, এখানে ইংরেজি সাহিত্যের প্রেমে পড়েন তিনি, পরিণত হন বইপ্রেমীতে। জাতীয়তাবাদীও ছিলেন তিনি, এবং ওয়াফদ পার্টির সদস্য। দেখে মোটেই উগ্র মনে হত না, ছোটখাট, মৃদুভাষী; শারীরিকভাবেও শক্তিশালী ছিলেন না। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন কুতব। দশ বছর বয়সে গোটা কোরান মুখস্থ করেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা, কিন্তু তরুণ বয়সে তাঁর বিশ্বাস অনায়াসে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সেক্যুলার নীতিমালার সাথে খাপ খেয়ে গিয়েছিল। ১৯৪০-র দশক নাগাদ অবশ্য পশ্চিমের প্রতি তাঁর সমীহ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছিল। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কর্মকাণ্ড যায়নবাদের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনের মতোই তাঁকে অসুস্থ করে তোলে।১৩ বছর খানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়শোনা করার পর্বটিও ছিল মোহমুক্তিকর।১৪ আমেরিকান সংস্কৃতির যৌক্তিক বাস্তববাদীতা তাঁর অস্বস্তিকর ঠেকেছে: ‘কাজের উপযোগী উদ্দেশ্য ছাড়া আর সব ধারণাকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, অহম ছাড়া আর কোনও মানবীয় আবেগকে স্বীকার করা হয় না,’ এক চিঠিতে লিখেছেন তিনি। ‘গোটা জীবন যেখানে এমনি বস্তুবাদে নিয়ন্ত্রিত, সেখানে শ্রম ও উৎপাদনের আইন ছাড়া আর কোনও আইনের কোনও সুযোগ নেই।’১৫ কিন্তু তাসত্ত্বেও মধ্যপন্থী ও সংস্কারক হিসাবে গণতন্ত্র ও সংসদীয় পদ্ধতির মতো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানসমূহকে সম্পূর্ণ সেক্যুলারিস্ট আদর্শের বাড়াবাড়ি এড়ানোর আশায় একটা ইসলামি মাত্ৰা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
কিন্তু কারাগারে কুতবের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে বিশ্বাস যোগায় যে ধার্মিক ও সেক্যুলারিস্টরা একই সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারবে না। কারাগারের চারপাশে নজর বোলানোর সময় ব্রাদারদের উপর নির্যাতন ও তাদের হত্যার কথা ভেবেছেন তিনি, ধর্মকে একপাশে ঠেলে দেওয়ার নাসেরের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার কথা মনে পড়ে গেছে, মাওদুদির মতো ধর্মবিশ্বাসের চিরকালের, সব সময়ের শত্রু অজ্ঞ বর্বরতা হিসাবে সংজ্ঞায়িত জাহিলিয়াহর সব রকম লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। মক্কার জাহিলি (অজ্ঞ) সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন পয়গম্বর মুহাম্মদ (স), তাঁর নজীর অনুসরণ করে মুসলিমরা আমরণ লড়াই করতে বাধ্য। তবু কেবল অমুসলিম বিশ্বকেই জাহিলি বিবেচনাকারী মাওদুদির তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর হয়েছিলেন কুতব। ১৯৬০-র দশক নাগাদ কুতব নিশ্চিত হয়ে যান যে, তথাকথিত মুসলিম বিশ্বও জাহিলিয়াহর অশুভ মূল্যবোধ ও নিষ্ঠুরতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। নাসেরের মতো একজন শাসক বাইরে বাইরে ইসলামের কথা বললেও তাঁর কথা ও কাজ প্রমাণ করেছে যে আসলে তিনি ধর্ম ত্যাগ করেছেন। এমন সরকারকে উৎখাত করা মুসলিমদের দায়িত্ব। এবার সেক্যুলারিজমের স্রোতকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে জিহাদে নিবেদিতপ্রাণ ভ্যানগার্ড সংগঠন এবং সমাজকে আবার ইসলামি মূল্যবোধে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে একটি আদর্শ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পয়গম্বরের জীবন ও ব্রতের শরণাপন্ন হলেন তিনি।
