এরই সাড়া হিসাবে ধর্মীয় আদর্শবাদীরাও একই রকম সরলবাদী ও আগ্রাসী ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, জীবনের তাগিদে তারা লড়াই করছে। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানি সাংবাদিক ও রাজনীতিক আবুল আলা মাওদুদি (১৯০৩-৭৯) মিশরে তাঁর রচনা প্রকাশ শুরু করেন। মাওদুদির ভয় ছিল যে ইসলাম ধ্বংস হওয়ার পথে। ইসলামকে শেষ করে মুছে ফেলার জন্যে পশ্চিমের বিপুল শক্তিকে একত্রিত হতে দেখেছেন তিনি। মহাসংকটের এক মুহূর্ত ছিল সেটা। মাওদুদি বিশ্বাস করতেন, ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা জগৎ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে অন্যদের হাতে রাজনীতি তুলে দিতে পারে না। তাদের অবশ্যই একসাথে মিলে অগ্রসরমান ও লা- দিনি (‘ধর্মহীন’) সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে শক্তভাবে দলবদ্ধ হতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করতে মাওদুদি ইসলামকে যাতে সময়ের অন্য অগ্রসর আদর্শের মতো গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয় সেজন্যে একে একটি যুক্তিপূর্ণ, পদ্ধতিগত উপায়ে উপস্থানের প্রয়াস পান।৫ সুতরাং, ইসলামের গোটা জটিল মিথোস ও আধ্যাত্মিকতাকে বাস্তবভিত্তিক কর্মকাণ্ডের দিকে চালিত করার লক্ষ্যে প্রণীত একটি যৌক্তিক ডিসকোর্স লোগোসে পরিণত করার প্রয়াস পাচিছলেন তিনি। রক্ষণশীল বিশ্বে এধরনের যেকোনও প্রয়াসকে মারাত্মকভাবে ভ্রান্তিপূর্ণ হিসাবে নিন্দা জানানো হত, কিন্তু মুসলিমরা আর তখন প্রাক আধুনিক কালে বাস করছিল না। ভয়ানক, সহিংস বিংশ শতাব্দীতে টিকে থাকতে হলে তাদের পুরোনো ধ্যানধারণাকে পর্যালোচনা করে ধর্মকে আধুনিক করার প্রয়োজন ছিল হয়তো?
আমরা আরও যেসব আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদের কাজ আলোচনা করব তাদের মতোই মাওদুদির আদর্শের ভিত্তি ছিল আল্লাহ’র সার্বভৌমত্বের মতবাদ। এই ব্যাপারটা সাথে সাথে আধুনিক বিশ্বের প্রতি অস্ত্র তাক করে, কারণ তা আধুনিকতার প্রতিটি পবিত্র সত্যির বিরোধিতা করে। যেহেতু কেবল আল্লাহই মানবীয় বিষয়াদির শাসন করেন, তিনিই যেহেতু সর্বোচ্চ আইনদাতা, সুতরাং মানুষের নিজের আইন তৈরি করার বা নিয়তিকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনও অধিকার নেই। মানবজাতির স্বাধীনতা ও মানুষের সার্বভৌমত্বের সম্পূর্ণ ধারণাটিকে আক্রমণ করার মাধ্যমে মাওদুদি গোটা সেক্যুলারিস্ট রীতিকেই অগ্রাহ্য করেছেন।
আমাদের অস্তিত্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করা বা আমাদের জাগতিক কর্তৃত্বের সীমানা নির্ধারিত করে দেওয়ার দায়িত্বটি আমাদের নয়, এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আর কারও নেই…কোনও কিছুরই সার্বভৌমত্ব দাবি করার অধিকার নেই, তা সে মানুষ, পরিবার, শ্রেণী, বা একদল মানুষ বা এমনকি সামগ্রিকভাবে গোটা মানবজাতি হোক। কেবল আল্লাহই সার্বভৌম, এবং তাঁর নির্দেশ ইসলামের বিধিবিধান।৬
লক, কান্ট এবং আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদারগণের তাঁদের কবরে নড়েচড়ে ওঠার কথা। কিন্তু আসলে যেকোনও আধুনিক মানুষের মতো স্বাধীনতার অনুরক্ত ছিলেন মাওদুদি, একটি ইসলামি মুক্তির তত্ত্ব তুলে ধরছিলেন তিনি। যেহেতু আল্লাহই সার্বভৌম, কোনও মানুষের কাছ থেকে নির্দেশ নিতে কেউই বাধ্য নয়। আল্লাহ’র বিধান (কোরান ও সুন্নাহর মাধ্যমে প্রত্যাদিষ্ট) অনুযায়ী শাসন করতে অস্বীকারকারী কোনও শাসকই তাঁর প্রজাদের আনুগত্য দাবি করতে পারেন না। এমন অবস্থায় বিপ্লব কেবল অধিকার নয়, বরং দায়িত্ব।
সুতরাং ইসলামি ব্যবস্থা এটা নিশ্চিত করেছে যে রাষ্ট্র কোনও শাসকের খামখেয়ালির ও উচ্চাভিলাষের বস্তু নয়। মুসলিমদের তা খেয়ালখুশি আর মানবীয় নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য অশুভ থেকে রক্ষা করেছে। ইসলামি আইনে শুরাহর (‘পরামর্শ’) নীতি অনুযায়ী খলিফা প্রজাদের সাথে আলোচনা করতে বাধ্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সরকার গণতান্ত্রিক আদর্শের মতো জনগণের কাছ থেকে বৈধতা লাভ করে থাকে। খলিফা বা জনগণের কেউই নিজেদের মতো করে আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। তারা কেবল শরীয়াহ প্রয়োগ করতে পারেন। সুতরাং, মুসলিমদের অবশ্যই উপনিবেশিক শক্তির আরোপিত পাশ্চাত্যকৃত সরকারের ধরনকে প্রতিহত করতে হবে, যেহেতু এই ধরনের সরকারগুলো আল্লাহ’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বোঝায় ও তাঁর কর্তৃত্বকে ছিনতাই করে। মানুষ একবার অহমিকাভরে নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিলে অশুভ, নির্যাতন, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিপদ সৃষ্টি হয়। গোঁড়া সেক্যুলারিস্টের কাছে অদ্ভুত ঠেকা এক মুক্তির ধর্মতত্ত্ব, কিন্তু যেকোনও আদর্শের প্রকৃতিই এমন যে এর অন্তর্দৃষ্টি বিরোধীদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। মাওদুদি চলমান যুগচেতনার মূল্যবোধসমূহের ধারক ও ভাগিদার ছিলেন; তিনি মুক্তি ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করতেন, এসবকে স্বৈরাচার ও দুর্নীতি ঠেকানোর একটা উপায় হিসাবেও দেখেছেন। কেবল এইসব আদর্শকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে ইসলামি চেহারা দিয়েছেন তিনি, কিন্তু সেক্যুলারিজমের ‘মেকি মানসিকতা’ নিয়ে কারও পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব হবে না।
একটি আদর্শের মূল্যবোধেও বিশ্বাস করতেন মাওদুদি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ইসলাম ফ্যাসিবাদ বা মার্ক্সবাদেরই অনুরূপ একটি বিপ্লবী আদর্শ, কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নাৎসি ও মার্ক্সিস্টরা অন্য মানুষকে দাসত্বে শৃঙ্খলিত করেছে, অথচ ইসলাম তাদের আল্লাহ ছাড়া অন্য যেকোনও কিছুর দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে চেয়েছে। প্রকৃত আদর্শবাদী মাওদুদি অন্য সকল ব্যবস্থাকে নিরাময়ের অতীত ভ্রান্তিপূর্ণ মনে করেছেন।” গণতন্ত্র বিশৃঙ্খলা, লোভ ও মব শাসনের দিকে চালিত করে; পুঁজিবাদ শ্রেণীর সুবিধাকে লালন করে ও গোটা বিশ্বকে ব্যাংকারদের একটা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়; কমিউনিজম মানবীয় উদ্যোগের গলা টিপে মারে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের বিনাশ ঘটায়। এগুলো সাধারণ আদর্শগত অতিসরলীকরণ। মাওদুদি বিস্তারিত বিষয় ও সমস্যা পাশ কাটিয়ে গেছেন। ইসলামি শুরা কেমন করে প্রায়োগিক অর্থে পাশ্চাত্য দলনমূলক গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন? কৃষি ভিত্তিক আইনি বিধান শরীয়াহ কীভাবে আধুনিক শিল্পায়িত বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে খাপ খাইয়ে নেবে? মাওদুদি যুক্তি দেখিয়েছেন, একটি ইসলামি রাষ্ট্র সমগ্রতাবাদী হবে, কারণ তা সমস্ত কিছুকে আল্লাহ’র অধীনে নিয়ে আসবে; কিন্তু সেটা বাস্তবক্ষেত্রে কেমন করে স্বৈরাচার থেকে ভিন্ন হবে-মাওদুদি সঠিকভাবেই কোরানে যার নিন্দা করা হয়েছে বলে জোর দিয়েছেন?
