মেরুকৃত দেশে পরিণত হচ্ছিল ইরান: আমেরিকান বুম থেকে অল্প কিছু মানুষ ফায়দা পাচ্ছিল, কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পড়ে ছিল পেছনে। ইরান একা ছিল না। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ মনে করা হচ্ছিল যেন আমাদের বিবেচিত সমস্ত দেশের সমাজগুলো দুটি ভিন্ন শিবিরে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আধুনিক কালকে মুক্তিদায়ী ও ক্ষমতায়নের উপায় হিসাবে দেখছিল, বাকিরা একে অশুভ আক্রমণ বিবেচনা করেছে। ভীতি, ঘৃণা ও কোনওমতে চাপা পড়া ক্রোধ বিরাজ করছিল। অচিরেই তীব্রভাবে ক্রোধবোধকারী এই মৌলবাদীরা স্থির করবে যে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তোলা আর যথেষ্ট নয়। অবশ্যই সংগঠিত হয়ে পাল্টা আক্রমণ চালাতে হবে তাদের।
০৮. সংগঠন (১৯৬০-৭৪)
১৯৬০-র দশক নাগাদ গোটা পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপ্লবের হাওয়া ভেসে বেড়াচ্ছিল। ইউরোপ ও আমেরিকায় তরুণরা রাস্তায় নেমে বাবা-মার আধুনিক রেওয়াজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অধিকতর ন্যায় ভিত্তিক ও সাম্যবাদী ব্যবস্থার দাবি করে তারা, তাদের সরকারের বস্তুবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও শোভেনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, জাতীয় যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে অস্বীকৃতি জানায়। অনেক দশক ধরে মৌলবাদীরা যা করে আসছিল ঠিক সেটাই করতে শুরু করেছিল ষাটের তরুণ সমাজঃ মূলধারার মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসাবে একটা ‘প্রতি-সংস্কৃতি’, ‘বিকল্প সমাজ’ গড়ে তুলতে শুরু করেছিল তারা। নানাভাবেই আরও বেশি করে ধর্মীয় জীবনধারার দাবি করছিল। বেশিরভাগেরই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাস রাখার বা একেশ্বরবাদের কর্তৃত্বপরায়ণ কাঠামোয় বিশ্বাস করার ফুরসত ছিল না। তার বদলে কাঠমান্ডু গেছে তারা ঝা প্রাচ্যের ধ্যানমূলক বা অতীন্দ্রিয়বাদী কৌশলের কাছে সান্ত্বনা খোঁজার প্রয়াস পেয়েছে। অন্যরা মাদক প্রভাবিত অভিযাত্রা, দুয়েমূলক ধ্যান বা এরহার্দ সেমিনারস ট্রেনিং (ইএসটি)-র মতো ব্যক্তিগত পরিবর্তনের কৌশলের ভেতর দুয়ের সন্ধান পেয়েছে। মিথোসের পক্ষে এক ধরনের ক্ষুধা বিরাজ করছিল, এবং সেটা ছিল নতুন পাশ্চাত্যের অর্থডক্সিতে পরিণত হওয়া বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের প্রত্যাখ্যান। তবে এটা আসলে সত্যিকারের যুক্তিবাদের নয়, বরং এর চরম ধরনের প্রত্যাখ্যান ছিল। বিংশ শতাব্দীর খোদ বিজ্ঞানই নিজের সীমাবদ্ধতা ও যোগ্যতার আওতা সম্পর্কে দারুণভাবে শৃঙ্খলিত ও নীতিগতভাবে সতর্ক, সুবোধ ছিল। কিন্তু আধুনিকতার চলমান মেজাজ বিজ্ঞানকে আদর্শিক করে তুলেছিল, সত্যে পৌঁছানোর অন্য যেকোনও উপায়কে স্থান দিতে অস্বীকার গেছে। ষাটের দশকে তারুণ্যের বিপ্লব ছিল অংশত যৌক্তিক ভাষার অবৈধ আধিপত্য ও মিথোস ও লোগোসের অবদমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
কিন্তু অধিকতর স্বজ্ঞাপ্রসূত জ্ঞান অর্জনের এমনি শৃঙ্খলিত উপায় সম্পর্কে উপলব্ধি যেহেতু সেই আধুনিকতার আবির্ভাবের পর থেকেই পাশ্চাত্যে অবহেলিত হয়ে এসেছে, ফলে আধ্যাত্মিকতার লক্ষ্যে ষাটের এই সন্ধান প্রায়শঃই আত্ম- প্রমোদপূর্ণ ও বেসামাল ছিল। ধর্মীয় রেডিক্যালদের দর্শন ও নীতিমালায়ও ভ্রান্তি ছিল; আধুনিক সমাজের সেক্যুলারাইজেশন ও যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে নিজস্ব আক্রমণ সংগঠিত করে তুলতে যাচ্ছিল তারা। মৌলবাদীরা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। আধুনিকতাকে প্রায়শঃই আগ্রাসী হামলা মনে করে এসেছে তারা। আধুনিক চেতনা অতীতের সেকেলে চিন্তাধারা হতে মুক্তি দাবি করেছে; প্রগতির আধুনিক আদর্শ অযৌক্তিক এবং সে কারণে বিঘ্নসৃষ্টিকারী মনে হওয়া সকল বিশ্বাস, আচরণ ও প্রতিষ্ঠানের অবসান দাবি করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মতবাদ প্রায়শঃই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। অনেক সময়, স্কোপস ট্রায়ালের সময় উদারপন্থীদের কেসের মতো অস্ত্রকে পরিহাস করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে, আধুনিকতা যেখানে অনেক বেশি সমস্যাপূর্ণ ছিল, পদ্ধতি ছিল আরও বেশি নিষ্ঠুর, হত্যালীলা, দেশান্তরীকরণ ও নির্যাতন শিবির জড়িত ছিল এর সাথে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে নাগাদ অনেক ধার্মিক ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, উদারপন্থী ও সেক্যুলারিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিল তারা। তাদের বিশ্বাস মোতাবেক এই দলটি তাদের নির্যাতন করেছে ও প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এই ধার্মিক রেডিক্যালরা ছিল তাদের সময়েরই মানুষ। আধুনিক অস্ত্র হাতেই লড়াই করেছে, আধুনিক আদর্শ গড়ে তুলেছে।
,
আমেরিকান ও ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের পর থেকে পাশ্চাত্য রাজনীতি আদর্শিক হয়ে উঠেছিল। লোকে যুক্তির কালের আলোকন আদর্শের পক্ষে বিরাট সব যুদ্ধে অংশ নিয়েছে: মুক্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবীয় সুখ ও সামাজিক ন্যায়বিচার। পাশ্চাত্য উদারনৈতিক ঐক্যমতের বিশ্বাস ছিল, শিক্ষার ভেতর দিয়ে সমাজ ও রাজনীতি আরও বেশি যৌক্তিক ও ঐক্যবদ্ধ হবে। মানুষকে যুদ্ধের জন্যে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উপায় সেক্যুলার আদর্শ ছিল একটি আধুনিক বিশ্বাস পদ্ধতি যা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করে একে একটা যুক্তি প্রদান করে। যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে আবেদন সৃষ্টির করার লক্ষ্যে আদর্শকে সহজ ইমেজে প্রকাশ করা হয়, যাকে প্রায়শঃই ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস!’ বা ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ!’ জাতীয় শ্লোগানে সংক্ষিপ্ত করা সম্ভব। এমনি অতি সরল সত্যি সবকিছু ব্যাখ্যা করে বলে বিশ্বাস করা হয়। আদর্শবাদীরা বিশ্বাস করে, বিশ্ব সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে, তারা সাম্প্রতিক সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে এবং এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার একটা উপায় বের করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা বিশ্বের ধ্বংসের জন্যে দায়ী করা যেতে পারে এমন কোনও বিশেষ দলের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; অন্য একটি দল সব ঠিক করে দেবে। আধুনিক বিশ্বে রাজনীতির আর অভিজাত গোষ্ঠীর পেশা থাকা সম্ভব না হওয়ায় সমগ্র জনগণের সমর্থন লাভের জন্যে আদর্শকে অবশ্যই যথেষ্ট সরল হওয়ার প্রয়োজন ছিল যাতে সামান্য মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিও তার মানে আত্মস্থ করতে পারে।
