এমনি মুহূর্তে এযাবত উদারশক্তি হিসাবে বিবেচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে রাজনৈতিক সরলতা হারায়। ১৯৫৩ সাল নাগাদ মুসাদ্দিকের পক্ষে সমর্থন হ্রাস পেতে শুরু করেছিল। কখনও সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ আনুগত্য লাভ করতে পারেননি তিনি। কিন্তু তেল অবরোধ এবার দারুণ অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বাজারিরা তাঁকে ত্যাগ করেছিল। কাশানিসহ। উলেমারাও : মুসাদ্দিক ধর্মকে ব্যক্তিপর্যায়ে অবনমিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ অন্তপ্রাণ সেক্যুলারিস্ট ছিলেন। মজলিস বাতিল করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ভেবেছিলেন নিজেকে। এতে শিয়া যাজকগোষ্ঠী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ভীত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এইসব পুরোনো মিত্ররা মুসাদ্দিককে পরিত্যাগ করলেও সেক্যুলারিস্ট তুদেহ পাটি তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডিউইট আইজেনহাওয়ারের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সরকার কমিউনিস্টপন্থী অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় সতর্ক হয়ে ওঠে। এই কারণে মুসাদ্দিককে অপসারণ করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স ও সিআইএ-র পরিকল্পিত অভ্যুত্থান প্রয়াস অপারেশন অ্যাক্সিসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ গ্রহণের অনুমোদন দেন তিনি। অবশ্য ১৯৫৩ সালের আগস্টে মুসাদ্দিক এই ষড়যন্ত্রের আভাস পান, জানাজানি হওয়ার ক্ষেত্রে শর্তানুযায়ী দেশ থেকে চলে যান শাহ ও রানি, কিন্তু তিন দিন পরে সিআইএ এজেন্টদের আশ্রয়ে আবার ফিরে আসেন। তারা অসন্তুষ্ট ইরানি ও সামরিক বাহিনীর প্রধান ব্যক্তিদের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের আয়োজন করে যাতে মুসাদ্দিক গদিচ্যুত হন। পরে এক সামরিক আদালতে তাঁর বিচার করা হয়, নিজের পক্ষে অত্যন্ত চমৎকারভাবে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি, মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে গেলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নজরবন্দি হয়ে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে।
দেশে উল্লেখযোগ্য অসন্তোষ বিরাজ না করলে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান সফল হতে পারত না, তবে এটাও ঠিক যে বিদেশী হস্তক্ষেপ ছাড়া এমন ঘটনা ঘটত না। ইরানিরা এত দিন পর্যন্ত বন্ধু জেনে আসা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেইমানি ও অপমানের শিকার হয়েছে বলে মনে করেছে। আমেরিকা এখন রাশিয়া ও ব্রিটিশদের পদচিহ্ন অনুসরণ করছে, নিজেদের ফায়দা অর্জনের জন্যে ইরানের ঘটনাপ্রবাহের বিশ্রিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৯৫৪ সালে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে মনে হয়। এক নতুন তেল চুক্তি তেল উৎপাদন, এর বিপনন, শতকরা পঞ্চাশ ভাগ মুনাফা ওয়ার্ল্ড কার্টেল কোম্পানিগুলোর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল।১০৬ ব্যাপারটা চিন্তাশীল ইরানিদের অসুস্থ করে তোলে। আন্তর্জাতিক আদালতের সমর্থন নিয়ে নিজেদের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পেতে চেষ্টা করেছিল তারা, কিন্তু তার মর্যাদা দেওয়া হয়নি। ভীত হয়ে উঠেছিলেন আয়াতোল্লাহ কাশানি। আমেরিকার সাহায্য ইরানে মাত্র মুষ্টিমেয় কিছু লোকের উপকারে এসেছে, প্রতিবাদ করেন তিনি, পেট্রডলারের হিসাবে ইরান থেকে যে পরিমাণ সম্পদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গেছে তার শতভাগের এক ভাগেরও সমান নয় তা। ‘আমেরিকান উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা তেলের যে শত শত মিলিয়ন ডলার লাভ করবে,’ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তিনি, “তার বিনিময়ে নিপীড়িত জাতি মুক্তির সমস্ত আশা খোয়াবে, পাশ্চাত্য বিশ্ব সম্পর্কে নেতিবাচক মত সৃষ্টি হবে।১০৭
অন্তত এই দিক থেকে ঠিক কথাই বলেছিলেন কাশানি। ইরানিরা অপারেশন অ্যজাক্সের কথা ভাববার সময় মুসাদ্দিকের পক্ষ থেকে তাদের নিজেদের লোকদের সরে যাওয়ার কথা ভুলে যায়, মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থে একা হাতে তাদের উপর শাহর স্বৈরাচার চাপিয়ে দিয়েছে। ১৯৬০-র দশকের গোড়ার দিকে তিক্ততা প্রবল হয়ে ওঠে, শাহর শাসন এই সময় আরও স্বৈারচারী ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল। দ্বৈতনীতি চলছিল যেন। আমেরিকা গর্বের সাথে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করলেও নিজ শাসনের কোনও রকম বিরোধিতার অনুমতি দিতে অস্বীকারকারী, ইরানিদের মানবাধিকার অস্বীকার যাওয়া শাহকে আন্তরিকভাবে সমর্থন যোগাচ্ছিল। ১৯৫৩ সালের পর ইরান আমেরিকার সুবিধাপ্রাপ্ত মিত্রে পরিণত হয়। প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে ইরান ছিল আমেরিকান সেবা ও প্রযুক্তির প্রধান বাজার। আমেরিকা ইরানকে অর্থনৈতিক সোনার খনি মনে করত। বছর পরিক্রমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের প্রয়োগ করা রাজনৈতিক প্যাটার্নই কাজে লাগিয়েছে: তেল বাজারে শক্ত হাতের কৌশল, রাজণ্যের উপর অন্যায় প্রভাব, কূটনৈতিক দায়মুক্তির দাবি, ব্যবসা ও বাণিজ্য ছাড় এবং খোদ ইরানিদের প্রতি এক ধরনের পরিহাসের দৃষ্টিভঙ্গি। আমেরিকান ব্যবসায়ী ও উপদেষ্টাতে দেশ ভরে গিয়েছিল, অনেক টাকা পয়সার মালিক বনে গিয়েছিল তারা। তাদের জীবন ধারার সাথে অধিকাংশ ইরানির জীবনধারার বিশাল পার্থক্য ছিল; সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাস করত তারা, বেশির ভাগই সিংহাসনের সাথে সম্পর্কিত চুক্তির অধীনে কাজ করত বলে শাসকগোষ্ঠীর সাথে মারাত্মকভাবে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছিল। এটা ছিল অদূরদর্শী, স্বার্থপর নীতি শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটা দানবীয় চেহারা দেবে।
