খোমেনির বই প্রকাশিত হতে হতে ব্রিটিশরা জার্মানপন্থী সহানুভূতির কারণে শাহকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছে, বইটি দেখিয়ে দিয়েছিল যে স্বাধীনতা নিয়ে শোরগোলময় নিশ্চয়তা সত্ত্বেও কাজারদের মতোই ইউরোপিয় শক্তির নিগড়ে বন্দি ছিলেন তিনি। ১৯৪৪ সালে রেযার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মুহাম্মদ রেযা (১৯১৯-৮০) উত্তরাধিকারী হন; তিনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত শান্ত এবং এই পর্যায়ে দুর্বল চরিত্র। এক কঠিন সময়ে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইরানে দারুণরকম বিঘ্নকারী ছিল; শিল্পকারখানাগুলো অচল হয়ে গিয়েছিল, যন্ত্রপাতি ক্ষয়ে গেছে, ব্যাপকবিস্তারি দুর্ভিক্ষ চলছিল। সুযোগের অভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী; এমনি কঠিন একটা সময়ে ইরানি তেলের উপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ বিরাজ করছিল। উলেমাগণ অবশ্য খুশি ছিলেন। নতুন শাহ তখনও তাঁদের দাবির বিরোধিতা করার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠেননি: আশুরার আবেগি নাটক ও আবৃত্তি আবার চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, ইরানিরা ফের হজ্জে যাবার অনুমতি লাভ করে; মহিলাদেরও বোরখা পরার অনুমতি দেওয়া হয়। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে এই সময়: সোভিয়েতপন্থী মুহাম্মদ মুসাদ্দিকের (১৮৮১-১৯৬৭) নেতৃত্বে তুদেহ বা দ্য ন্যাশনাল ফ্রন্ট ইরানি তেলের জাতীয়করণের দাবি তোলে, এবং একটি নতুন প্যারামিলিটারি গ্রুপ ফেদায়িন-ই ইসলাম (‘ফাইটার্স অভ ইসলাম’)-সেক্যুলারিস্ট এজেন্ডার পক্ষাবলম্বনকারীদের সন্ত্রস্ত করে তুলছিল এরা।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের কারাবন্দি করে রাখা আয়াতোল্লাহ সায়ীদ মুস্তাফা কাশানি (c. ১৮৮২-১৯৬২) ১০১ ইরানে ফিরে আসার অনুমতি লাভ করেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বিশাল জনসমাবেশ ঘটে, তাঁর গাড়ির নিচে গালিচা পেতে দেওয়া হয়। বাস ভর্তি করে বিপুল সংখ্যক মেধাবী উলেমা কাশানির দেশ প্রত্যাবর্তনে স্বাগত জানাতে অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়ে হাজির হয়েছিলেন, দলে দলে নেমে এসেছিল মাদ্রাসার মহাআনন্দিত ছাত্ররা।১০২ কাশানি ছিলেন এই সময়ে ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহের তৃতীয় আলামত। তাঁর অসাধারণ জনপ্রিয়তা হয়তো অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষককে আভাস দিয়ে থাকবে যে, ইরানিরা সম্ভবত কোনও সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহের সাথে রাজনৈতিক বিষয়ে যাজকদের অনুসরণ করবে। কাশিয়ানি ও খোমেনি পরস্পরকে ভালো করেই চিনতেন, কিন্তু আসলে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। খোমেনি যেখানে ছিলেন দারুণ শৃঙ্খলা পরায়ণ, কোনও উদ্দেশ্য অর্জনের একরোখা, কাশানি সেখানে অনেক বেশি খেয়ালি, হুজুগে মেতে উঠতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাঁর কিছু পরিকল্পনা নৈতিক দিক থেকে সমর্থনযোগ্য ছিল না। জার্মানপন্থী কর্মকাণ্ডের জন্যে ব্রিটিশরা ১৯৪৩ সালে তাঁকে কারাবন্দি করেছিল: কাশানির চোখে নাৎসিদের দুরাচার তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং ব্রিটিশদের কবল থেকে ইরানিদের রক্ষা পেতে সাহায্য করতে পারার ব্যাপারটাই আসল।১০৩ ফেদায়িন-ই ইসলামের সাথেও যোগাযোগ ছিল কাশানির। ১৯৪৯ সালে তাদের একজন শাহকে হত্যার চেষ্টা করলে কাশানিকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। বেইরুত থেকে ন্যাশনাল ফ্রন্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে তেলের জাতীয়করণের পক্ষে একটি ফতওয়া জারি করেন তিনি। ১৯৫০ সালে ইরানে ফিরে আসার অনুমতি পান কাশানি, নায়কোচিত অভ্যর্থনা লাভ করেন। তাঁর আগমনের আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই জনতা মেহরাবাদ এয়াপোর্টে ভীড় জমাতে শুরু করে। তেল ইস্যুর কল্যাণে মুসাদ্দিকের নাশনাল ফ্রন্ট সবে নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছিল, প্রবীন উলেমাদের অভ্যর্থনা কমিটিতে যোগ দেন তিনি; কাশানি বিমান থেকে নেমে এলে শোরগোল এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, তাঁর সম্মানে নির্ধারিত ভাষণ বাদ দিতে হয়েছিল। তিনি তেহরানের নিজ বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে জনতা আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, অনেক সময় তার গাড়িটিকে রাস্তা থেকে শূন্যে তুলে ফেলছিল তারা।১০৪
এই বছরগুলোর চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল তেল সংকট,[১০৫] ১৯৫৩ সালে অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানির সমর্থক প্রধানমন্ত্রী আলি রাযমারা ফেদায়িনদের হাতে নিহত হলে এই সংকট প্রবল হয়ে ওঠে। দুই দিন পরে মজলিস সরকারকে তেল সম্পদ জাতীয়করণের পরামর্শ দেয়। শাহর প্রার্থীকে প্রতিস্থাপিত করে মুসাদ্দিক পরিণত হন প্রধানমন্ত্রীতে। ইরানি তেল জাতীয়করণ করা হয়, কিন্তু দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত নিজস্ব তেল সম্পদ জাতীয়করণে ইরানের অধিকারের পক্ষে রায় দিলেও ব্রিটিশ ও আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলো একজোট হয়ে ইরানি তেলের বিরুদ্ধে অঘোষিত অবরোধে যোগ দেয়। ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া মুসাদ্দিককে ইরানকে ইউএসএসআর-এর হাতে তুলে দেওয়া (যদিও মুসাদ্দিক ইরানকে বিদেশী নিয়ন্ত্রণ মুক্ত রাখতে ইচ্ছুক জাতীয়তাবাদী ছিলেন) বিপজ্জনক ফ্যনাটিক, তস্কর (যদিও তিনি সব সময়ই ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন) ও কমিউনিস্ট হিসাবে চিত্রিত করে। অবশ্য ইরানে মুসাদ্দিক ছিলেন বীর, অনেকটা স্যুয়েয খাল জাতীয়করণের পর নাসের যেমনটা পরিণত হবেন। শাহকে বঞ্চিত করে নিজ হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে শুরু করেন তিনি। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে তিনি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দাবি করামাত্র শাহ তাঁকে বরখাস্ত করেন, কিন্তু মুসাদ্দিকের পক্ষে এক গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়, ফলে রয়ালিস্টরা সতর্ক হয়ে ওঠে, কারণ এতে বোঝা যাচ্ছিল ইরানিরা প্রজাতান্ত্রিক শাসন দাবি করার উপান্তে পৌঁছে গেছে। দাঙ্গা মুসাদ্দিকের অপসারণ আকাঙ্ক্ষী লন্ডন ও ওয়াশিংটনকেও অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এইসব বিক্ষোভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আয়াতোল্লাহ কাশানি, কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় নেমে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধে প্রাণ দেওয়ার ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেন। মাত্র দুই দিন পরে মুসাদ্দিককে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হন শাহ।
