রেযার পোশাকের সমরূপতার আইন (১৯২৮) তাঁর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার উপরিতলগত চেহারা ও সহিংস রূপ দুটোই দেখায়। সকল পুরুষের পক্ষে পশ্চিমা পোশাক বাধ্যতামূলক করা হয় (কেবল উলেমাদের ছাড়া; যাজকীয় পদে যোগদানের জন্যে রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় পাস করার শর্তে জোব্বা ও পাগড়ী পরার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তাঁদের।), পরে মেয়েদের বোরখা পরার উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তাঁর সৈনিকরা সাধারণত বেয়োনেট দিয়ে মহিলাদের বোরখা ছিঁড়ে দিত, কুটিকুটি করে রাস্তার উপর ছুঁড়ে ফেলত। ৯৭ অন্তস্থঃ রক্ষণশীলতা সত্ত্বেও ইরানকে আধুনিক দেখাতে চেয়েছিলেন রেযা, এই লক্ষ্য অর্জনে যেকোনও কিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। ১৯২৯ সালের আশুরার সময় পুলিস কুমের ফায়যিয়াহ মাদ্রাসা ঘেরাও করে, ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এলে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ছিঁড়ে পশ্চিমা পোশাক পরতে বাধ্য করে। পুরুষরা সাধারণত চওড়া কিনারাঅলা পশ্চিমা টুপি অপছন্দ করত, কারণ তাতে আচরিক প্রার্থনার সময় সেগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াত। ১৯৩৫ সালে মাশাদে অষ্টম ইমামের মসজিদে একটি বিশ্রী ঘটনা ঘটে, পোশাক আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় পুলিস জনতার উপর গুলি বর্ষণ করে। শত শত নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী হয় প্রাণ হারায় কিংবা পবিত্র স্থানে আহত হয়। এটা বিস্ময়কর নয় যে, বহু ইরানি সেক্যুলারাইজেশনকে নির্যাতনকারী রাষ্ট্রের কবল থেকে ধর্মকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নয় (পাশ্চাত্যের মতো), আসলে ইসলামকেই ধ্বংস করাই লক্ষ্যই পরিকল্পিত ভয়ঙ্কর নীতি হিসাবে ভয় করতে শিখেছিল। ৯৮
ঠিক এমনি এক পরিস্থিতিতেই মৌলবাদী আন্দোলন ক্রমশঃ বেড়ে উঠতে পারে। এই সময়কালেই ব্যাপারটা ঘটেনি, তবে চারটি ঘটনা ঘটেছিল যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। প্রথমটি ছিল এক প্রতি-সংস্কৃতির সৃষ্টি। ১৯২০ সালে বিশিষ্ট মুজতাহিদ শায়খ আব্দ আল-করিম হায়রি ইয়াযদিকে (১৮৬০-১৯৩৬) কুমের মোল্লাহরা সেখানে এসে থাকবার আমন্ত্রণ জানান। কারণ অষ্টম শতাব্দীতে ইরানি শিয়াবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়া কারাবালা ও নাজাফের উপাসনালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত থাকায় কুমকে ফের শিয়া মানচিত্রে পুনঃস্থাপনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। শায়খ হায়রির কুমে পৌঁছানোর অল্প পরেই ব্রিটিশরা সত্যিই কয়েক জন নেতৃস্থানীয় উলেমাকে ইরাক থেকে বহিষ্কার করে। সবচেয়ে বিজ্ঞ দুজনের একজন ‘সংবিধানবাদী’ মুজতাহিদ নাইনি কুমে বাস করতে আসেন। শহর আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে শুরু করে। মাদ্রাসাগুলো নতুন করে সাজানো হয়, বিশিষ্ট পণ্ডিতগণ সেখানে শিক্ষা দান শুরু করেন, ভালো ভালো ছাত্রদের আকর্ষণে সক্ষম করে তোলে তাঁদের। নবাগতদের ভেতর একজন ছিলেন জ্ঞানী ও জগৎবিমুখ আয়াতোল্লাহ সায়ীদ আকা হুসেইন বোরুজারদি (১৮৭৫-১৯৬১); তিনি শিয়াহদের মারজে-ই তাকলিদ-সর্বোচ্চ আদর্শ-পরিণত হয়েছিলেন, কুমের আরও পণ্ডিতদের আকর্ষণ করেন তিনি।৯৯ ক্রমে কুম নাজাফকে ৷১৯ প্রতিস্থাপিত করতে শুরু করে, ১৯৬০ ও ১৯৭০-র দশকে ইরানের ধর্মীয় রাজধানী ও তেহরানের রাজকীয় রাজধানী বিরোধীদের কেন্দ্রে পরিণত হবে তা। কিন্তু প্রাথমিক এই বছরগুলোতে কুমের মোল্লাহরা শিয়া ঐতিহ্য অনুসরণ করে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন; যেকোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শাহর রোষ ডেকে আনত, কুমের পুনরুজ্জীবন শিশুকালেই দমন হয়ে যেত।
দ্বিতীয় মারাত্মক ঘটনাটা ছিল ১৯২০ সালে কুমে এমন একজন মানুষের আগমন যিনি ইরানের সবচেয়ে বিখ্যাত মোল্লাহয় পরিণত হবেন। শায়খ হায়রি ইয়াযদি পশ্চিম ইরান থেকে কুমে আসার সময় কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে এসেছিলেন, তরুণ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি (১৯০২-৮৯) ছিলেন তাঁদের একজন। প্রথমে অবশ্য খোমেনিকে বরং প্রান্তিক চরিত্র মনে হয়েছে। ফায়যিয়াহ মাদ্রাসায় ফিকহ পড়াতেন তিনি, তবে পরে নৈতিকতা ও অতীন্দ্রিয়বাদে (ইরফান) বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠবেন; ফিকহের তুলনায় এগুলোকে বরং ‘প্রান্তিক’ বিষয়ই বলা যেতে পারে। তাছাড়া, মোল্লাহ সদ্রার অতীন্দ্রিয়বাদের চর্চা করতেন খোমেনি, দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসন যাকে তীর্যক চোখে দেখে এসেছে। রাজনৈতিক প্রশ্নে তাঁর আগ্রহ আছে বলে মনে হলেও সেটা তাঁর যাজকীয় পেশার উন্নতির লক্ষ্যে চিন্তা করা হয়নি; বিশেষ করে প্রাচীন শিয়া নীরবতাবাদ অনুসরণকারী ও রাজনীতিতে অংশ গ্রহণের ব্যাপারে উলেমাদর উপর নিষেধাজ্ঞা জারিকারী আয়াতোল্লাহ বোরুজারদি মারজা পরিণত হওয়ার পর। ইরানে উত্তাল সময় ছিল এটা, কিন্তু স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্বেগ সত্ত্বেও খোমেনি সক্রিয় কর্মীতে পরিণত হননি। তারপরেও ১৯৪৪ সালে কাশফ আল-আসরার (‘দ্য ডিসকভারি অভ সিক্রেটস’) প্রকাশ করেছিলেন তিনি, সেই সময়ে তেমন একটা মনোযোগ টানতে না পারলেও এটাই শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথমবারের মতো পাহলভী নীতির প্রতি চ্যালেঞ্জের প্রয়াস ছিল। এই পর্যায়ে খোমেনি তখনও সংস্কারক, কোনও অর্থেই মৌলবাদী নন। তাঁর অবস্থান অনেকটা শরীয়াহ সাথে বিরোধপূর্ণ সংসদীয় আইন বাতিলের ক্ষমতাসহ মুজতাহিদদের প্যানেলের ধারণা মেনে নেওয়া ১৯০৬ সালের প্রথম মজলিসের অনুরূপ ছিল। তখনও পুরোনো সংবিধানের সমর্থক ছিলেন খোমেনি, এই আধুনিক প্রতিষ্ঠানকে ইসলামি প্রেক্ষিতে স্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছিলেন। কেবল ঈশ্বরেরই আইন জারি করার ক্ষমতা রয়েছে, যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, শিয়াদের পক্ষে আতাতুর্ক বা রেযা শাহ’র মতো কোনও শাসককে মানা যুক্তিসঙ্গত নয়, যাঁরা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্যে সাধ্যমতো সবই করেছেন। কিন্তু এমনি প্রাথমিক সময়ে তখনও একজন যাজকই সরাসরি দেশ শাসন করবেন, এমন পরামর্শ দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট প্রথাগত ছিলেন খোমেনি: শত শত বছরের শিয়া রেওয়াজ বিরোধী হত সেটা। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী ঈশ্বরের বিধিবিধানের উপর জ্ঞানধারী মুজতাহিদগণ একজন সাধারণ সুলতান নির্বাচনের অনুমতি রাখেন, যিনি তাদের জানা মতে স্বর্গীয় বিধান অমান্য করবেন না বা জনগণের উপর নির্যাতন করবেন না। ১০০
