ইহুদিদের কাছে মিথটি গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গিয়েছে। অনেকেই আবিষ্কার করেছিল যে, হলোকাস্টের ট্র্যাজিডির পর তারা ঈশ্বরকে কেবল যিমযুমের কষ্টসওয়া অক্ষম ঐশী সত্তা হিসাবে দেখছিল, যিনি আর সৃষ্টির নিয়ন্ত্রণে নেই।” বস্তুতে আটকা পড়া ঐশী স্ফুলিঙ্গের ইমেজারি ও তিক্কুনের পুনঃস্থাপনের মিশন এখনও আধুনিক মৌলবাদী ইহুদি আন্দোলনসমূহকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। সকল সত্যি মিথের মতো লুরিয় কাব্বালাহ ছিল এক উন্মোচন, ইহুদিদের দেখিয়ে দিয়েছিল তাদের জীবন আসলে কী, কী তার অর্থ। মিথটি এর নিজস্ব সত্যি ধারণ করে। এবং কোনও গভীর স্তরে স্বপ্রকাশিত। এটা যেমন যৌক্তিক প্রমাণ গ্রহণ করতে পারে না, তেমনি এর তার কোনও প্রয়োজনও নেই। আজকের দিনে আমাদের উচিত হবে লুরিয় কাব্বালাহকে প্রতীক বা উপমা হিসাবে আখ্যায়িত করা, কিন্তু সেটাও একে যৌক্তিকভাবে বন্দি করারই শামিল হবে। মূল গ্রিকে ‘প্রতীক’ শব্দটির মানে ছিল দুটি বস্তুকে এক করা যাতে তারা অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু যখনই পশ্চিমের লোকজন কোনও আচার বা আইকন ‘কেবল প্রতীকমাত্র’ বলতে শুরু করল, তখনই এমনি বিচ্ছেদের উপর গুরুত্ব আরোপকারী আধুনিক চেতনা আবির্ভূত হয়েছিল।
প্রথাগত ধর্মে মিথ কাল্ট হতে অবিচ্ছেদ্য, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ধ্যানমূলক অনুশীলনের ভেতর দিয়ে তা উপাসকদের ইহজাগতিক জীবনে চিরন্তন বাস্তবতাকে হাজির করে। এর প্রতীকীবাদের শক্তি সত্ত্বেও লুরিয়ানিক কাব্বালাহ নির্বাসিতের মাঝে এক ধরনের দুয়ের বোধ জাগিয়ে তোলার মতো চমৎকার আচারের মাধ্যমে প্রকাশ করা না হলে ইহুদি অবস্থার প্রতি এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত না। সাফেদে কাব্বালিস্টরা লুরিয়ার ধর্মতত্ত্বকে নতুন করে নির্মাণ করতে বিশেষ ধরনের আচার উদ্ভাবন করেছিল। নিজেদের শেখিনাহর সাথে পরিচিত করে তুলতে তারা রাত জাগত, তাঁকে তারা বিশ্বময় দুর্গতের মতো ঘুর বেড়ানো ঐশী উৎসের আকাঙ্ক্ষাকারী নারী হিসাবে কল্পনা করত। মাঝ রাতে ঘুম থেকে জেগে পায়ের জুতো খুলে কান্নাকাটি করত ইহুদিরা, ধুলোয় মুখ ঘঁষত। এইসব আচরিক কর্মকাণ্ড নিজস্ব শোক ও পরিত্যাগের বোধ তুলে ধরার কাজে সহায়তা করেছে তাদের ও ঐশী সত্তার সহ্য করা ক্ষতির সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করতে সাহায্য করেছে। সারারাত জেগে শুয়ে থাকত তারা, প্রেমিকের মতো ঈশ্বরকে ডাকত, যা নির্বাসিতের ভোগান্তির মূল মানুষের দুর্গতির মূলে অবস্থিত বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় বিলাপ করে চলত। প্রায়শ্চিত্তের অনুশীলনও—উপবাস, বেত্রাঘাত, বরফে গড়াগড়ি খাওয়া- তিরুনের অংশ হিসাবে পালন করা হত। পল্লী এলাকায় দীর্ঘ পথ হাঁটতে বের হত কাব্বালিস্টরা, শেকিনাহর মতো ঘুরে বেড়াত, নিজেদের উন্মুল বোধের অভিনয় করত। ইহুদি বিধানে জোর দেওয়া হয়েছে যে, সমবেতভাবে অন্তত দশ জন পুরুষ মিলে পালন করলে প্রার্থনা গভীরতম শক্তি ও অর্থ পেতে পারে। কিন্তু বিশ্বে তাদের বিচ্ছিন্নতা ও নাজুক দশার প্রকৃত বোধ পরিপূর্ণভাব উপলব্ধি করার জন্যে সাফেদে ইহুদিদের বিচ্ছিন্নভাবে প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই একাকী প্রার্থনা ইহুদি ও সমাজের বাকি অংশের মাঝে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি করে তাকে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার জন্যে তৈরি করে দিয়েছে এবং ক্রমাগত ইহুদি জনগণের অস্তিত্বকে হুমকি দিয়ে চলা এক বিশ্বে বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাকে নতুন করে উপলব্ধি করার বেলায় তাদের সাহায্য করেছে।১৭
কিন্তু লুরিয়া কোনও রকম উন্মত্ততাকে আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে অটল ছিলেন। অবশ্যই যতক্ষণ পর্যন্ত কিছু পরিমাণ আনন্দ লাভ না করতে পারছে ততক্ষণ কাব্বালিস্টদের শৃঙ্খলিত, পদ্ধতিগত উপায়ে বিষাদের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হবে। মাঝরাতের আচার সবসময়ই ভোরে শেকিনাহ ও এন সফের চূড়ান্ত পুনর্মিলনের উপর ধ্যানের ভেতর দিয়ে শেষ হত, যার অর্থ স্বর্গের সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতার অবসান। কাব্বালিস্টকে তার প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গই ঐশী সত্তার পার্থিব মন্দির বলে বিশ্বাস করার জন্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।১৮ সকল বিশ্বধর্মই জোর দিয়ে বলে যে বাস্তবিক সহানুভূতির বোধ না জাগালে কোনও আধ্যাত্মিকতাই বৈধ নয়। লুরিয়ার কাব্বালাহ এই দর্শনের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। অন্যদের আঘাত দেওয়া ভুল, যৌন হয়রানি, বিরূপ গুজব, কারও সতীর্থকে অসম্মান করা ও বাবা-মাকে অমর্যাদা করার ক্ষেত্রে কঠিন সাজার ব্যবস্থা ছিল। ১৯
সবশেষে অধিকাংশ বিশ্বধর্ম বিকশিত অতীন্দ্রিয় অনুশীলনের দীক্ষা দেওয়া হয়েছিল কাব্বালিস্টদের। দক্ষ কাব্বালিস্টকে তা মনের গভীরতর অঞ্চলে প্রবেশাধিকার লাভ ও স্বজ্ঞামূলক অন্তর্দৃষ্টি লাভে সাহায্য করেছে। সাফেদে ঈশ্বরের নাম গড়ে তোলা বিভিন্ন হরফের দক্ষ, বিস্তারিত বিনির্মাণের উপর ধ্যান কেন্দ্রিভুত ছিল। এই ‘মনোসংযোগ’ (কাওয়ানোত) কাব্বালিস্টকে নিজের ভেতর ঐশী সত্তার একটা আভাস লাভে সক্ষম করে তুলত। নেতৃস্থানীয় কাব্বালিস্টরা বিশ্বাস করতেন, সে একজন পয়গম্বরে পরিণত হবে, ঠিক লুরিয়ার মতোই এক নতুন মিথোস উচ্চারণে সক্ষম হয়ে উঠবে এবং এপর্যন্ত আলোর মুখ না দেখা সত্যির উন্মোচন ঘটাবে। এইসব কাওয়ানোত কাব্বালিস্টের জন্যে যারপরনাই আনন্দ বয়ে আনত। লুরিয়ার অন্যতম শিষ্য হাইম ভিতাল (১৫৪২-১৬২০) বলেছেন পরমানন্দের অবস্থায় আনন্দ ও বিস্ময়ের বোধ নিয়ে থরথর করে কেঁপেছেন তিনি। কাব্বালিস্টরা বিভিন্ন দৃশ্য দেখেছে ও আনন্দময় দুয়ের অনভূতি লাভ করেছে যা নিষ্ঠুর ও অচেনা মনে হওয়া একটা সময়ে বিশ্বকে বদলে দিয়েছে।
