আক্রমণ থেকে প্রাণে বেঁচে যান নাসের। হামলার মুখে তাঁর অসম সাহস ও নিরাসক্তি জনপ্রিয়তার পক্ষে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখে। এবার সোসায়েটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পক্ষে মুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে এক হাজারেরও বেশি ব্রাদার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল। তবে আরও অসংখ্য সদস্য যারা লিফেলট বিলির চেয়ে মারাত্মক কোনও কাজ করেনি, তাদের কোনওদিনই আদালতে হাজির করা হয়নি, পরের পনেরটি বছর নাসেরের কারাগার ও নির্যাতন শিবিরে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে তারা। নাসের যেন ব্রাদারহুডকে শেষ করে দিয়েছেন বলে মনে হয়েছিল, তাঁর চলার পথেই মিশরের একমাত্র প্রগতিশীল ইসলামি আন্দোলনকে থমকে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে নাসের দুই বছর পরে স্যুয়েয সঙ্কটের পরবর্তী সময়ে আরব বিশ্বের নায়কে পরিণত হলে সেক্যুলারিজমকেই যেন বিজয়ী মনে হচ্ছিল, এই সময় তিনি কেবল পাশ্চাত্যকে সাফল্যের সাথে উপেক্ষাই করেননি, বরং ব্রিটিশের উপর শোচনীয় অপমান চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রাদারদের বিরুদ্ধে এই বিজয় শেষ পর্যন্ত শ্মশানের বিজয়ে পরিণত হয়। নাসেরের জীবদ্দশায় যেসব ব্রাদার কারাগারে ছিল সেক্যুলারিজমের সবচেয়ে আগ্রাসী চেহারা দেখতে পেয়েছে তারা। আমরা দেখব যে, শিবিরে বান্নার কিছু সংখ্যক অনুসারী ব্রাদার বান্নার সংস্কারবাদী দর্শন ত্যাগ করে একটি নতুন সহজাতভাবে সহিংস সুন্নি মৌলাবাদ গড়ে তুলেছিল।
ইরানিরাও ভয়ঙ্কর সেক্যুলারিস্ট আক্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করছিল। রেযা শাহর আধুনিকায়ন কর্মসূচি মিশর বা তুরস্কের আধুনিকায়নের কর্মসূচির চেয়ে ঢের বেশি দ্রুত গতির ছিল, কারণ তিনি ক্ষমতায় আসীন হওয়ার সময় ইরানে তখনও বলতে গেলে আধুনিকায়ন শুরুই হয়নি। ` রেযা ছিলেন নিষ্ঠুর। বিরোধীদের স্রেফ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে; প্রথম যাদের বিদায় নিতে হয়েছিল তাঁদের অন্যতম ছিলেন মজলিসে শাহর বিরোধিতাকারী আয়াতোল্লাহ মুদাররিস। ১৯২৭ সালে তাঁকে কারাবন্দি করা হয়েছিল এবং ১৯৩৭ সালে হত্যা করা হয়।` রেযা প্রথমবারের মতো দেশটিকে কেন্দ্রিভূত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু বিদ্ৰোহ দমন ও এযাবৎ কার্যত স্বায়ত্তশাসন ভোগকারী যাযাবর গোত্রগুলোকে দরিদ্রতর করে তোলার মাধ্যমে সবচেয়ে নিষ্ঠুর উপায়ে। রেযা বিচার ব্যবস্থাকে সংস্কার করেন, তিনটি নতুন সেক্যুলার আইনি বিধি-সিভিল, কমার্শিয়াল ও ক্রিমিনাল-শরীয়াহকে প্রতিস্থাপন করে।১৪ দেশকে শিল্পায়িত করে আধুনিক সুযোগসুবিধার আমদানি করতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৯৩০-র দশকের শেষদিকে বেশিরভাগ শহরেই বিদ্যুৎ ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ছিল। কিন্তু সরকারী নিয়ন্ত্রণ একটি সত্যিকারের প্রগতিশীল পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল; মজুরি ছিল কম, শোষণ ছিল মারাত্মক। এই অতিশয় নির্মম পদ্ধতি নিষ্ফল প্রমাণিত হয়েছে; ইরান অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি, ব্রিটেন তখনও প্রতিশ্রুতিশীল তেল শিল্পের মালিকানা বজায় রেখেছিল, অর্থনীতিতে বলতে গেলে যার কোনও অবদানই ছিল না, বিদেশী ঋণ ও বিনিয়োগ গ্রহণে ইরানকে বাধ্য করা হচ্ছিল।
রেযার কর্মসূচি অনিবার্যভাবে উপরিতলের ছিল। পুরোনো কৃষিভিত্তিক অবকাঠামোর উপরই আধুনিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে চাপিয়ে দিয়েছিল, মিশরে এই পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছিল, এখানেও একই ভাগ্য বরণ করবে। কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত জনসংখ্যার নব্বই ভাগকে উপেক্ষা করা হয়েছিল; প্রথাগত কৃষি পদ্ধতি ছিল অব্যাহত এবং অনুৎপাদশীল রয়ে গেছে। সমাজের মৌলিক কোনও সংস্কার সাধিত হয়নি। দরিদ্রদের দুঃখদুর্দশায় সামান্যতমও আগ্রহী ছিলেন না রেযা, সেনাবাহিনী মোট বাজেটের পঞ্চাশ ভাগ পেলেও মাত্র চার ভাগ ব্যয় করা হত শিক্ষাখাতে, তাও ছিল সুবিধাভোগী শ্রেণীর অধিকারে। ৫ মিশরের মতোই ইরানে দুটি জাতি গড়ে উঠছিল, যারা ক্রমবর্ধমানহারে পরস্পরকে বুঝে উঠতে পারছিল না। ক্ষুদ্র পাশ্চাত্যকৃত সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অভিজাত সম্প্রদায়কে নিয়ে ছিল একটি ‘জাতি’, রেযার আধুনিকায়ন কর্মসূচির ফায়দা লুটছিল তারা; অন্য ‘জাতি’টি ছিল শাসকগোষ্ঠীর নতুন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ প্রত্যক্ষ করে হতচকিত বিশাল দরিদ্র জনসাধারণকে নিয়ে, আগের চেয়ে আরও বেশি করে উলেমাদের পরামর্শের উপর নির্ভর করেছে তারা।
কিন্তু খোদ উলেমারাই রেযার সেক্যুলারাইজেশন নীতির প্রভাবে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন। যাজকদের ঘৃণা করতেন তিনি, ইরানে তাঁদের উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা হ্রাস করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর প্রাচীন পারসিয় সংস্কৃতি ভিত্তিক ইরানি জাতীয়তাবাদ ইসলামকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছিল। রেযা ইমাম হুসেইনের সম্মানে আয়োজিত আশুরা উদযাপন (তাদের বিপ্লবী সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দান করা) দমনের প্রয়াস পেয়েছিলেন, মক্কায় হাজ্জ করতে যাওয়ার ব্যাপারে ইরানিদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ১৯৩১ সালে শরীয়াহ আদালতের আওতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। যাজকদের কেবল ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল; অন্য সমস্ত মামলা নতুন সিভিল আদালতে পাঠনো হচ্ছিল। এক শত বছরেরও বেশি সময় ধরে উলেমারা ইরানে প্রায় বল্গাহীন ক্ষমতা ভোগ করে এসেছেন; কিন্তু এবার পদ্ধতিগতভাবে তাদের ক্ষমতা খর্ব করার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করলেন তাঁরা, কিন্তু মুদাররিসের হত্যাকাণ্ডের পর বেশির ভাগ যাজকই প্রতিবাদ করার সাহস করে উঠতে পারেননি। ৯৬
