সম্ভবত মিশরিয় রাজনৈতিক মঞ্চে প্রধান কুশীলব সোসায়েটি অভ মুসলিম ব্রাদার্সেরও নিজস্ব সন্ত্রাসী সংগঠন থাকার ব্যাপারটা অনিবার্য ছিল, কিন্তু এটা ছিল একটা করুণ পরিবর্তন। বান্না স্বয়ং গোপন অ্যাপারেটাসের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কিনা সেটা পরিষ্কার নয়। তিনি সবসময়ই তাদের নিন্দা করেছেন, কিন্তু এই বছরগুলোয় সরকারের নিন্দাবাদেও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তিনি।৮৬ নিজের সন্ত্রাসী ইউনিটকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বান্না, এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড এমন কিছু ঘটনাপ্রবাহের সৃষ্টি করেছিল যা তাঁর মৃত্যু ডেকে এনেছে, সোসায়েটির নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা মসীলিপ্ত করেছে এবং শেষ পর্যন্ত এর ধ্বংস ডেকে এনেছে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে সিক্রেট অ্যাপারেটাসের সদস্যরা সম্মানিত বিচারক আহমাদ আল-খাযিন্দারের হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে সূচিত সন্ত্রাসের কর্মসূচি হাতে নেয়, গোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে তা অব্যাহত থাকে; কায়রোর ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা সহিংস আক্রমণ হয়, বোমা বর্ষণ করা হয়, ফলে অনেক সম্পদ বিনষ্ট হয়, অসংখ্য মানুষ আহত হয় বা প্রাণ হারায়; ২৮শে ডিসেম্বর, ১৯৪৮ প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ আল- নাকরাশির হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এটা পরিণতি লাভ করে।
সোসায়েটি এইসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছে, নাকরাশি হত্যাকাণ্ডে ত্রাসের ভবিষ্যদ্বাণী করেন বান্না। ৭ তাসত্ত্বেও সমাজের সকল স্পষ্ট সেক্টরের নিন্দার পাত্র নতুন প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম আল-হাদি বড্ড বেশি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা ব্রাদারহুডকে ধ্বংস করার এই সুযোগ লুফে নেন। সোসায়েটিকে দমন করা হয়, সদস্যদের ঘেরাও করে গ্রেপ্তার করা হয়, নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয় তারা, এবং ১৯৪৯ সালের জুলাই নাগাদ আব্দ আল-হাদি অবশেষে পদত্যাগ করার সময় পাঁচ হাজারেরও বেশি ব্রাদার কারাগারে অবস্থান করছিল।৮৮ কিন্তু ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ বান্নাকে ইয়াং মেন’স মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যালয়ের ঠিক বাইরে প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিতে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
১৯৫০ সালে গোপনে সোসায়েটি আবার সংগঠিত হতে শুরু করে, একজন নতুন নেতা নির্বাচন করে তারা: মধ্যপন্থী ও সহিংসতা এড়িয়ে চলার কারণে সুপরিচিত বিচারপতি হাসান ইসমাইল আল-হুদাইবি। আশা করা হয়েছিল যে, সোসায়েটিকে অতি প্রয়োজনীয় সম্মান এনে দেবেন তিনি। কিন্তু হুদাইবি তাঁর দায়িত্বের উপযুক্ত ছিলেন না। বান্নার শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাবে নেতাদের ভেতর উপদলীয় কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে, সিক্রেট অ্যাপারেটাসকে নিয়ন্ত্রণে অক্ষম প্রমাণিত হন হুদাইবি, ১৯৫৪ সালে ফের সোসায়েটির পতন ঘটায় তারা।
এই সময় নাগাদ মিশর ভয়ঙ্কর তরুণ আর্মি অফিসার জামাল আব্দ-আল নাসেরের (১৯১৮-৭০) হাতে শাসিত হচ্ছিল। ২২শে জুলাই ১৯৫২ তারিখে ফ্রি অফিসারদের অ্যাসোসিয়শনকে সাথে নিয়ে পুরোনো মর্যাদাহীন শাসকগোষ্ঠীকে এক সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত করেছিলেন তিনি। মিশরে এক বিপ্লবী প্রজাতন্ত্র কায়েমের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পুরোনো উদার আদর্শ থেকে সম্পূর্ণই ভিন্ন ধরনের উগ্র জাতীয়বাদের প্রবক্তা ছিলেন নাসের। ১৯২০ ও ১৯৩০-র দশকের মিশরিয় বুদ্ধিজীবীদের বিপরীতে নতুন আরব জাতীয়বাদীরা পাশ্চাত্যের প্রতি মুগ্ধ ছিল না। আর মধ্যপ্রাচ্যে এমন পরিষ্কারভাবে ব্যর্থ সংসদীয় গণতন্ত্রেরও ফুরসত ছিল না তাদের। নাসেরের সরকার উগ্রভাবে সমাজতন্ত্রী ছিল, তিনি সোভিয়েতদের তোয়াজ করে চলতেন। ব্রিটিশদের চিরকালের জন্যে মিশর থেকে তাড়াতে ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; পাশ্চাত্য ও ইসরায়েলের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর জনগণের জন্যে মোহমুক্তভাবে উপেক্ষার। তাঁর বিদেশ নীতি ছিল প্যান-আরব এবং ইউরোপিয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি লাভের প্রয়াসে রত অন্য এশিয় ও আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে মিশরের সংহতির উপর জোর দিয়েছে। নাসের পোড়খাওয়া সেক্যুলারিস্ট ছিলেন। ধর্মসহ কোনও কিছুকেই জাতীয় স্বার্থের প্রতি বাধা হতে দেওয়া যাবে না; ধর্মসহ সমস্ত কিছু রাষ্ট্রের অধীনে থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত নাসের মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মানবে পরিণত হবেন এবং ‘নাসেরবাদ’ হবে প্রধান মতাদর্শ। কিন্তু গোড়ার দিকের বছরগুলোয় নাসেরকে সংগ্রাম করতে হচ্ছিল: তিনি তেমন একটা জনপ্রিয় ছিলেন না, কোনও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বেঁচে থাকতে দিতে পারেননি।
অবশ্য প্রথমে ব্রাদারকে তোয়াজ করেছেন নাসের। ওদের তাঁর প্রয়োজন ছিল, ইসলামি বাগাড়ম্বর ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন বলে সোসায়েটি তাঁকে সমর্থন দিয়েছে, এর রোভাররা জুলাই বিপ্লবের পর আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বিশেষ করে জনমুখী মুসলিম বাগাড়ম্বব সত্ত্বেও নাসেরের ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও ছিল না এটা পরিষ্কার হয়ে যাবার পর এক ধরনের প্রাথমিক টানাপোড়েন চলছিল। হুদাইবির ইসলামি নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি অসমেয়োচিত পরিণত হলে নাসেরের কেবিনেট ১৫ই জানুয়ারি, ১৯৫৪ পাল্টা বিপ্লব সংগঠন করার অভিযোগ তুলে আরও একবার সোসায়েটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। * ব্রাদারহুডের একটা নিউক্লিয়াস আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়, অপপ্রচারের অভিযান শুরু করে সরকার, ব্রাদারদের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখা ও ব্রিটিশদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়। শাসককুল নিজেদের ইসলামি পরিচয় স্পষ্ট করে তোলার প্রয়াস পায় এবং নতুন ইসলামি কংগ্রেসের সেক্রেটারি জেনারেল আনোয়ার সাদাত আধাসরকারী পত্রিকা আল-জামহারিয়াহ- ‘প্রকৃত’ ও ‘উদার’ ইসলামের উপর বেশ কয়েকটি নিবন্ধ লিখেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ২৬শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে খোদ ব্রাদারহুড নাসেরের হাতের খেলার পুতুলে পরিণত হয়, সোসায়েটির সদস্য আব্দ আল-লতিফ এক র্যালিতে নাসেরকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে।
