সোসায়েটির শত্রুরা সব সময়ই বান্নার বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’ সৃষ্টির অভিযোগ তুলে আসছিল। তিনি প্রকৃতই স্পষ্ট হুমকিস্বরূপ সরকারের ঘাটতিগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলা এক ব্যাপক সফল প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষা ও শ্রমিকদের অবস্থার প্রতি সরকারের অবহেলার দিকে তা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে; সোসায়েটি একাই ফেলাহিনদের কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হওয়ার ব্যাপারটি সত্যিই বিব্রতকর ছিল। কিন্তু তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সোসায়েটির সকল প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট মুসলিম পরিচয় ছিল। এর সমস্ত কারখানায় মসজিদ ছিল, আবশ্যক প্রার্থনার জন্যে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া হত; কোরানের সামাজিক বাণী মোতাবেক কর্ম পরিবেশ ও মজুরি ছিল ভালো। শ্রমিকরা স্বাস্থ্য বীমা ও শোভন অবকাশ পেত; যে কোনও বিরোধের সমাধান করা হত ন্যায়সঙ্গতভাবে। বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতরা যাই বলে থাকুন না কেন, মিশরের বেশির ভাগ মানুষই ধার্মিক হতে চায় এই বাস্তবতার নাটকীয় প্রকাশই ছিল সোসায়েটির অসাধারণ সাফল্য। এটা দেখিয়েছে যে ইসলাম প্রগতিশীল হতে পারে। সপ্তম শতাব্দীর রেওয়াজে কোনও দাসত্বমূলক প্রত্যাবর্তন ছিল না। ব্রাদাররা সৌদি আরবের নতুন ওয়াহাবি রাজ্যের ব্যাপারে দারুণভাবে সমালোচনামুখর ছিল, ইসলামি আইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যার-যেমন চোরের হাত কাটা বা ব্যাভিচারীকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা-নিন্দা করেছে। ভবিষ্যৎ ইসলামি রাষ্ট্রের রাজনীতির রূপ সম্পর্কে ব্রাদারদের কোনও ধারণা ছিল না। তবে তারা জোরের সাথে বলেছে কোরান ও সুন্নাহর চেতনার প্রতি বিশ্বস্ত হতে হলে সৌদি আরবের চেয়েও সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন থাকতে হবে। ওদের সাধারণ ধারণা নিশ্চিতভাবে সময়ের সাথে তাল মেলানো ছিল: শাসকদের নির্বাচিত হতে হবে (আদি মুসলিমকালের মতো), এবং রাশিদুন (‘ন্যায়নিষ্ঠ’) খলিফাগণ যেমন তাগিদ দিয়েছেন, একজন শাসককে অবশ্যই তাঁর জাতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে; তিনি স্বৈরাচারীমূলক শাসন চালাতে পারবেন না। কিন্তু সম্ভাব্য ইসলামি রাষ্ট্র সংক্রান্ত আলোচনাকে বান্না সব সময়ই অপরিপক্ক মনে করেছেন, কারণ এখনও প্রাথমিক অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে।৭৮ বান্না স্রেফ মিশরকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন; সোভিয়েতরা কমিউনিজম বেছে নিয়েছে, পাশ্চাত্য বেছেছে গণতন্ত্র; যেসব দেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, ইসলামি ভিত্তিতে তাদের রাজনীতি নির্মাণ করার অধিকার থাকা উচিত, যদি তারা কখনও ইচ্ছা করে।
সোসায়েটি নিখুঁত ছিল না। সাধারণ মানুষের কাছে এর আবেদনের কারণে প্রতিবুদ্ধিজীবী প্রবণ হয়ে উঠেছিল। এর বিভিন্ন ঘোষণা অনেক সময়ই আত্মরক্ষামূলক ও স্বয়ং-ন্যায়নিষ্ঠ হতে দেখা গেছে। পাশ্চাত্য সম্পর্কে এর লোভ, স্বৈরাচার ও আধ্যাত্মিক দেউলিয়াত্বের উপর জোর দেওয়া ব্রাদারস-এর ইমেজ উপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্য কেবল, সোসায়েটির এক মুখপাত্র যেমন বলেছিলেন, ‘আমাদের অমর্যাদা করা, আমাদের দেশ দখল করা ও ইসলামের ধ্বংস শুরু করা ছিল না। সোসায়েটির নেতৃবৃন্দ সাধারণ কাতারে মতদ্বৈততার ব্যাপারে অসহিষ্ণু ছিলেন। চরম আনুগত্যের উপর জোর দিয়েছেন বান্না, তিনি পর্যাপ্তভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর কেউই তাঁর স্থান নিতে পারেননি। সোসায়েটি কার্যত অর্থহীন অন্তর্কলহের কারণে শেষ হয়ে গেছে। তবে এর সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষতিকর ব্যর্থতা ছিল ১৯৪৩ সালে ‘দ্য সিক্রেট অ্যপারেটাস’ (আল-জিহাজ আল-সিররি) নামে সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা। ১ সামগ্রিকভাবে সোসায়েটিতে তা প্রান্তিক রয়ে গিয়েছিল। গোপন সংগঠন হওয়ায় আমরা এর সম্পর্কে খুব কমই তথ্য জানি, তবে সোসায়েটির নিশ্চিত গবেষণায় রিচার্ড পি. মিচেল তাঁর বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন যে, ১৯৪৮ সাল নাগাদ ইউনিটের মাত্র হাজার খানেক সদস্য ছিল, বেশির ভাগ ব্রাদারই তখন পর্যন্ত এর অস্তিত্বের কথা জানত না।` বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের কাছে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কার ছিল সোসায়েটির রেইজন দে’এতরে, অ্যাপারেটাসের সন্ত্রাসের নিন্দা করেছে তারা। তাসত্ত্বেও ঈশ্বরের নামে মানুষ হত্যা শুরু করলে কোনও সংগঠন সবচেয়ে মৌলিক ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্বীকারকারী এক বিনাশী পথে পা বাড়ায়।
১৯৪০-র দশক মিশরের পক্ষে খুবই উত্তাল সময় ছিল। উদার গণতন্ত্রের ব্যর্থতা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, এবং অধিকাংশ মিশরিয় সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে নৈরাশ্যবাদী হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ বা মিশরিয় জাতীয়তাবাদীদের কেউই বুঝতে পারেনি যে উপরিতলের ও অতি দ্রুত আধুনিকায়নের ফলে মূলত তখনও সামন্ত বাদী ও কৃষিভিত্তিক রয়ে যাওয়া একটি দেশে সরকারের আধুনিক পদ্ধতি কায়েম সম্ভব নয়। ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে সতেরটি সাধারণ নির্বাচনের প্রত্যেকটিতে জাতীয়তাবাদী ওয়াফদ পার্টি জয়লাভ করলেও মাত্র পাঁচবার তাদের শাসন করার সুযোগ দেওয়া হয়। ওয়াফদপন্থীদের সাধারণত ব্রিটিশ বা রাজপ্রাসাদের তরফ থেকে পদত্যাগে করতে বাধ্য করা হত।৮৩ ১৯৪২ সালে এমনকি ব্রিটিশরা জার্মানপন্থী প্রধানমন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে অপেক্ষাকৃত কম খারাপ হিসাবে ওয়াফদ পার্টিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করলে এর উপরও শ্রদ্ধা হারিয়ে বসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কায়রোয় এক সন্ত্রাসের আবহ বিরাজ করছিল, সেই সাথে হতাশা; ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর প্যালেস্তাইনে আগ্রাসন চালানোর পর মিশরসহ পাঁচটি আরব বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ে তা আরও গভীর হয়ে ওঠে। প্যালেস্তাইন হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ও ১৯৪৮ সালে গৃহত্যাগে বাধ্য হওয়া ৭৫০,০০০ প্যালেস্তাইনি শরণার্থীর দুঃখদুর্দশার প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের উদাসীনতা আধুনিক বিশ্বে আরবদের অক্ষমতাই তুলে ধরেছে। আরব আজও ১৯৪৮ সালের ঘটনাকে আল-নাখবাহ: মহাজাগতিক পর্যায়ের বিপর্যয় হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকে। এমনি ভীষণ আবহে অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সন্ত্রাসই ‘একমাত্র উপায়। নিশ্চিতভাবেই এটা পরে মিশরের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন আনোয়ার আল-সাদাতের মত ছিল; ক্যানাল যোনে ব্রিটিশদের হামলা ও ব্রিটিশদের ‘দালালী’ করা মিশরিয় রাজনীতিবিদদের হত্যা করার লক্ষ্যে ১৯৪০-র দশকে ‘মার্ডার সোসায়েটি’ গঠন করেছিলেন তিনি। সহিংসতাকেই একমাত্র উপায় মনে করা অন্য প্যারামিলিটারি গ্রুপও ছিল: রাজপ্রাসাদের সাথে সংশ্লিষ্ট দ্য গ্রিন শার্টস এবং ওয়াফদ-এর সাথে সম্পর্কিত ব্লুশার্টস।৮৫
