আমরা ইসলামের মাহাত্ম্যে পৌঁছানোর বাস্তব পথ জানি না, মুসলিমদের কল্যাণের লক্ষ্যে সেবা করতেও না। আমরা এই অপমান আর বিধিনিষেধে ভরা জীবনে ক্লান্ত। তো আমরা দেখতে পাচ্ছি আরব ও মুসলিমদের কোনও মর্যাদা বা সম্মান নেই। আমাদের রক্ত ছাড়া আর কিছুই নেই…আর আছে প্রাণ…আর সামান্য কটি পয়সা। আমরা আপনার মতো করে কর্মের পথ বা পিতৃভূমি চিনতে পারিনি, ধর্ম ও উম্মাহকে আপনার মতো সেবার পথও চিনতে অক্ষম ৬৫
এই আবেদনে আলোড়িত হয়েছিলেন বান্না। একসাথে তিনি ও তাঁর অতিথিরা ‘ইসলামের বাণীর স্বার্থে সেনাদল [জুন্দ]’ হওয়ার শপথ গ্রহণ করলেন। সেরাতে সোসায়েটি অভ মুসলিম ব্রাদার্সের জন্ম হলো। নগণ্য এই সূচনা থেকে সম্প্রসারিত হয়। ১৯৪৯ সালে বান্নার পরলোকগমনের সময় সারা মিশরে সোসায়েটির ২,০০০ শাখা ও ৬০০,০০০ ব্রাদার ও সিস্টার ছিল। এটাই মিশরের সমাজের প্রতিটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করা একমাত্র সংগঠন: সিভিল সার্ভেন্ট, ছাত্র ও সম্ভাব্য শক্তিধর শহুরে শ্রমিক গোষ্ঠী ও কৃষক সমাজ।৬৬ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ নাগাদ মিশরিয় রাজনীতির দৃশ্যপটে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিল সোসায়েটি।
অস্তিত্বের প্রথম রাত থেকেই উগ্র ইমেজারি সোসায়েটির বৈশিষ্ট্যে পরিণত হলেও বান্না সব সময়ই জোরের সাথে বলেছেন যে, অভ্যুত্থান সংগঠন বা ক্ষমতা দখলের কোনও অভিলাষ তাঁর নেই। সোসায়েটির প্রধান লক্ষ্য ছিল শিক্ষা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষ ইসলামের বাণী আত্মস্থ করতে পারলে সহিংস ক্ষমতা দখল ছাড়াই জাতি মুসলিম হয়ে উঠবে। একেবারে গোড়ার দিকে আফগানি, আব্দুহ ও রিদাহর সালাফিয়াহ সংস্কার আন্দোলনের প্রতি ঋণ প্রকাশ করে ছয়দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন বান্না: (১) যুগের চেতনায় কোরানের ব্যাখ্যা, (২) ইসলামি জাতিগুলোর ঐক্য, (৩) জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা অর্জন, (৪) নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, (৫) বিদেশী আধিপত্য থেকে মুসলিম অধিকৃত অঞ্চলসমূহ উদ্ধার ও (৬) বিশ্বজুড়ে ইসলামি শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রসার।৬৭ বান্না চাননি, সোসায়েটি সহিংস বা রেডিক্যাল হোক, কিন্তু নীতিগতভাবে তিনি উপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে নমিত ও শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মুসলিম সমাজের মৌলিক সংস্কারের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন।৬৮ মিশরিয়রা নিজেদের ইউরোপিয়দের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু এর কোনও প্রয়োজনই ছিল না। তাদেরও অসাধারণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যা আমদানি করা আদর্শ থেকে ঢের বেশি সাহায্য করবে তাদের।৬৯ ফরাসি বা রাশিয়ান বিপ্লব অনুকরণ করা উচিত হবে না, কারণ পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) ১৩০০ বছর আগেই স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়ে গেছেন।৬৯ শরীয়াহ এমনভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশগুলোর সাথে খাপ খেয়ে যায় যেভাবে কোনও বিদেশি আইনের পক্ষে সম্ভব হবে না। মুসলিমরা যতদিন অন্য জাতিকে অনুকরণ করবে তত দিন তারা ‘সাংস্কৃতিক সঙ্কর’ই রয়ে যাবে।
কিন্তু সবার আগে ব্রাদার ও সিস্টারদের নিজেদের ইসলামের সাথে নতুন করে পরিচিত হতে হবে। মুক্তি ও মর্যাদা লাভের কোনও সংক্ষিপ্ত পথ নেই। মুসলিমদের নিজেদের ও সমাজবে একেবারে শূন্য থেকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে বছরের পর বছর অবিরাম পর্যালোচনা ও আত্মমূল্যায়নের মাধ্যমে বান্না একটি দক্ষ ও আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৩৮ সালে সদস্যদের বিভিন্ন ‘ব্যাটালিয়নে’ বিভক্ত করা হয়, প্রতিটিতে তিনটি করে গ্রুপ ছিল-একটি শ্রমিকদের জন্যে, একটি ছাত্রদের ও অন্যটি ব্যবসায়ী ও সিভিল সার্ভেন্টদের। গ্রুপগুলো সপ্তাহে একদিন প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার জন্যে মিলিত হত। যে আশা নিয়ে নবীনদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সেটা পূরণ না হওয়ায় ১৯৪৩ সাল নাগাদ ‘ব্যাটালিয়নগুলোকে’ ‘পরিবার’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়। এর প্রতিটির দশ জন করে সদস্য ছিল, ইউনিট হিসাবে তৎপরতার জন্যে দায়ী ছিল তারা। পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে একবার মিলিত হত, একে অন্যের উপর নজর রাখত যাতে প্রত্যেকে ‘স্তম্ভ’গুলো অনুসরণ করে; জুয়া, মদ, সুদ ও ব্যাভিচার থেকে দূরে থাকে। মিশরের সমাজ আধুনিকায়নের চাপে ভেঙে পড়ার একটা সময়ে পরিবার ব্যবস্থা মুসলিমদের বাঁধনের উপর জোর দিয়েছিল। প্রতিটি পরিবার ছিল প্রধান কার্যালয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা একটি বৃহত্তর ‘ব্যাটালিয়নের’ অংশ।
এই সময়ের কোনও ক্রিশ্চান সংস্কার আন্দোলনের মতবাদ নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন হত; অংশত এর কারণ ছিল ধর্মকে কতগুলো বিশ্বাসের বিন্যাস পরিপালন হিসাবে মেনে নেওয়া বিবেচনাকারী আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। অবশ্য মুসলিমদের নির্দিষ্ট উপায়ে নিজেদের মাঝে এক মুহাম্মদীয় আদর্শরূপ গড়ে তুলতে সাহায্যকারী শরীয়াহর রক্ষণশীল ধার্মিকতায় সোসায়েটি পরিচালিত হত। তবে এই প্রাচীন কেতার ধার্মিকতা এক আধুনিক বেশে প্রসারিত হয়েছিল। পয়গম্বরের মতো ঈশ্বরমুখীনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আচার, প্রার্থনা ও নৈতিক অনুশীলনের নকশা করা হয়েছিল। কেবল এই আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটেই আধুনিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কার মুসলিম জাতির কাছে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্বাস করতেন বান্না। ১৯৪৫ সালে এক জনাকীর্ণ সভায় বান্না সিদ্ধান্ত নেন যে, দারুণ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলেও কোনও সরকারই যার জন্যে যথার্থ পদক্ষেপ নেয়নি এমন একটি সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণের সময় হয়েছে। ব্রাদাররা সব সময় কোথাও কোনও শাখা খোলার সাথে সাথে মসজিদের পাশে ছেলে ও মেয়েদের জন্যে স্কুল নির্মাণ করেছে। আধুনিক স্কাউট আন্দোলন রোভার্সও প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা, যেখানে তরুণ ব্রাদারদের শারীরিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ দেশের বৃহত্তম ও সবচেয়ে শক্তিশালী যুব সংগঠনে পরিণত হয়েছিল রোভাররা এবার এইসব সেবা আরও সুশৃঙ্খল ও দক্ষ হয়ে উঠল। ব্রাদাররা শ্রমিকদের জন্যে নাইট স্কুল ও সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্যে টিউটোরিয়াল কলেজ পরিচালনা করত; তারা গ্রামাঞ্চলে ক্লিনিক ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে; আর দরিদ্রতর পল্লী এলাকার পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য শিক্ষার কাজেও নিয়োজিত ছিল রোভাররা। সোসায়েটি আধুনিক ট্রেড ইউনিয়নও প্রতিষ্ঠা করে, শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন করে তোলে। কিছু ভয়াবহ শ্রমিক শোষণের ঘটনা প্রকাশ করে দেয়; নিজস্ব কারাখানা স্থাপন ও মুদ্রণ, তাঁত, নির্মাণ ও প্রকৌশলের হালকা কারাখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যাপারে তৎপর ছিল তারা।
