*
মুসলিমরা তখন পর্যন্ত কোনও মৌলবাদী আন্দোলনের জন্ম দেয়নি, কারণ তাদের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া তখনও পর্যাপ্তভাবে অগ্রসর হয়নি। তখনও আধুনিকতার নতুন চ্যালেঞ্জ মেটাতে তারা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনর্গঠনে ব্যস্ত ছিল এবং নতুন চেতনা উপলব্ধি করতে জনগণকে সাহায্য করার কাজে লাগাচ্ছিল ইসলামকে। মিশরে এক তরুণ শিক্ষক সব সময়ই বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র বলয়ে সীমাবদ্ধ আফগানি, আব্দুহ ও রিদাহর সংস্কার ধারণা অধিকতর সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে এসেছিলেন। খোদ এটাই ছিল আধুনিকায়নের একটি প্রক্রিয়া। প্রাচীন সংস্কারকগণ তখনও রক্ষণশীল রীতিনীতিতে আকার লাভ করছিলেন, অধিকাংশ প্রাক আধুনিক দার্শনিকদের মতো অভিজাতপন্থী ছিলেন তাঁরা, সাধারণ মানুষকে তাঁদের বিমূর্ত ধারণা বোঝার উপযুক্ত মনে করেননি। হাসান আল-বান্না (১৯০৬-৪৯) তাঁদের সংস্কার ধারণাকে গণআন্দোলনে পরিণত করার একটা উপায় বের করেছিলেন। একাধারে আধুনিক ও প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষা ছিল তাঁর। তিনি কায়রোর বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা প্রদানের প্রথম টিচার্স ট্রেনিং কলেজ দার আল-উলুমে পড়াশোনা করেছিলেন, কিন্তু সুফিও ছিলেন বান্না, গোটা জীবন জুড়ে সুফিবাদের আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও আচার তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল।৫৮ বান্নার কাছে বিশ্বাস কোনও ক্রিডের প্রতি মতামতগত সম্মতি ছিল না; এটা এমন কিছু যাকে কেবল যাপন এবং এর আচারগুলোকে যত্নের সাথে পালন করা হলেই উপলব্ধি করা যেতে পারে। তিনি জানতেন, মিশরিয়দের পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রয়োজন ছিল; তিনি এও বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের সমাজকে অবশ্যই রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আধুনিক করে তুলতে হবে। কিন্তু এগুলো ছিল বাস্তব ও যৌক্তিক বিষয় যেগুলোকে অবশ্যই আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারের সাথে হাতে হাত রেখে চলতে হবে। ৫৯
কায়রোর ছাত্র হিসাবে বান্না ও তাঁর বন্ধুরা শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভ্রান্তি দেখে আবেগে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন। রাজনৈতিক অচলাবস্থা বিরাজ করছিল সেখানে: অর্থহীন ও প্রবল বিতর্কে মেতে ছিল বিভিন্ন পক্ষ, মিশরিয় ‘স্বাধীনতা’ সত্ত্বেও তখনও দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়ে যাওয়া ব্রিটিশের হাতে পরিচালিত হচ্ছিল। ব্রিটিশদের নিরাপদ আরামদায়কভাবে আবাস স্যুয়েয খাল এলাকায় ইসমাইলিয়াহয় প্রথম শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আপন জাতির মানুষগুলোর দুর্দশা একেবারে আত্মায় আঘাত করেছিল তাঁর। ব্রিটিশ ও অন্য প্রবাসীদের স্থানীয় জনগণের প্রতি বিন্দুমাত্র দরদ ছিল না, বরং অর্থনীতি ও সরকারী উপযোগের উপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল তারা। ব্রিটিশদের বিলাসী বাড়িঘর ও মিশরিয় শ্রমিকদের কাহিল দর্শন কুঁড়ের বৈপরীত্যে গ্লানি বোধ করেছেন তিনি।৬১ নিবেদিত প্রাণ মুসলিম বান্নার চোখে এটা স্রেফ রাজনীতির কোনও ব্যাপার ছিল না। মুসলিম সম্প্রদায়, উম্মাহর অবস্থা ইসলামে ক্রিশ্চান ধর্মের কোনও মতবাদগত নীতিমালার মতোই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মূল্য রাখে। বান্না আধ্যাত্মিকভাবে তাঁর জনগণের দুঃখকষ্টে বিচলিত বোধ করেছেন ঠিক একজন প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদী বাইবেলের ভ্রান্তি হীনতার ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে মনে করলে বা নেচারেই কারতার কোনও সদস্য তার চোখে যায়নবাদীদের হাতে পবিত্র ভূমির অপবিত্রকরণ মনে করা কিছু দেখলে যেমন বোধ করবে। বান্না বিশেষ করে লোকজনকে মসজিদ ছেড়ে চলে যেতে দেখে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মিশরিয়দের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, এই প্রক্রিয়ায় কায়রোয় প্রকাশিত অসংখ্য পত্রিকায়, সাময়িকী ও ম্যাগাজিনে পাশ্চাত্য ধারণার মুখোমুখি হয়ে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল তারা-যেগুলোকে ইসলামের সাথে সম্পর্কহীন বা এর প্রতি ইতিবাচকভাবে বৈরী ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। উলেমাবা আধুনিক দৃশপট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষকে সঠিক কোনও নির্দেশনা দিতে পারছিলেন না তাঁরা। আর রাজনীতিবিদগণ গণমানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা শিক্ষা সমস্যা নিয়ে কোনওরকম স্থিতিশীল প্রয়াস পাচ্ছিলেন না।৬২ বান্না স্থির করেন, একটা কিছু করতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যেখানে নিজেদের বিভ্রান্ত ও মনোবলরহিত মনে করছে সেখানে জাতীয়তাবাদ ও ইউরোপের সাথে মিশরের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে উচ্চমার্গের আলোচনায় কোনও ফায়দা হবার নয়। তাঁর মনে হয়েছিল, লোকে কেবল কোরান ও সুন্নাহর প্রথম নীতিমালায় ফিরে গিয়েই আধ্যাত্মিক উপশম লাভ করতে পারে।
বান্না মসজিদ ও কফিহাউসে উপস্থিত ‘সারমন’ দেওয়ার জন্যে কিছু বন্ধুবান্ধবকে সমবেত করেন। শ্রোতাদের তিনি বললেন, পাশ্চাত্যের প্রভাব ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনসমূহ তাদের ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে, এখন আর নিজেদের ধর্মকে তারা উপলব্ধি করতে পারছে না। ইসলাম পাশ্চাত্য কেতার ধর্মতত্ত্ব বা ক্রিডের কোনও সেট নয়। এটা সর্বাঙ্গীন জীবন ব্যবস্থা, আন্তরিকভাবে এই ধর্ম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারলে তা আবার বহুদিন আগে বিদেশীদের হাতে উপনিবেশে পরিণত হওয়ার আগে মুসলিম উম্মাহর অধিকারে থাকা সেই গতিময়তা ও শক্তি ফিরিয়ে আনবে। উম্মাহকে ফের শক্তিশালী করে তুলতে তাদের অবশ্যই মুসলিম আত্মাকে আবিষ্কার করতে হবে।৬৪ তখনও বিশের কোঠার শুরুর দিকে বয়স হলেও বেশ প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন বান্না। ১৯২৮ সালের মার্চের এক সন্ধ্যায় ইসমাইলিয়াহর ছয়জন স্থানীয় কর্মী তাঁর কাছে এসে তৎপরতা শুরু করার অনুরোধ জানালেন:
