মৌলবাদ ক্রোধের ধর্মে পরিণত হচ্ছিল, কিন্তু হেরেদি ইহুদিবাদের মতো এই ক্রোধ ছিল গভীর ভীতিতে প্রোথিত। এই সময়ের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া প্রিমিলেনিয়ালিজমে এই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ কেবল প্রিমিলেনিয়ালিস্টরাই নিজেদের ‘মৌলবাদী’ আখ্যায়িত করেছিল; বিলি গ্রাহামের মতো অন্য রক্ষণশীল ক্রিশ্চানরা নিজেদের ‘ইভাঞ্জেলিস্ট’ বলতেই পছন্দ করতেন: এই পচা সভ্যতার আত্মাকে রক্ষা করার দায়িত্ব ধর্মীয় বিশ্বাস যাই হোক না কেন অন্য ক্রিশ্চানদের সাথে কিছু মাত্রার সহযোগিতা দাবি করে। অবশ্য মৌলবাদীদের মূলধারা বিচ্ছিন্নতা ও ভিন্নতার উপরই জোর দিয়ে গেছে। যুদ্ধের বছরগুলো যেন উদারপন্থীদের পোস্টমিলেনিয়াল আশাবাদ তিরোহিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে; মৌলবাদীরা নতুন জাতিসংঘ-কে পুরোনো লীগ অভ নেশনস-এর মতোই নেতিবাচক আলোকে দেখেছে। এটা পৃথিবীকে অ্যান্টিক্রাইস্টের স্বৈরাচার ও আসন্ন দুর্ভোগের জন্যে প্রস্তুত করবে। বিশ্বশান্তি বলে কিছু থাকবে না। “বাইবেল এই ধরনের ইউটোপিয় স্বপ্নের বিরোধিতা করে,’ ১৯৪২ সালে লিখেছেন হারবার্ট লকিয়ার। ‘এটাই শেষ যুদ্ধ নয়। বর্তমান ভয়াবহতা আসলে আরও ভয়ঙ্কর কষ্টের জন্ম দেওয়া বীজমাত্র।’৫১ উদারপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গির একেবারেই বিপরীত ছিল এটা। আমেরিকায় আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে একে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নিতে অপারগ ‘দুই জাতি’ ছিল। প্রিমিলেনিয়াল দর্শন মৌলবাদীদের যারপরনাই অসহায়ত্বের বোধের সাক্ষ্য দেয়। তাদের বিশ্বাস ছিল পারমাণবিক বোমা ছিল সেইন্ট পিটারের ভবিষ্যদ্বাণী, যিনি আভাস দিয়েছিলেন যে, অন্তিমকালে ‘সগর্জনে আকাশ অদৃশ্য হয়ে যাবে, নানা উপাদান আগুন ধরে ছিনভিন্ন হবে, পৃথিবী ও এর অভ্যন্তরস্থ সমস্ত কিছু জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাবে।৫২ চূড়ান্ত হলোকাস্ট এড়ানোর কোনওই আশা নেই, ১৯৪৫ সালে ইটারনিটি ম্যগাজিনে ভাবনা প্রকাশ করেছেন ডেভিড গ্রে বার্নহাউস: ‘ঐশী পরিকল্পনা অনিবার্য বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বেস্টসেলার দ্য অ্যাটোমিক এজ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ড অভ গড-এ (১৯৪৮) মৌলবাদী লেখক উইলবার স্মিথ যুক্তি দেখিয়েছেন, বোমা প্রমাণ করেছে যে, অক্ষরবাদীরা আগাগোড়াই সঠিক ছিল।৫৩ ঐশীগ্রন্থে পারমাণবিক বোমার সঠিক পূর্বাভাস দেখিয়েছে যে বাইবেল আসলেই নির্ভুল এবং একে এর সহজ অর্থেই পাঠ করতে হবে।
তারপরেও এই অদৃষ্টবাদী দৃশ্যপট আবার মূলধারার সংস্কৃতির কারণে নিজেদের ঘৃণিত ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন বোধকারী মৌলবাদীদের এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ও প্রাধান্যের বোধ যুগিয়েছে। তাদের কাছে ছিল সেক্যুলারিস্ট বা উদারপন্থী ক্রিশ্চানদের বঞ্চিত করা বাড়তি সুবিধাজনক তথ্য, তারা জানে আসলে কী ঘটছে। বিংশ শতাব্দীর বিপর্যয়কর ঘটনাপ্রবাহ আসলে ক্রাইস্টের চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে পরিচালিত করছে। তাছাড়া, পারমাণবিক হলোকাস্ট সত্যিকারের বিশ্বাসীদের ক্ষতি করবে না, কারণ আমরা যেমন দেখেছি, তারা নিশ্চিত ছিল, সমাপ্তির আগে তাদের তুরীয় আনন্দের মাধ্যমে স্বর্গে তুলে নেওয়া হবে। কেবল ধর্মদ্রোহী ও অবিশ্বাসীরাই এইসব চূড়ান্ত শাস্তি ভোগ করবে। সুতরাং গস্পেলের মৌল চেতনার সাথে খাপ খায় না এমন প্রতিশোধের ফ্যান্টাসি লালন করার সুযোগ করে দিয়ে মৌলবাদীদের অনুভূত অসন্তোষকে ইন্ধন যোগানোই ছিল প্রিমিলেনিয়ালিজম। নতুন ইসরায়েল রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের আপাত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেও স্ববিরোধিতা ছিল।
প্রিমিলেনিয়ালিজমের প্রতিষ্ঠাতা জন ডারবির দর্শনে ইহুদি জাতিই ছিল মূল বিষয়। মৌলবাদীরা ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণায় শিহরিত হয়েছিল ও ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রকৃত সৃষ্টিকে মৌলবাদী যাজক জেরি ফলওয়েল কর্তৃক ‘জেসাস ক্রাইস্টের পুনরাগমনের একক মহান লক্ষণ’ হিসাবে দেখা হয়েছিল; বেন গুরিয়নের ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়ার তারিখ ১৪ই মে, ১৯৪৮-কে জেসাসের স্বর্গারোহণের পর ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে দেখেছেন তিনি।৪ ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন দান বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে; ইসরায়েলের ইতিহাস মানুষের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে, চিরকাল ঈশ্বর স্বয়ং তা নির্ধারণ করে আসছেন। ইহুদিরা পবিত্রভূমিতে বাস না করলে ক্রাইস্ট ফিরে আসতে পারবেন না, সূচনা হতে পারবে না অন্তিমকালের।
প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা উৎসাহী যায়নবাদী হলেও তাদের দর্শনের একটা অন্ধকার দিক ছিল। জন ডারবি শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, অন্তিম কালে অ্যান্টিক্রাইস্ট প্যালেস্তাইনে বসবাসকারী দুই তৃতীয়াংশ ইহুদিকে হত্যা করবে: যাকারিয়াহ এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন; এবং এমনি অন্যসব ভবিষ্যদ্বাণীর মতো তাঁর বক্তব্যকে ও আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।৫৬ মৌলবাদীদের কেউ কেউ হলোকাস্টকে ইহুদিদের পরিবর্তন করার ঈশ্বরের শেষ প্রয়াস হিসাবে দেখেছে এবং দুঃসময়ের পূর্ব নজীর মনে করেছে। ইসরায়েল অ্যান্ড প্রফিসি-তে দ্রুতপ্রজ মৌলবাদী লেখক জন ভালভুর্দ ভবিষ্যদ্বাণীর সমাবেশের উপর ভিত্তি করে ইহুদিদের এই চূড়ান্ত নির্যাতনের বিস্তারিত সময়সূচি তুলে ধরেছেন। অ্যান্টিক্রাইস্ট ইহুদিদের মন্দির নির্মাণে সাহায্য করবে, অনেককেই নিজেকে মেসায়াহ বিশ্বাস করাতে সক্ষম হবে; কিন্তু তারপর নতুন মন্দিরে উপাসনার বস্তু হিসাবে নিজের প্রতিমা স্থাপন করবে। এই ধর্মদ্রোহের পর ১৪৪,০০০ ইহুদি অ্যান্টিক্রাইস্টকে প্রত্যাখ্যান করবে, আবার ফিরে আসবে ক্রিশ্চান ধর্মে, শহীদ হিসাবে প্রাণ হারাবে। অ্যান্টিক্রাইস্ট এরপর জঘন্য নিপীড়ন শুরু করবে, বিপুল সংখ্যায় মারা যাবে ইহুদিরা। জেসাসকে তাঁর দ্বিতীয় আগমনে স্বাগত জানানোর জন্যে মাত্র অল্প কয়েকজন রেহাই পাবে। এ একইসময়ে প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা নতুন ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি উদযাপন করার পাশপাশি অন্তিমকালে চূড়ান্ত গণহত্যার ফ্যান্টাসিও লালন করছিল। ইহুদি রাষ্ট্র অস্তিত্ব লাভ করেছে কেবল ক্রিশ্চানদের আরও পূর্ণতা দান করার জন্যে। শেষ কালে ইহুদিদের নিয়তি অনন্যভাবে বিষণ্ন, কারণ ক্রাইস্টকে গ্রহণ করুক বা না করুক তারা অভিশপ্ত। আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্টরা ইহুদিদের মতো নির্যাতিত না হলেও তাদের আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল অন্ধকার ও অভিশপ্ত। আধুনিক বিশ্বের যৌক্তিক চেতনার প্রতি সাড়া হিসাবে ঐশীগ্রন্থ পাঠের নিজস্ব আক্ষরিক ও ‘বৈজ্ঞানিক’ পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল তারা। তারপরও বিশ্বাসীদের সহানুভূতির মৌল শিক্ষা চর্চায় সাহায্য করাই প্রকৃত ধর্মীয় দর্শনের পরীক্ষা হলে (বুক অভ রেভেলেশনে না হলেও গস্পেল ও সেইন্ট পলের চিঠিপত্রে এই শিক্ষা নিহিত) প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদ যেন ধর্মীয় আন্দোলন হিসাবে ঠিক স্কোপস ট্রায়ালে এর বিজ্ঞান ভ্রান্তিপূর্ণ প্রমাণিত হওয়ার মতোই ব্যর্থ হচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষেই, বাইবেলের দারুণভাবে নির্বাচিত অনুচ্ছেদের আক্ষরিক পাঠ তাদের আধুনিকতার ঈশ্বরহীন গণহত্যামূলক প্রবণতাকে আত্মস্থ করতে উৎসাহিত করেছিল।
