প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের নির্মিত এই প্রতি-সংস্কৃতিতে তাদের কলেজগুলো ছিল চারপাশের অপবিত্রের মাঝে নিরাপদ পবিত্র ছিটমহল। বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে পবিত্রতা সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছিল তারা। ফ্লোরিডায় ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রিনভিলে চূড়ান্ত আবাস পাওয়ার আগে টেনেসিতে স্থানান্তরিত বব জোনস ইউনিভার্সিটি নতুন মৌলবাদী প্রতিষ্ঠানের রীতিকে মূর্ত করে তুলেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের তরুণ ইভাঞ্জেলিস্ট বুদ্ধিজীবী ছিলেন না, কিন্তু একটি নিরাপদ স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি যা তরুণদের নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাদের বিশ্বাস রক্ষায় সাহায্য করবে; তিনি বিশ্বাস করতেন নাস্তিক্যবাদ সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আবৃত্ত করে রেখেছে।৪২ উদার শিল্পকলার পাশাপাশি ছাত্রদের ‘সাধারণ জ্ঞানের’ ক্রিশ্চান ধৰ্ম শিক্ষা দেওয়া হত। প্রত্যেক সেমিস্টারে প্রত্যেককে অন্তপক্ষে একটি বাইবেল কোর্স নিতে হত, চ্যাপেলে যোগ দিতে হত এবং পোশাক, সামাজিক মেলামেশা ও সাক্ষাতের কঠিন নিয়মসহ ‘ক্রিশ্চান’ জীবনধারা মোতাবেক চলতে হত। অমান্যকরণ ও অনুগত্যহীনতা, বব জোন্স জোরের সাথে বলেছেন, ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ এবং তা সহ্য করা হত না।৪৩ কর্মচারী ও ছাত্রদের সমানভাবে নিয়ম মেনে চলতে হত। বব জোনস ইউনিভার্সিটি নিজেই ছিল একটা ভিন্ন জগৎ: সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানের সাথে আপোস পাপ বিশ্বাস করে একাডেমিক এক্রিডিশন না নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল একে।88 এই বিসর্জন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ভর্তি, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ ও লাইব্রেরির সম্পদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম করে তুলেছিল।
এই শৃঙ্খলাটুকু জরুরি ছিল, কারণ বিজেইউ-ছাত্রদের জানা ছিল যে তারা যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। একটি সাম্প্রতিক আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ক্যাটালগ যেমন ব্যাখ্যা করেছে, এই স্কুল ‘ঐশীগ্রন্থের উপর সকল নাস্তিক্যবাদী, সংশয়বাদী ও মানবতাবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে’; সকল ‘তথাকথিত আধুনিকতাবাদী,’ ‘উদার, ’ ও ‘নিও অর্থডক্স’ অবস্থান ও ‘নব্য ইভাঞ্জেলিস্টদের অ-ঐশীগ্রন্থীয় আপোস ও ‘ক্যারিশম্যাটিকদের অ-ঐশীগ্রন্থীয় অনুশীলনের বিরুদ্ধে।৪৫ ছাত্র ও কর্মচারীরা ধর্মবিশ্বাসকে রক্ষা ও প্রতিপক্ষের উপর হামলা শানাতে জগৎ হতে প্রত্যাহৃত হয়েছে। এই ‘বিচ্ছিন্নতা’, বব জোন্সের ছেলের (দ্বিতীয় বব জোন্স) মতে ‘মৌলিক সাক্ষী ও সাবুদের একান্ত ভিত্তি।’৪৬ বিশ্বাসের এই ঘাঁটি থেকে ছাত্ররা ‘ধর্মের শত্রুদের আক্রমণ করার মাধ্যমে’৪৭ ‘বাইবেলিয় কর্তৃত্ব ও ভ্রান্তিহীনতার’ পক্ষে উগ্রভাবে লড়াই করবে। আমেরিকার একাডেমিয়ার উপর বিজেইউ-র সামান্যই প্রভাব ছিল, তবে ক্রিশ্চান জাতির উপর এর প্রভাব ব্যাপক। বব জোন্স ইউনিভার্সিটি দেশের মৌলবাদী শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় যোগানদাতায় পরিণত হয়েছে; গ্র্যাজুয়েটরা উদার শিক্ষার জন্যে না হলেও তাদের আত্মসংযমের জন্যে পরিচিত 1
এই বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত বাইবেল কলেজ ও মৌলবাদী বিশ্বাবিদ্যালয়গুলো হেরেদি ইয়েশিভার মতো বিচ্ছিন্ন দুর্গ ছিল। মৌলবাদীরা মনে করেছে তাদের ধর্ম বিশ্বাস বিপদাপন্ন; আমেরিকান জীবনধারার কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাদের, নিজেদের ‘দরজার ওপাশের’ লোক হিসাবে দেখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।৪৮ উগ্রতা গভীরতর ক্রোধ প্রকাশ করে। এই বছরগুলোয় জনসংখ্যার সবচেয়ে প্রান্তিকায়িত অংশের ভীতি, ঘৃণা ও কুসংস্কারের অনেকটাই ভাষা দেওয়া অধিকতর চরমপন্থী ক্রিশ্চানদের উচ্চারণে তা প্রকাশ পেয়েছে। ১৯২০-র দশকে বিবর্তনের শিক্ষার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে ডিফেন্ডার্স অভ ক্রিশ্চান ফেইথের সংগঠক ব্যাপ্টিস্ট জেরাল্ড উইনরড ১৯৩০-র দশকে নাৎসি জার্মানি সফর করে আমেরিকান জনগণের কাছে ‘ইহুদি ভীতি’ প্রমাণ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফিরে আসেন। একই সময়ে তিনি রুজভেল্টের ‘জুইশ নিউ ডিল’কে শয়তানীসুলভ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। কার্ল ম্যাকইন্টায়ার ও বিলি জেমস হাগরিসের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব রকম ‘উদারনৈতিক’ প্রবণতার বিরোধিতা করেন উইনরড। মৌলাবাদীরা সেক্যুলারিস্ট বা ক্রিশ্চান যে ধরনেরই হোক না কেন ‘প্ৰকৃত’ ক্রিশ্চানদের প্রান্তিক মর্যাদার কারণে উদারপন্থীদের নিন্দা করেছে। রাজনৈতিক ডানপন্থার দিকে সরে যেতে শুরু করছিল তারা। উনবিংশ শতাব্দীতে ইভাঞ্জেলিকালরা দেশপ্রেমকে বহুঈশ্বরবাদীতা মনে করেছে। এখন আমেরিকান জীবনধারার পক্ষে দাঁড়ানো পবিত্র দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্ট বিরোধী মিনিস্ট্রি ক্রিশ্চান ক্রুসেডের প্রতিষ্ঠাতা হাগরিস সোভিয়েত ইউনিয়নকে দানবীয় মনে করেছেন, তিনি তাঁর চোখে কমিউনিস্ট অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ক্লান্তিহীন লড়াই করে গেছেন: উদার সংবাদপত্র, বামপন্থী শিক্ষক এবং সুপ্রিম কোর্টসহ সকলে তাঁর চোখে আমেরিকাকে ‘লাল’-এ পরিণত করার ষড়যন্ত্রেরই অংশ ছিল। বাইবেল প্রেসবিটারিয়ান চার্চ অ্যান্ড দ্য ফেইথ থিওলজিক্যাল সেমিনারি প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রেসবিটারিয়ান চার্চ থেকে বের হয়ে আসা কার্ল ম্যাকইন্টায়ার সর্বত্র গোপন শত্রুর দেখা পেয়েছেন। খোদ মূলধারার গোষ্ঠীগুলোই আমেরিকায় ক্রিশ্চান ধর্মকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রের অংশ। ১৯৫০-র দশকে জোসেফ ম্যাককার্থির সাথে কমিউনিস্ট বিরোদী ক্রুসেডে যোগ দেন ম্যাকইন্টায়ার। টিপিক্যাল ছিলেন না এই চরমপন্থীরা, বরং প্রভাবশালী ছিলেন। ১৯৩৪ সাল নাগাদ প্রায় ৬,০০,০০০ লোক উইনরডের ডিফেন্ডার ম্যাগাজিনের গ্রাহক হয়েছিল; ১২০,০০০ জন ম্যাকইন্টায়ারের ক্রিশ্চান বীকন গ্রহণ করেছিল। রেডিও অনুষ্ঠান টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ক্রিশ্চান আওয়ারের মাধ্যমে ম্যাকইন্টায়ার আরও হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘৃণার ধর্মতত্ত্বে বিশ্বাস করে না এমন সকল ক্রিশ্চান এবং অজ্ঞদের কাছে দয়াময় ও ক্রিশ্চান মনে হতে পারে কিন্তু আসলে যারা ‘নাস্তিক্যবাদী, কমিউনিস্ট ভাবধারার, বাইবেলকে পরিহাসকারী, রক্ত-ঘৃণাকারী, মুখখিস্তিকারী, যৌন শৃঙ্খলিত সবুজ চোখ দানবের সন্তান’* সকল উদার যাজকের নিন্দা করা হয়েছে।
