১৯৫০ সালে রেব্বে পরলোক গমন করলে তাঁর মেয়েজামাই র্যাবাই মেনাচেম মেন্দেল শিয়ারসন (১৯০৪-৯৪) উত্তরাধিকারী হন। এটা ছিল এক বিস্ময়কর পরিবর্তন, সেক্যুলার বিশ্বকে পরিবর্তনের লক্ষ্যে তাকে আলিঙ্গন করার হাবাদের ইচ্ছাকেই তুলে ধরতে হবে যাকে। সপ্তম রেব্বে ইয়েশিভায় শিক্ষিত ছিলেন না, আধুনিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি। বার্লিনে ইহুদি দর্শনে ও সবোর্নে মেরিন এঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেছেন। ১৯৪১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌছানোর পর নৌবাহিনীর পক্ষে কাজ করেছেন, কিন্তু শ্বশুরের কাজেও সাহায্য করেছিলেন। এই রেব্বে আধুনিক বিশ্বের সৃষ্টি ছিলেন, সারা বিশ্বের সকল ইহুদিকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে দক্ষ প্রচারমাধ্যমের প্রচারণা চালাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। এখন কেবল ইয়েশিভা ছাত্ররাই রেব্বের সেনাদলের সৈনিক হবে না, বরং প্রতিটি হাবাদ ইহুদি এই দায়িত্ব পাবে। সযত্নে তাঁর অভিজান পরিকল্পনা করেছিলেন রেব্বে। ১৯৭০-র দশকে সেক্যুলারাইজেশন ও মিশ্রণের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক পাল্টা আক্রমণের সূচনা করেছিলেন তিনি। দূরবর্তী শহরে বসতি স্থাপন করার জন্যে হাজার হাজার তরুণ- তরুণীকে লুবাভিচে পাঠানো হবে যেখানে ইহুদিরা হয় সম্পূর্ণ সেক্যুলারাইজড হয়ে গেছে বা সংখ্যালঘু হিসাবে বাস করছে। এই বাড়িটি হবে ইহুদিবাদের বিভিন্ন তথ্যের যোগান দেওয়া একটি ‘ড্রপ-ইন’ সেন্টার যা সাব্বাথের আয়োজন করবে ও উৎসবের অনুষ্ঠান করবে, লেকচার ও ক্লাস নেবে। অন্য তরুণ হাসিদিমদের পাঠানো হবে আমেরিকার ক্যাম্পাস ও রাস্তায়, যেখানে তারা পথে দেখা পাওয়া ইহুদিদের সাথে পরিচিত হয়ে তেফেলিন পরা বা প্রার্থনা বাণী উচ্চারণ করার মতো যেকোনও একটি নির্দেশনা প্রকাশ্যে পালনে সম্মত করাবে। এই আচার প্রত্যেক ইহুদির হৃদয়ে প্রোথিত স্বর্গীয় ‘স্ফুলিঙ্গ’ স্পর্শ করে তার আবিশ্যিক পবিত্রতাকে জাগিয়ে তুলবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।৩৮
রেব্বে এই জগতেই স্বস্তি বোধ করেছেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হাবাদ হাসিদিমের প্রাচীন জ্ঞানের সাথে সহাবস্থান করে। মেরিন বায়োলজিতে তাঁর শিক্ষা স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গের দর্শন থেকে তাঁকে বিচ্যুত করেনি; তিনি এক শক্তিশালী মেসিয়ানিজম গড়ে তুলবেন এবং ষষ্ঠ রেব্বের সাথে ঐশ্বরিক সম্পর্ক থাকার দাবি করে হাবাদের নেতৃত্বে নির্বাচিত হবেন। তাঁর আধ্যাত্মিকতায় লোগোস ও মিথোস অন্তর্দৃষ্টির সম্পূরক উৎস। তিনি বাইবেলকে যেকোনও প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীর মতোই আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন, বিশ্বাস করতেন ঠিক ছয় হাজার বছর আগে ঈশ্বর মাত্র ছয় দিনে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আবার এও বিশ্বাস করতেন যে, দেহ ও মনের সম্পর্ক বা বস্তু ও শক্তির ভেতরকার সম্পর্ক নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারসমূহ মানবজাতিকে বাস্তবতার জৈবিক ঐক্যের এক নতুন উপলব্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত একেশ্বরবাদের প্রতি উন্মুখ করে তুলবে।৩৯ তাঁর ব্যাপক প্রচারণা আধুনিক ভাবধারায় পরিকল্পিত ছিল। কীভাবে নিজের সম্পদকে ব্যবহার করতে হবে এবং সেক্যুলারাইজড নারী-পুরুষের সাথে কথা বলতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। তবে মনে হয় হাবাদের পুরাণ ও অতীন্দ্রিয়বাদ লুবাভিচকে আত্মরক্ষামূলকভাবে পিছু না হটে জগতের দিকে অগ্রসর হওয়ার আত্মবিশ্বাসের যোগান দিয়েছিল। সাম্প্রতিক রেব্বেরা আলোকনের চেতনা থেকে পিছু হটে গিয়েছিলেন, কিন্তু প্রথম রেব্বে ও হাবাদের প্রতিষ্ঠাতা তাঁর হাসিদিমকে তাঁদের কালের পৃথিবী সম্পর্কে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চায় সাহায্য করেছেন। অতীন্দ্রিয়বাদী প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ঠিক খোদ যালমানের মতোই সপ্তম রেব্বে যেন এই আদি চেতনায় ফিরে গিয়েছিলেন। হাবাদ পবিত্র ও অপবিত্রের আধুনিক বিচ্ছিন্নতা গ্রহণে অস্বীকার গেছে। যত জাগতিক ও তুচ্ছই হোক না কেন, সব কিছুই স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গ ধারণ করে। ‘সেক্যুলার ইহুদি’ বলে কেউ নেই, এমনকি গোয়িমেরও সম্ভাব্য পবিত্রতা রয়েছে। জীবনের শেষ দিকে অন্তিম কাল আসন্ন বিশ্বাস করে রেব্বে আমেরিকার জেন্টাইলদের উদ্দেশে প্রচারাভিযানে নেমেছিলেন, তিনি স্বীকার করেছিলেন ইহুদিদের প্রতি ভালো ছিল তারা। লুবাভিচ আধুনিক কালে দারুণ ভুগেছে, কিন্তু রেবে তাদের গালুতকে সম্পূর্ণ দানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, প্রতিশোধ ঘৃণার ফ্যান্টাসি লালন না করে বিশ্বকে এমন একটি স্থান হিসাবে কল্পনা করতে বলেছেন যেখানে ঐশী সত্তাকে নতুন করে সূচিত করতে পারবে তারা। ৪০
*
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা শেষ পর্যন্ত তাদের পরাস্তকারী আধুনিকতার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের সূচনা করবে, কিন্তু বর্তমান আলোচিত কালে তারা হেরেদি ইহুদিদের মতো নিজস্ব আত্মরক্ষামূলক প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তুলছিল। স্কোপস ট্রায়ালের পর প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীরা সাধারণ বলয় থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়ে নিজস্ব গির্জা ও কলেজে আশ্রয় নিয়েছিল। উদার ক্রিশ্চানরা ধরেই নিয়েছিল যে, মৌলবাদী সংকটের অবসান ঘটেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ মৌলবাদী দলগুলোকে যেন তাৎপর্যহীন প্রান্তিক গোষ্ঠী মনে হচ্ছিল। মূলধারার গোষ্ঠীগুলোই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বাসীদের আকর্ষণ করছিল। কিন্তু অদৃশ্য হওয়ার বদলে মৌলবাদীরা স্থানীয় পর্যায়ে শেকড় বিস্তার করছিল। মূল- ধারার গোষ্ঠীতে তখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৌলবাদী রয়ে গিয়েছিল; উদারপন্থীদের বহিষ্কারের সকল আশা হারিয়ে বসলেও ‘মৌলবিষয়ে’ বিশ্বাসকে বিসর্জন দেয়নি তারা, সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। অতি-রেডিক্যাল, বিশেষ করে তুরীয় আনন্দের জন্যে অপেক্ষা করার সময়টুকুতে নিজেদের ঈশ্বরবিহীন উদারপন্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা পবিত্র দায়িত্ব বলে বিশ্বাসকারী প্রিমিলেনিয়ানরা নিজস্ব চার্চ গঠন করে। এক নতুন প্রজন্মের ইভাঞ্জেলিস্টদের পরিকল্পনায় নতুন সংস্থা ও নেটওয়ার্ক গঠন করতে শুরু করেছিল তারা। ১৯৩০ সাল নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্ততপক্ষে পঞ্চাশটি মৌলবাদী বাইবেল কলেজ ছিল। মহামন্দার বছরগুলোতে আরও ছত্রিশটি কলেজ স্থাপন করা হয়। ইলিনয়ের মৌলবাদী হুইটন কলেজ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বিকাশ লাভকারী উদারপন্থী আর্ট কলেজ। মৌলবাদীরাও তাদের নিজস্ব প্রকাশনা ও প্রচারণা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। ১৯৫০-র দশকে টেলিভিশনের আগমন ঘটলে তরুণ গ্রাহাম, রেক্স হামবার্দ ও ওরাল রোবার্টস পুরোনো ভবঘুরে যাজকদের স্থান দখল করে ‘টেলিভেঞ্জালিস্ট’ হিসাবে মিনিস্ট্রি চালু করেন ১ এক বিশাল আপাত অদৃশ্য প্রচারণা নেটওয়ার্ক সারা দেশের মৌলবাদীদের সংযুক্ত করেছিল। নিজেদের তারা বহিরাগত ভেবেছে, কিন্তু তাদের নতুন কলেজ ও টেলিভিশন কেন্দ্রগুলো বৈরী বিশ্বে তাদের আবাসের ব্যবস্থা করেছিল।
