একইভাবে ইয়েশিভোতে ইহুদিরা সেক্যুলার কলেজের ছাত্রদের মতো পরে বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগ করার মতো তথ্যের জন্যে তোরাহ পাঠ করছিল না। তোরাহর বহু আইন, যেমন মন্দিরের আচার বা পশুবলী সম্পর্কিত বিধিবিধানসমূহ বাস্ত বায়নযোগ্য ছিল না; টর্টস ও ক্ষয়ক্ষতির বিধান মেসায়াহ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পর হয়তো পুনর্বহাল করা যাবে। তারপরেও ছাত্ররা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি বছর পর্যন্ত তাদের শিক্ষকদের সাথে আপাত অচল হয়ে যাওয়া বিধিবিধান পাঠে কাটিয়ে দিয়েছে, কারণ এগুলো ঈশ্বরের আইন। ঈশ্বর-কোনওভাবে-সিনাই পাহাড়ের চূড়ায় মোজেসকে আইন প্রদানের সময়ে যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন সেই হিব্রু শব্দের পুনরাবৃত্তি ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের একটা উপায়। আইনের প্রতিটি বিষয় অনুসন্ধান ছাত্রকে প্রতীকীভাবে ঈশ্বরের মনে প্রবেশে সক্ষম করে তোলে। ভীতিকরভাবে স্বর্গীয় আইন ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া একটা সময়ে ইহুদিরা আগের চেয়ে বেশি করে যথার্থভাবে এর পরিপালন করবে। নিজেকে অতীতের মহান র্যাবাইদের আইনি মতামতের সাথে পরিচিত করে তোলা ছাত্রের পক্ষে ঐতিহ্যকে মনে-প্রাণে আপন করে নেওয়ার ও সাধুদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের একটা উপায়। ইয়েশিভোতে পাঠ পদ্ধতি উপকরণের মতোই জটিল ছিল। ইয়েশিভা শিক্ষার উদ্দেশ্য এই বিশ্বের বিরাট কোনও সুবিধা লাভ নয়, বরং ঈশ্বরকে ত্যাগের প্রয়াসী এক বিশ্বে স্বর্গীয় সত্তার অনুসন্ধান। ইয়েশিভা জগতের সব কিছুই বস্তুজগতের থেকে আলাদা। মূলধারার সমাজে পুরুষ (১৯৫০-র দশকে তখনও প্রধান লিঙ্গ বিবেচিত) ব্যবসার কাজে ঘরের বাইরে যায়, আর নারী ঘরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। হেরেদিমদের মধ্যে নিম্নতর লিঙ্গই গোয়িমরা যাকে ‘প্রকৃত’ জাগতিক বিষয় বলে থাকে সেখানে অংশ নেয় (আভাসে এর গৌণ মর্যাদা ঘোষণা করে), অন্যদিকে পুরুষরা ইয়েশিভায় প্রকৃত বাস্তবতার সাথে সীমাবদ্ধ সুরক্ষিত জীবন যাপন করে। সেক্যুলার ইসরায়েলে সেনাবাহিনী প্রায় পবিত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছিল, উভয় লিঙ্গের পক্ষেই জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক ছিল, একজন পুরুষ কর্মময় জীবনের গোটা সময় তার সেনা ইউনিটের অধীনে থাকবে। অবশ্য একজন ইয়েশিভা ছাত্র সামরিক চাকরি থেকে অব্যহতি লাভ করে, ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)-এর প্রতি পিঠ ফিরিয়ে নিজেকে ইসরায়েলি জাতির প্রকৃত ‘অভিভাবক’ ঘোষণা করে এবং চারপাশ থেকে ইয়েশিভার উপর আগ্রাসীভাবে এগিয়ে আসা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম কাতারে অবস্থান করার কথা ঘোষণা করে।৩৪
হেরেদিমের কাছে আধুনিকতা—এমনকি ইসরায়েলে রাষ্ট্রেও-স্রেফ নির্বাসন, বিচ্ছিন্নতা ও ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরত্ব গালুতের সর্বশেষ অবস্থা। হলোকাস্ট এর আবিশ্যিক বৈরিতা তুলে ধরেছিল। এমন এক জগতে একজন ইহুদির স্বস্তি বোধ করার কথা নয়, যদিও বিপরীত দিক থেকে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুজায়গাতেই তোরাহ শিক্ষা উদারভাবে অর্থসংস্থান এবং আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি বিকাশ লাভ করছিল। ছাত্রদের অবশ্য সেক্যুলার বিশ্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছিল। একজন হেরেদি শিক্ষক যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ইয়েশিভা কেবল তরুণদের ‘তোরাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যেরই শিক্ষা’ দেয়নি, বরং ‘এই বিশ্ব থেকে দূরত্ব বজায় রাখার পদ্ধতির শিক্ষা দিয়েছে। ইয়েশিভার প্রাচীরগুলো তোরাহ যে কোনওদিনই গালুতে স্বস্তি বোধ করতে পারে না তারই স্মারক। ছাত্রদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্নতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রতি-সংস্কৃতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এডুকেশন ইন দ্য ফেস অভ দ্য জেনারেশেন-এ (১৯৫৪) আভ্রাহাম উল্ফ যেমন উল্লেখ করেছেন, সেক্যুলারিস্টদের নিস্পৃহতা সত্ত্বেও ইয়েশিভা ইহুদি বাপ-দাদার জগৎকে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্বে নিবেদিত। ‘একাজে আমরা একা। আমরা আমাদের চারপাশের সবার চেয়ে ভিন্ন। সংস্কার ইতিহাসবিদগণ…কবি [অন্যরা তাদের মহান ব্যক্তি মনে করে]।’ এমনকি ইহুদি রাষ্ট্রেও হেরেদিম বিচ্ছিন্ন। ‘পথঘাটের নাম রাখা হয়েছে ঐতিহসিক চরিত্রের নামে, আমরা যাদের একেবারেই নেতিবাচক আলোয় দেখি। আমরা একা।৩৬
যৌক্তিক আধুনিকতার বিরুদ্ধে হেরেদি বিদ্রোহ ব্যাপকভাবে পিছু হটায় সৃষ্ট। কিন্তু এই সময়ে রাশিয়ায় হাবাদ ইয়েশিভায় দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গী মানসিকতাকে লালনকারী লুবাভিচ হাসিদিম আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বলশেভিকরা কার্যত রাশিয়ায় হাবাদকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। ইহুদি স্কুল ও ইয়েশিভাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তোরাহ পাঠকে প্রতিবিপ্লবী হিসাবে নিন্দা জানানো হয়েছে, উপেক্ষা করার মানে ছিল উপবাস, কারাবাস বা মৃত্যুদণ্ড। ষষ্ঠ রেব্বে (জোসেফ ইসাক শিয়ারসন, ১৮৮০-১৯৫০) এইসব ব্যবস্থাকে কেবল ‘মেসায়াহর জন্ম বেদনা’ হিসাবেই দেখেছিলেন। ধার্মিকের এই জগৎ থেকে প্রত্যাহারই যথেষ্ট নয়; হাসিদিমকে অবশ্যই ঈশ্বরের জন্যে এই আধুনিক বিশ্বকে অধিকার করে নিতে হবে। রাশিয়ায় রেব্বে একটি ইহুদি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন, এখানে হাবাদ ইয়েশিভার স্নাতকদের তোরাহ ও তালমুদের ক্লাস করানো হত। তরুণ ইহুদিদের সারা বিশ্বের লুবাভিচদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে নতুন যোগাযোগ কৌশল শিক্ষা দেওয়া হত। হিটলারের কাছ থেকে পালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসতে বাধ্য হওয়ার পর রেব্বে মিশন অব্যাহত রাখেন ও নতুন বিশ্বে মিশে যাওয়া বা নিজেদের উন্মুল মনে করা ইহুদিদের ফিরিয়ে আনার অভিযানে নামেন। প্রত্যাহারের বদলে এটা ছিল হাত বাড়ানো। ১৯৪৯ সালে রেব্বে কফার ইসরায়েলে প্রথম হাসিদিক বসতি হাবাদ প্রতিষ্ঠার এক দর্শনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যায়নবাদের প্রতি বৈরিতা একবিন্দুও কমাননি তিনি, বরং বিশ্বাস করেছিলেন যে শেষের এই কালে তাঁর কর্মকাণ্ডকে অবশ্যই ইসরায়েলের অপবিত্র ভূমির ইহুদিদের কাছে পৌঁছাতে হবে।৩৭
