হলোকাস্টের ধ্বংস তোরাহ পাঠের ধরনকেই পাল্টে দিয়েছিল। ঘেটো বিশ্বে প্রচলিত বহু আচার ও রেওয়াজ ‘নির্দিষ্ট’ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল; জীবন যাপনের বা তোরাহ পালনের অন্য কোনও বিকল্প পথ ছিল না। প্রথম প্রজন্মের শরণার্থীদের তখনও এইসব আচার পালন করার জ্ঞান ছিল, কিন্তু নিহত পূর্বপুরুষের হারানো বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তুলতে উদগ্রীব তাদের সন্তানসন্ততি ও প্রপৌত্ররা আর সহজাতভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনওই লিখিত রূপে রাখার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি এমন সাম্প্রদায়িক পরিপালন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না। অপসৃয়মান তোরাহ উদ্ধার করার একমাত্র উপায় ছিল বিচ্ছিন্ন তথ্যের জন্যে টেক্সটে অনুসন্ধান চালানো। ১৯৫০-র দশক থেকে ইয়েশিভাগুলো হলোকাস্ট পূর্ববর্তী ইউরোপে স্বাভাবিক ও প্রচলিত ধারা হিসাবে প্রতীয়মান বিভিন্ন অনুপুঙ্ক্ষ ও জটিল বিস্তারিত প্রক্রিয়ার বিজ্ঞ পাণ্ডুলিপিতে ভরে গিয়েছিল। প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্ম তাদের পূর্বসুরিদের চেয়ে আরও বেশি হারে এইসব পাণ্ডিত্যের উপর নির্ভর করবে।২৭ বিনাশের ফলে ইহুদি জীবন আরও টেক্সটমুখী ও আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি করে লিখিত শব্দের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল।
মৌলবাদী ইহুদিবাদে এক নতুন কঠোরতা দেখা দিয়েছিল। ১৯৬০-র দশক নাগাদ সেই সময়ের অতিথি বনেই ব্রাক র্যাবাই সিমলা এলবার্গ উল্লেখ করেছেন যে, ‘গোটা ধর্মীয় জীবনের সম্পূর্ণ সীমানা জুড়ে নিবিড় বিপ্লব’ ঘটছে। ‘তোরাহ নগরীর’ ইহুদিরা আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেক নিষ্ঠার সাথে নির্দেশনা মেনে চলছে।২৮ পূর্ববর্তী যুগের চেয়ে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে আইন পালনের এই প্রয়াস বীরত্বসূচক: এটা নিষ্ঠুরভাবে ঈশ্বর শূন্য করে তোলা এক বিশ্বে ঈশ্বরকে মূর্ত করে তোলার এক ধরনের উপায়। বৃনেই ব্রাকের হেরেদিমরা খাদ্য ও পবিত্রতার বিষয়গুলোর মতো বিষয়ে আরও নিষ্ঠ ও সঠিক হওয়ার উপায় বের করার প্রয়াস পাচ্ছিল, যদিও তা তাদের জীবনকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
১৯৩০-র দশকে হাযন ইশ এই সুর স্থির করে দিয়েছিলেন, তখন প্রথম বারের মতো প্যালেস্তাইনে পৌঁছেছিলেন তিনি। ধার্মিক যায়নবাদীদের একটা দল জিজ্ঞাসা নিয়ে এসেছিল তাঁর কাছে। বসতিতে ইহুদি কৃষি বিধান মেনে চলতে ইচ্ছুক ছিল তারা, তোরাহ মোতাবেক পবিত্র ভূমিতে খামার স্থাপন করতে চেয়েছে। তার মানে কি আইনে যেমন বিধান দেওয়া হয়েছে, প্রতি সাত বছরে একবার জমিন পতিত রাখতে হবে তাদের?২৯ এই ‘সাব্বাতিয় বছর’ পালন নিশ্চিতভাবেই দারুণ দুর্ভোগের জন্ম দেবে, এবং তা দক্ষতা সর্বোচ্চ করাই যার লক্ষ্য সেই আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান বিরোধী। বসতিস্থাপনকারীদের জন্যে একটা ফাঁক খুঁজে বের করেছিলেন র্যাবাই কুক, কিন্তু হাযন ইশ কঠোরভাবে এই ধরনের শৈথিল্যের (কুলা) বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, কষ্টের ভেতরই রয়েছে চ্যালেঞ্জ। আইনের দাবি, কৃষকরা আরও ভালো কিছুর জন্যে তাদের সমৃদ্ধিকে বিসর্জন দেবে। সাব্বাতিয় বছর নির্ধারণ করা হয়েছে ভূমির পবিত্রতা উদযাপন, ইহুদিদের এর অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে সজাগ করে তোলার জন্যে এবং সকল পবিত্র বস্তুর মতো এটাও আবিশ্যিকভাবে ব্যক্তির প্রয়োজন ও ইচ্ছা থেকে বিচ্ছিন্ন। ইহুদিদের নিজস্ব লাভের জন্যে ভূমিকে ব্যবহার করা যাবে না, বর্ধিত উৎপাদনশীলতার জন্যে দোহন করা যাবে না বা ব্যয়সংকুলান মূলক ব্যবস্থার অধীন করা যাবে না। সত্যিকারের ধার্মিক কৃষকদের উচিত হবে সেক্যুলার অগ্রগামীদের যৌক্তিক মূলধারাকে চ্যালেঞ্জ করা, এরা যায়নবাদী’ হতে পারে, কিন্তু তা মোটেই ‘ইহুদিসুলভ’ নয়।
নেই ব্রাকে হাযন ইশ-র্যাবাই এলবার্গ যাকে ‘হুমরোতের বিশ্ব (‘কট্টরপন্থী’)’ বলে আখ্যায়িত করেছেন-এর নেতৃত্ব দান করছিলেন। শিষ্যদের নির্দেশনা পালনের জন্যে ‘সবচেয়ে সীমিতকারী, কঠোর ও যথার্থ’ উপায় বের করার শিক্ষা দিয়েছেন তিনি।৩১ এই অনুশীলন তাদের আধুনিকতার বাস্তববাদী রীতিনীতি থেকে সর্বাত্মকভাবে বিচ্ছিন্ন করবে। এই ধরনের কঠোরতা ইউরোপের প্রথাগত ইহুদি সম্প্রদায়ের রাব্বিনিক প্রতিষ্ঠানের ভ্রূকুটির শিকার হয়েছে। র্যাবাইগণ আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে ভাবিত বিবেকবান লোকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্ত সামগ্রিকভাবে গোটা সম্প্রদায়ের উপর এই কঠোরতা (হুমরা) চাপিয়ে দিতে সম্মত ছিলেন না, কারণ তাতে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারত। পশু জবাই করার কঠোর মান অনুসরণকারী সম্প্রদায় থেকে আগত ইহুদিরা আরও শিথিলভাবে আইনের ব্যাখ্যাকারী ইহুদিদের সাথে একসাথে মাংস খেতে পারবে না। বাড়াবাড়ি ধরনের কঠোরতা এইসব বিষয়ে ততখানি কঠোর ছিলেন না অতীতের এমন সাধুদেরও বিরাট অসম্মান হবে। র্যাবাইগণ তোরাহর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রবণ ছিলেন: আধ্যাত্মিক অভিজাত একটি গোষ্ঠীকে সাধারণ ইহুদিদের পক্ষে অনুসরণ অসম্ভব করে তুলতে দেওয়া যাবে না।
বৃনেই ব্রাকের বিপ্লবী কঠোরতা ছিল হেরেদিমের নতুন প্রতি-সংস্কৃতির সৃষ্টির প্রয়াসের অংশ। এটা দক্ষতা ও বাস্তবাদীতাকে মূল মানদণ্ডে পরিণতকারী আধুনিকতার যৌক্তিক চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত এক ধর্মীয় মানদণ্ড স্থাপন করেছিল। সংস্কার, রক্ষণশীল ও নিও-অর্থডক্স ইহুদিরা আইনের কোনও একটা অংশ বিসর্জন দিচ্ছে বা আরও শিথিল ও যৌক্তিক জীবনের সন্ধান করছে, এমন একটা সময়ে হেরেদিমদের অধিকতর কঠোর পরিপালন মূলধারার সমাজের রেওয়াজের সাথে আপোসে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। নেই ব্রাক সফরের সময় র্যাবাই এলবার্গ লক্ষ করেছিলেন যে, এটা ‘নিজেই এক বিশ্বে’ পরিণত হয়েছে;৩৩ হেরিদি ইহুদিরা আধুনিক সমাজ থেকে কেবল প্রত্যাহৃতই হচ্ছে না, বরং অন্য কম নিয়মনিষ্ঠ ইাহুদিদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ওদের ভিন্ন কসাইয়ের প্রয়োজন হচ্ছিল, কোশার খাবার সম্পর্কে গোঁড়া দোকান ও নিজস্ব আচরিক স্নানের প্রয়োজন হচ্ছিল। সময়ের মেজাজের বিপরীতে ভিন্ন পরিচয় গড়ে তুলছিল তারা।
