লুরিয়া’র মিথে এক স্বেচ্ছানির্বাসনের ভেতর দিয়ে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটছে। ঈশ্বর সর্বব্যাপী হলে কীভাবে বিশ্ব অস্তিত্বমান থাকতে পারে, এই জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে এর শুরু। জবাব হচ্ছে যিমযুম (‘প্রত্যাহার’)-এর মতবাদ: অসীম ও দুর্ভেয় গডহেড, কাব্বালিস্টরা যাকে বলে এন সফ (‘অন্তহীন’), বিশ্বকে স্থান করে দিতে, যেমন বলা হয়েছে, নিজের মাঝে একটা এলাকা উন্মুক্ত করার জন্যে নিজের মাঝে নিজেই সঙ্কুচিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। সুতরাং, সৃষ্টির সূচনা ঘটেছিল ঐশী একটা ঘটনার ভেতর দিয়েঃ সৃষ্টির ভেতর ও তাদের সাহায্যে নিজেকে প্রকাশ করার আবেগময় ইচ্ছা থেকে এন সফ নিজেরই একটা অংশের উপর নির্বাসন চাপিয়ে দিয়েছিলেন। জেনেসিসের প্রথম অধ্যায়ে বর্ণিত শৃঙ্খলাপূর্ণ, শান্তিময় সৃষ্টির বদলে এটা ছিল আদিম বিস্ফোরণ, বিপর্যয় ও মিথ্যা সূচনা, সেফারদিক নির্বাসিতদের কাছে যাকে তাদের যাপিত বিশ্বের অনেক বেশি সঠিক মূল্যায়ন মনে হয়েছে। লুরিয় প্রক্রিয়ার গোড়ার দিকের পর্যায়ে এন সফ যিমযুমের মাধ্যমে সৃষ্ট শূন্যতাকে ঐশী আলো দিয়ে পূরণ করার প্রয়াস পেয়েছিলেন, কিন্তু আলো বয়ে নিয়ে যাবার কথা ছিল যেসব ‘পাত্র’ বা ‘নল’-এর, চাপে সেগুলো ভেঙে যায়। ঐশী আলোর স্ফুলিঙ্গসমূহ ঈশ্বর নয়, এমন সব বস্তুর মহাগহ্বরে পতিত হয়। ‘পাত্রের ভাঙনের’ পর স্ফুলিঙ্গের কিছু অংশ গডহেডের কাছে ফিরে যায়, কিন্তু অবশিষ্টগুলো অশুভ সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ ঈশ্বরহীন বলয়ে বন্দি হয়ে থাকে, এন সফ যাকে যিমযুম প্রক্রিয়ার সময় নিজের ভেতর থেকে দূর করে দিয়েছিলেন। এই বিপর্যয়ের পর সৃষ্টিকর্ম অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে, সবকিছু উল্টাপাল্টা জায়গায় পড়ে যায়। আদমকে সৃষ্টি করার সময় তিনি এই পরিস্থিতি শুধরে নিতে পারতেন, তাহলে প্রথম সাব্বাতেই ঐশী নির্বাসনের অবসান ঘটতে পারত। কিন্তু আদম পাপ করলেন, তারপর থেকেই ঐশী স্ফুলিঙ্গসমূহ বস্তুগত বিষয়ে বন্দি হয়ে পড়ে; আর পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্যে আমরা যে সত্তার সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পারি, সেই শেকিনাহ গডহেডের সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এক চিরস্থায়ী নির্বাসনে জগত্ময় ঘুরে বেড়াতে থাকেন।
এটা কল্পগল্প, কিন্তু সেফেদের কাব্বালিস্টদের যদি জিজ্ঞেস করা হত যে আদৌ ব্যাপারটা এভাবেই ঘটেছিল বলে তারা বিশ্বাস করে কিনা, প্রশ্নটিকেই অপর্যাপ্ত মনে করত তারা। মিথের বর্ণিত আদিম ঘটনাটি সুদূর অতীতে কোনও এক সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনামাত্র নয়। অমন একটা ঘটনা বর্ণনা করার মতো কোনও ধারণা বা শব্দ আমাদের জানা নেই, কারণ আমাদের যৌক্তিক সমাজ সময়কে কঠোরভাবে পর্যায়ক্রমিক হিসাবে দেখে। প্রাচীন গ্রিসের এলিউসিসের উপাসকদের যদি জিজ্ঞেস করা হত যে, প্লেটো সত্যিই পারসেফোনকে পাতালে নিয়ে বন্দি করে রাখায় তাঁর মা দিমিতার মেয়ের শোকে দিদ্বিদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন কিনা, তাহলে এমনি ধারার প্রশ্নে তারা সম্ভবত বিস্মিত হয়ে যেত। তারা কেমন করে নিশ্চিত হবে যে পারসেফোনের মিথে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সেভাবে পৃথিবীতে ফিরে গিয়েছিলেন কিনা? কারণ এই মিথোসের তুলে ধরা জীবনের মৌলিক ছন্দ আসলে ঘটছিল। জমিনের ফসল তোলা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পাত্রে রাখা হয়েছে ভূট্টার ভীজ ঠিক সময়ে বপন করা হয়েছে এবং শেষে শস্য বেড়ে উঠেছে।১২ মিথোস ও ফসল তোলার ঘটনা, উভয়ই বিশ্ব সম্পর্কে মৌল এবং বিশ্বজনীন একটা কিছুর দিকে ইঙ্গিত দেয়, অনেকটা ইংরেজি শব্দ ‘নৌকা’ আর ফরাসি শব্দ ‘বাতেউর মতো; দুটোই এমন এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে যা উভয় পরিভাষার অতীত ও স্বাধীন। সেফারদিক ইহুদিরা সম্ভবত একই ধরনের জবাব দিত। নির্বাসন ছিল অস্তিত্বের মৌল বিধি। আপনি যেদিকে তাকাতেন, ইহুদিরা ছিল উন্মূল বিদেশি। এমনকি জেন্টাইলরাও ক্ষতি, হতাশা ও জগতে তারা ঠিক অভ্যস্ত নয়, এমন এক ধরনের অভিজ্ঞতার লাভ করেছে-প্রথম মানুষ জাতির আদিম স্বর্গ হতে নির্বাসিত হওয়ার বিশ্বজনীন মিথে যেমন প্রত্যক্ষ করা গেছে। লুরিয়ার জটিল সৃষ্টি কাহিনী এটা তুলে ধরেছে ও সম্পূর্ণ নতুনভাবে একে স্পষ্ট করে তুলেছে। শেকিনাহর নির্বাসন ও স্থানচ্যুত মানুষ হিসাবে তাদের নিজস্ব জীবন ভিন্ন দুটি বাস্তবতা ছিল না, বরং ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। যিমযুম দেখিয়েছে যে সত্তার একেবারে ভিত্তি মূলেই নির্বাসন খোদাই হয়ে আছে।
লুরিয়া লেখক ছিলেন না, জীবদ্দশায় খুব সামান্য সংখ্যক লোকের কাছেই তাঁর শিক্ষা অবহিত ছিল।[১৩] কিন্তু শিষ্যরা উত্তরপুরুষের জন্যে তাঁর রচনাবলী রক্ষা করেছেন ও অন্যরা তা ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ১৬৫০ সাল নাগাদ লুরিয় কাব্বালাহ এক গণআন্দোলনে পরিণত হয়; সেই সময় এটাই ছিল ইহুদিদের মাঝে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা লাভকারী একমাত্র আদর্শিক ব্যবস্থা।” যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে একে প্রমাণ করা সম্ভব ছিল বলে এমনটা ঘটেনি, কেননা নিশ্চিতভাবেই সেটা সম্ভব ছিল না। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই জেনেসিসের সাথে এর বিরোধ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু আমরা যেমন দেখব, ঐশীগ্রন্থের আক্ষরিক পাঠ একটা আধুনিক ধারণা, পৌরাণিক সচেতনতার উপর যৌক্তিক মনের জয়লাভের ফলেই এর বিকাশ ঘটেছে। আধুনিক কালের আগের ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমরা সবাই তাদের পবিত্র টেক্সটের দারুণ রকম রূপক, প্রতীকী ও নিগূঢ় ব্যাখ্যার রসআস্বাদন করত। ঈশ্বরের বাণী অসীম হওয়ায় তার নানা রকম অর্থ নিয়ে উপস্থিত হওয়ার ক্ষমতা ছিল। সুতরাং, বাইবেলের সরলার্থ হতে লুরিয়ার সরে যাওয়া দেখে ইহুদিরা বিচলিত বোধ করেনি, যেমনটা অনেক আধুনিক ব্যক্তি করবে। তাঁর মিথ কর্তৃত্বের সাথে তাদের প্রতি সাড়া দিয়েছে, কারণ এটা তাদের জীবনকে ব্যাখ্যা করেছে, অর্থের যোগান দিয়েছে তাদের। অস্তিত্ব লাভ করতে চলা আধুনিক জগৎ হতে উৎখাত হয়ে ইহুদিদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অস্তিত্বের মৌল বিধানের সাথে মানানসই। এমনকি খোদ ঈশ্বর নির্বাসনে কষ্ট পেয়েছেন, একেবারে সূচনা থেকেই সৃষ্টির সমস্ত কিছুই স্থানচ্যুত হয়েছিল, ঐশী স্ফুলিঙ্গ বস্তুতে বন্দি হয়েছে আর জীবনের এক সর্বব্যাপী সত্যি অশুভের সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে শুভ। এছাড়া, ইহুদিরা প্রত্যাখ্যাত ও অস্পৃশ্য ছিল না, বরং নিস্তার প্রক্রিয়ায় তারাই কেন্দ্রিয় ভূমিকা পালনকারী। মোজেসের বিধান তোরাহর বিভিন্ন নির্দেশনার সযত্ন পালন ও সেফেদে বিকশিত বিভিন্ন আচার সম্পাদন এই বিশ্বজনীন নির্বাসনের অবসান ঘটাতে পারে। ইহুদিরা এভাবে গডহেডের সাথে শেকিনাহর ‘পুনঃস্থাপন’ (তিক্কুন), ইহুদি জাতিকে প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া ও বিশ্বের বাকি অংশকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় স্থাপন করার কাজে সাহায্য করতে পারে।[১৫]
