যায়নবাদ বিরোধী এই হেরেদিমরা ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুর অংশ। ইসরায়েলের এদের সংখ্যা মাত্র দশ হাজার, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আরও হাজার দশেক; তবে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে তাদের।২২ বেশিরভাগ আল্ট্রা-অর্থডক্সরা যায়নবাদ বিরোধী হওয়ার চেয়ে বরং যায়নবাদ নিরপেক্ষ হলেও নেচারেই কারতা ও সাতমার হেরেদিমের মতো অন্য রেডিক্যালরা রাষ্ট্রের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করার বিপদে থেকে তাদের মোকাবিলা করে। ইসরায়েল রাষ্ট্র থেকে তাদের সুদৃঢ় প্রত্যাহার প্রায়শঃই ইহুদি রাষ্ট্রে অখণ্ডতা ও নিখাঁদতার অভাব বোধকারী অধিকতর কম উৎসাহী হেরেদিমদের মনে করিয়ে দেয় যে, পার্থিব অর্থে ইসরায়েল যত শক্তিশালী ও সফল হয়ে উঠুক না কেন ইহুদিরা এখনও অস্তিত্বগত নির্বাসনে রয়ে গেছে, আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অংশ নিতে পারবে না তারা।
ইসরায়েলকে শয়তানি সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছু মানতে হেরেদিদের এই অস্বীকৃতি তাদের অনেকেরই বাসস্থান এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিদ্রোহেরই শামিল ছিল। তারা সাব্বাথে গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোঁড়া বা সাঁতারের পোশাকের বিজ্ঞাপনে স্বল্পবসনা নারীর ছবি ছেঁড়ার সময় তারা ইহুদি রাষ্ট্রের সেক্যুলার রীতিনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যেখানে কর্মতৎপরতার একমাত্র মাপকাঠি এর যৌক্তিক, বাস্তব উপযোগিতা। তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বসের সব কটিতেই মৌলবাদীরা আধ্যাত্মিকতাকে বর্জন করে আধুনিক সমাজে প্রাধ্যান্য বিস্তারকারী পবিত্রের আরোপিত সীমা অগ্রাহ্যকারী বাস্তবভিত্তিক লোগোসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে থাকে। কিন্তু সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত শক্তিশালী বলে অধিকাংশকেই তাদের বিদ্রোহকে ছোট প্রতীকী কর্মকাণ্ডে সীমিত রাখতে হয়। তাদের দুর্বলতার বোধ ও উদাহরণ স্বরূপ, যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের উপর নির্ভরতার নীরব স্বীকৃতি কেবল মৌলবাদীদের ক্রোধই বাড়িয়ে তুলতে পারে। হেরেদিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশাল অংশ প্রতি পদক্ষেপেই তাদের মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করে চলা সেক্যুলার রাষ্ট্র থেকে দৃঢ় পশ্চাদপসরণ ও প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তোলার ভেতর তাদের প্রতিবাদ সীমিত রেখেছে।
হেরেদিমদের বিকল্প সমাজ আধুনিক রীতিনীতির কারণে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের আকাঙ্ক্ষায় অনুপ্রাণিত ছিল। হলোকাস্টের পর ইহুদিদের পক্ষে এই শূন্যতা ভীষণভাবে স্পষ্ট ছিল। প্রাণে বেঁচে যাওয়ারা ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাসিদিক সভা ও মিসনাগদিক ইয়েশিভোত পুনর্নির্মাণের দায় বোধ করেছে। হিটলারের মৃত্যু-শিবিরে প্রাণ হারানো লক্ষ লক্ষ হেরেদিমের প্রতি এটা ছিল ধার্মিকতার একটি আচরণ ও অশুভের শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাদের বিশ্বাস ছিল হেরাদি প্রতিষ্ঠানসমূহকে নতুন জীবন দান করে ও সেই মৃত জগৎকে আবার জীবিত করে কেবল বেঁচে থাকতেই দিয়ে নয় বরং আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী করে পবিত্রের পক্ষে আঘাত হানছে তারা।২৩ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ইয়েশিভোত প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৪৩ সালে র্যাবাই আরন কোতলার (১৮৯১–১৯৬২) ফোলোঝিন, মির ও স্লোবোদকার ইয়েশিভোতের অনুসরণে নিউ জার্সির গেদোলাহয় বায়াস মিদ্রাশ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে আমেরিকায় প্রথম লিথুয়ানিয় ইয়েশিভা স্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালের পর তেল আভিভের কাছে নেই ব্রাক ‘তোরাহ নগরীতে’ পরিণত হয়। এর নব প্রতিষ্ঠিত ইয়েশিভা ইসরায়েল ও ডায়াসপোরার সব জায়গা থেকে ছাত্রদের আকর্ষণ করতে থাকে। এখানে পরিচালনাকারী চেতনা ছিলেন র্যাবাই আব্রাহাম ইয়েশাইয়াহু কারলিত্য (১৮৭৮-১৯৪৩), হাযন ইশ (তাঁর একটি গ্রন্থের নাম) নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। এইসব নতুন প্রতিষ্ঠান ইয়েশিভাকে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে হেরেদি জীবনের মূলে পরিণত করেছিল। তোরাহ পাঠ পরিণত হয়েছিল আজীবন পূর্ণকালীন প্রয়াসে। বিয়ের পরেও পুরুষরা পড়াশোনা চালিয়ে যেত, স্ত্রীরা তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিত। বলতে গেলে গোটা ইউরোপিয় ইহুদি সম্প্রদায়কেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া আধুনিকতার নতুন বিপজ্জনক জগতে ইয়েশিভায় বাসকারী পণ্ডিতদের একটা ক্যাডারের বাইরের জগতের সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক ছিল, নিজেদের পবিত্র টেক্সটে পরিপূর্ণভাবে মগ্ন করে রেখেছিলেন তাঁরা, ইহুদিবাদের নতুন অভিভাবকে পরিণত হবেন তাঁরা।২৪
কোতলারের বিশ্বাস ছিল তাঁর ছাত্ররাই গোটা বিশ্বের অস্তিত্বকে ধরে রেখেছে। স্রেফ মানুষকে তোরাহ পাঠে সক্ষম করে তোলার জন্যেই ঈশ্বর স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। একমাত্র ইহুদি জাতি দিনরাত তোরাহ পাঠ করলেই তার দায়িত্ব পালন হবে। তারা সেটা বন্ধ করে দিলে, ‘সমগ্র বিশ্বজগৎ সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে যাবে।২৫ এটা পূর্ণ নিশ্চিহ্নতার সাথে সংঘর্ষের ফলে আবির্ভূত এক ধার্মিকতা। যেকোনও সেক্যুলার পাঠ কেবল সময়েরই অপচয় নয়, বরং তা খুনে জেন্টাইল সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়ার শামিল। আধুনিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যকে আত্মস্থ করার প্রয়াসী ইহুদিবাদের যেকোনও ধরন-ধর্মীয়, যায়নবাদী, সংস্কার, রক্ষণশীল বা নিও- অর্থডক্স—অবৈধ।২৬ সম্প্রতি ইহুদিবাদকে ধ্বংস করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা এক বিশ্বে এমন কোনও আপোসের অবকাশ থাকতে পারে না। প্রকৃত ইহুদিকে অবশ্যই এই জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে সম্পূর্ণভাবে টেক্সটে নিমগ্ন করতে হবে। যুদ্ধোত্তর নতুন ইয়েশিভোত মৌলবাদী আধ্যাত্মিকতার মরিয়া ভাবের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে আধুনিকতার সাথে বিধ্বংসী মোকাবিলার পর কেবল পবিত্র টেক্সটই অবশিষ্ট রয়ে গেছে। ছয় মিলিয়ন ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছে। অগুনতি ধ্রুপদী ইহুদি শিক্ষার সাথে ইয়েশিভোত ও হাসিদিক সভাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে; ঘেটোর জীবনধারা এবং এর সাথে সাথে প্রথাগত অনুসরণের শত বছরের আন্তরিক বিদ্যাও চিরকালের জন্যে হারিয়ে গেছে; পবিত্র ভূমি যায়নবাদীদের হাতে দূষিত হয়েছে। ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা এখন কেবল ঈশ্বরের সাথে শেষ সম্পর্কটুকু ধরে রাখা টেক্সট আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে।
