যায়নবাদ যত সফল হয়ে উঠল নেচারেই কারতা ততই হতবাক হয়ে চলল। কী কারণে দুষ্টরা সমৃদ্ধি লাভ করছে? ১৯৪৮ সালে হলোকাস্টের খুব অল্প পরেই ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করলে তেইতেলবাম ও ব্লঅ কেবল এই উপসংহারেই পৌঁছতে পেরেছিলেন যে, ইহুদিদের অর্থহীন অশুভ ও অপবিত্রতার দিকে চালিত করতে খোদ শয়তান ইতিহাসে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছে।১৬ অধিকাংশ অর্থডক্স ও আল্ট্রা-অর্থডক্সরা নতুন রাষ্ট্রকে মেনে নিতে পেরেছিল। তারা ঘোষণা করেছিল যে, এর কোনও ধর্মীয় মূল্য নেই, ইসরায়েলে বাসরত ইহুদিরা এখনও ঠিক ডায়াসপোরার মতোই নির্বাসনে আছে; কোনও কিছুই বদলায়নি। আগুদাত ইসরায়েল ইহুদদের ধর্মীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে ঠিক ইউরোপের জেন্টাইল সরকারগুলোর সাথে আলোচনা করার মতোই ইসরায়েলি সরকারের সাথে শতাদলানাতে-সংলাপ ও আলোচনা-প্রস্তুত ছিল। কিন্তু নেচারেই কারতা এসবের কোনও কিছুই মেনে নিতে পারেনি। ১৪ই মে, ১৯৪৮ তারিখে রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই নির্বাচনে যেকোনও ধরনের অংশ গ্রহণের উপর দলটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ইয়েশিভোতের জন্যে সরকারী অর্থসংস্থান গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় ও সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে কখনওই পা না রাখার শপথ নেয়। আগুদাতের উপর আক্রমণও দ্বিগুন করে দেয়, তাদের বাস্তবভিত্তিক রাষ্ট্র মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা কীলকের ডগা বিবেচনা করেছে। ‘ঈশ্বর না করুন, অশুভ, বলাৎকারকারী ও দূষিতকারীদের প্রতি আমাদের ঘৃণা থেকে আমরা এতটুকু সরে এলেও,’ জোরের সাথে বলেছেন ব্লঅ, [আমরা যদি] পবিত্র তোরাহর আমাদের উপর অরোপিত বিচ্ছিন্নতাকে ভঙ্গ করি…তাহলে প্রতিটি নিষিদ্ধ জিনিসের জন্যে রাস্তা উন্মুক্ত হয়ে যাবে, কারণ বাঁকা পথের জন্যে সরল ও সংকীর্ণ পথ ছেড়ে দেব।১৭ বলতে গেলে গোটা ইহুদি জাতিকে ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রলুব্ধ করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়নবাদী উদ্যোগ সকল শোভন ও পবিত্র মূল্যবোধের বিনাশী প্রত্যাখ্যানে পতিত হচ্ছে।
ইহুদি বিশ্বে যায়নবাদ শেকড় গেড়ে বসার সাথে সাথে ইহুদি রাষ্ট্রটি সফল হয়ে ওঠার ফলে উভয়ের প্রতিই নেচারেই কারতার ঘৃণা প্রবল হয়ে উঠল। সমন্বয়ের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। কারণ ইসরায়েল রাষ্ট্রটি ছিল শয়তানের সৃষ্টি। তেইতেলবাম যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, কোনও ইহুদির পক্ষে ‘রাষ্ট্রের প্রতি ও তোরাহর প্রতি একসাথে বিশ্বাস রাখা সম্ভব নয়, কারণ তারা সম্পূর্ণ বিপরীত।’ এমনকি রাজনীতিবিদরা তালমুদিয় সাধু ও নির্দেশনার নিবেদিতপ্রাণ অনুসারী হলেও রাষ্ট্র তারপরেও দানবীয় অশ্লীলতাই রয়ে যাবে কেননা এটা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে ও নিষ্কৃতি ও অন্তিমকালকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াস পেয়েছে।১৮ ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ধর্মীয় আইন পাসের নেচারেই কারতার প্রয়াস নিয়ে আগুদাত ইসরায়েলের মাথা ঘামানোর কোনও ফুরসত ছিল না। আইন করে সাব্বাথে সরকারী পরিবহন সীমিত করা বা ইয়েশিভার ছাত্রদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই দেওয়া ধর্মীয় কাজ নয়। এটা স্রেফ স্বর্গীয় আইনকে মানবীয় আইনে পরিণত করা; এটা তোরাহকে বাতিল করারই শামিল, হালাখাহর অপবিত্রকরণ। নিউ ইয়র্কের সাতমার হাসিদিম সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় পণ্ডিত র্যাবাই শিমন ইসরায়েল পোসেন নেসেটের আগুদাত সদস্যদের সম্পর্কে যেমন বলেছেন:
যারা প্রতিদিন ‘নেসেট’ নামে পরিচিত দুষ্টদের সমাবেশে ফিল্যাম্ব্রিজ পরে আর মিথ্যার উদ্দেশে গান গায়, ঈশ্বর না করুন, আশীর্বাদপ্রাপ্ত পবিত্র জনের স্বাক্ষর জাল করে, তাদের উপর লানত বর্ষিত হোক। কারণ তারা মনে করে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট দিয়ে তোরাহর সত্যিকে আরও দলিত করা যাবে কিনা বা ঈশ্বরের তোরাহকে কর্তৃত্ব প্রদান করা যাবে কিনা সেটা স্থির করতে পারবে।১৯
কিন্তু তারপরেও নেচারেই কারতা যায়নবাদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেছে। যায়নবাদীদের ‘বলাৎকারকারী’ হিসাবে ব্লঅর বর্ণনা তাৎপর্যপূর্ণ। ইহুদি ভূমিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ইহুদির আত্মায় প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এটাই মৌলবাদী টানপোড়েনের অংশ। প্রায়শঃই তারা আধুনিকতার যেসব সাফল্য থেকে আতঙ্কে পশ্চাদপরণ করে থাকে সেগুলোর প্রতিই তীব্রভাবে আকর্ষণ বোধ করে।° মোহনীয় বিশ্বাসযোগ্য প্রতারক অ্যান্টিক্রাইস্টের প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদী চিত্রণ একই বিরোধের একটা কিছু তুলে ধরে। আধুনিকতার মৌলবাদী দর্শনে বিস্ফোরক হয়ে ওঠার মতো এক ধরনের টেনশন রয়েছে যা, ব্লঅ যেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, যায়নবাদ বিরোধীদের ধার্মিকতা এক ধরনের নীতিগত ‘ঘৃণা’ এবং ঘৃণা প্রায়শঃই অজ্ঞাত ভালোবাসার সাথে হাত ধরাধরি করে চলে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের কথা ভাবতে গেলে হেরেদিম ক্রোধ অনুভব করে। তারা হত্যা করে না বটে, কিন্তু আজও সাব্বাথের দিন আইন ভেঙে যেসব ড্রাইভার গাড়ি চালায় তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোঁড়ে। অনেক সময়, অর্থাৎ ধরা যাক টেলিভিশন রেখে বা স্ত্রীকে অশোভান পোশাক পরার অনুমতি দিয়ে প্রত্যাশিত মান অনুযায়ী বাস করতে ব্যর্থ সতীর্থ হেরেদির বাড়িতে আক্রমণ চালায়। সহিংসতার এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে কিদ্দুশ হাশেম, ‘ঈশ্বরের নামের পবিত্রকরণ’ হিসাবে দেখা হয় এবং চারদিক থেকে হেরেদিমকে ঘিরে রেখে তাদের গ্রাস করার হুমকি দিয়ে চলা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আঘাত মনে করা হয়।২১ তবে এমনটা হওয়া অসম্ভব নয় যে, এইসব সহিংসতা আসলে তাদের নিজেদের মনেরই চাপা আকাঙ্ক্ষা ও আকর্ষণ দমানোরই প্রয়াস।
