একারণেই বিচ্ছিন্নতার দায়িত্ব। তোরাহ যেমন পবিত্রকে অপবিত্র থেকে, আলোকে অন্ধকার থেকে, দুধকে মাংস থেকে এবং সাব্বাথকে বাকি সপ্তাহ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে তেমনি ন্যায়নিষ্ঠকে নিজেকে বিচিছন্ন রাখতে হবে। কখনও দলে ফিরে আসবে না এমন বিদ্রোহী, এইসব দুষ্ট ইহুদিদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে প্রকৃত হেরেদিম তাদের সাথে অধিবিদ্যিক স্তরে বিরাজিত অস্তিত্বের মহাগহ্বরেরই ভৌত প্রকাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু ভীতিকর এই দর্শন বোঝায় যে, শয়তানি অশুভের ভেতর বাস করে বিশ্বাসীদের জীবনের প্রতিটি বিষয় মহাজাগতিক গুরুত্ব বহন করে। পোশাক, পড়াশোনার কৌশল, এমনকি রুটির টুকরোকে অবশ্যই সঠিক হতে হবে। ইহুদি জীবন মারাত্মকভাবে বিপদাপন্ন, যেকোনও রকম উদ্ভাবনই দারুণভাবে নিষিদ্ধ: খেয়াল রাখতে হবে যেন ডান দিকের ল্যাপেল বাম দিকের ল্যাপেলের উপরে থাকে, যাতে পরমেশ্বরের ডান হাত, ‘পরমপ্রভুর ডান হাত উপরে থাকে’ এর মহান ভালোবাসায় (হেসেদ), অশুভ প্রবণতার ক্ষমতা (দিন) প্রকাশকারী বামদিকের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে।১২ প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদ যেখানে কঠোর মতবাদগত সমরূপতায় পরম নিশ্চয়তার সন্ধান করে শূন্যতাকে পুরণ করার প্রয়াস পেয়েছে, এইসব যায়নবাদ বিরোধী আল্ট্রা অর্থডক্সরা ঐশী বিধান ও রেওয়াজের অনুপুঙ্ক্ষ পরিপালনের ভেতর নিশ্চয়তার খোঁজ করেছে। এটা যেগুলো কেবল প্রাচীন সীমারেখার পুঙ্খানুপুঙ্খ সংরক্ষণ, নতুন সীমানার সৃষ্টি, কঠোর বিচ্ছিন্নতা ও ঐতিহ্যের মূল্যবোধের আবেগময় পরিপালনের মাধ্যমেই প্রশমিত হতে পারে এমন প্রায় নিয়ন্ত্রণের অতীত ভীতি তুলে ধরা এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা।
যেসব ইহুদি যায়নবাদী সাফল্যকে বিস্ময়কর ও উপশমকারী মনে করেছিল তাদের কাছে এই প্রত্যাখ্যানবাদী দর্শন বোধগম্য ঠেকেনি। এটাই গোটা বিংশ শতাব্দী জুড়ে ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিমদের সকলের মোকাবিলা করা সেই টানাপোড়েন: মৌলবাদী ও আধুনিক সেক্যুলার বিশ্বের প্রতি অধিকতর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারীদের ভেতরকার অনতিক্রম্য এক দূরত্ব রয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠী স্রেফ অবস্থাকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারে না। যৌক্তিক তর্ক কোনও কাজে আসে না, কারণ বিরোধের সৃষ্টি হয় মনের গভীরতর ও অধিকতর স্বজ্ঞামূলক স্তরে। শাপিরা, তেইতেলবাম এবং মারগোলিস সেক্যুলার যায়নবাদীদের উদ্দেশ্যমূলক, বাস্তববাদী ও যৌক্তিকভাবে অনুপ্রাণিত কর্মকাণ্ড নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় তাঁরা কেবল তাদের ঈশ্বরহীন এবং একারণে দানবীয় রূপেই দেখতে পেয়েছেন। পরে তাঁরা এবং তাঁদের অনুসারীরা মৃত্যু-শিবিরে নাৎসিদের যৌক্তিক, বাস্তবভিত্তিক ও নিষ্ঠুরভাবে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের কথা শুনে তাদের যায়নবাদী উদ্যোগের মতো একই প্রকৃতির মনে করেছেন। দুটোই ঈশ্বরের অনুপস্থিতি তুলে ধরেছে, সুতরাং এগুলো ধ্বংসাত্মকভাবে হেরেদিমদের কাছে মূল্যবান পবিত্র সকল মূল্যবোধ মাড়িয়ে যাওয়া শয়তানসুলভ ও বিনাশী। এখন পর্যন্ত জেরুজালেমের যায়নবাদ বিরোধী এলাকার প্ল্যাকার্ড ও গ্রাফিতিগুলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতাদের হিটলারের সাথে তুলনা করে। বহিরাগত কারও চোখে এমনি তুলনা হতবুদ্ধিকর, মিথ্যা ও বিকৃত, তবে মৌলবাদীদের হৃদয়ে সেক্যুলারিজম কেমন গভীর ভীতি জাগিয়ে তুলতে পারে আমাদের সে সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়।
এরেত্য ইসরায়েলে ইহুদি ধর্মদ্রোহীদের একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাটিই একটা টাবুকে লঙ্ঘন করেছিল। শত শত বছর ধরে হারানো ভূমি একে ঈশ্বর ও তোরাহর সাথে এক ধরনের পবিত্র ট্রিনিটিতে সম্পর্কিত করে এক প্রতীকী ও অতীন্দ্রিয়বাদী মূল্য লাভ করেছিল। ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলার ব্যাপারটি গোপন করেনি এমন একদল লোকের হাতে এর অপবিত্রকরণ প্রত্যক্ষ করা পবিত্র উপাসনালয়ের অমর্যাদার মতোই মিশ্র ক্রোধ ও ভীতির উদ্রেক ঘটিয়েছে, বিশেষ করে ইহুদি বিশ্বে একে প্রায়শঃই ধর্ষণ হিসাবে অনুভব করা হয়ে থাকে।” যায়নবাদীরা যতই তাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, রেডিক্যাল হেরেদিমদের কেউ কেউ ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছিল; অবশেষে ১৯৩৮ সালে যায়নবাদীদের সাথে ‘সহযোগিতা’র কারণে আগুদাত থেকে বের হয়ে আসা আমরাম ব্লঅ ও আহারন কাতযেনেলেনবোগেন এদাহ হেরেদিস ছেড়ে বের হয়ে আসেন। ইহুদি সম্প্রদায় সম্প্রতি আরব আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরক্ষার খরচ মেটানোর লক্ষ্যে বিশেষ কর আরোপ করেছিল, এই প্রত্যাখানবাদীরা তা আদায় করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যাখ্যানকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করতে ব্লঅ ও কাতযেনেলেনবোগেন একটি তালমুদিয় কাহিনী উদ্ধৃত করেছেন। তৃতীয় শতাব্দীতে রোমান প্যালেস্তাইনের একটি শহরে সশস্ত্র প্রহরীরা একটি ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিরক্ষা সংগঠিত করার সময় দুজন ইহুদি সাধু তাদের বলেছিলেন: “তোমরা শহরের অভিভাবক নও, বরং ধ্বংসকারী।১৪ ব্লঅ ও কাতযেনেলে বোগেনের হাতে গড়ে ওঠা নতুন দলটিকে একটি আরামাইক নাম দিয়েছিলেন, নেচারেই কারতা (‘দ্য গার্ডিয়ান অভ দ্য সিটি’): ইহুদিরা যায়নবাদীদের জঙ্গী তৎপরতার মাধ্যমে নয় বরং অর্থডক্সদের নিবেদিতপ্রাণ ও নিষ্ঠ ধর্মীয় পরিপালনের ভেতর দিয়েই রক্ষা পাবে। তাঁরা যায়নবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁদের চোখে ইহুদিদের যখন তোরাহ দেওয়া হয়েছিল, তারা বিভিন্ন জাতি থেকে এক ভিন্ন বলয়ে প্রবেশ করেছিল। রাজনীতি বা সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেওয়ার কথা নয় তাদের, বরং উচিত আত্মার কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিবেদন করা। ইহুদিদের ইতিহাসের জগতে ডাক দিয়ে যায়নবাদীরা আসলে ঈশ্বরের রাজ্যকে পরিত্যাগ করেছে ও এমন এক রাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে যেটা ইহুদিদের পক্ষে কোনও অস্তিত্বমূলক অর্থ রাখে না। তারা নিজেদের প্রকৃতিকেই অস্বীকার করেছে এবং ইহুদিদের ধ্বংসের পথে স্থাপন করেছে।১৫
