এই প্রত্যাখ্যানবাদী অর্থডক্সির প্রধান মূখপাত্র ছিলেন হাঙেরিয় ইহুদি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান হাসিদিক নেতা র্যাবাই হাইম এলিয়েযার শাপিরা অভ মুনকাকস (১৮৭২-১৯৩৭)। ১৯২২ সালে আগুদাতের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রচারণা শুরু করেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে আগুদাত সদস্যরা যায়নবাদীদের সাথে যোগসাজশে গোয়িশি আলোকনের এইসব ‘বিষাক্ত আগাছা ও সোমরস’ দিয়ে নিষ্পাপ স্কুলছাত্রদের আক্রান্ত করছে, ‘তেমনি সেইসব গান দিয়ে যেগুলো এরেত্য ইসরায়েলের ভূমিতে ক্ষেতখামারে ও আঙুর বাগিচায় ভূমিতে বসতি গড়ার কথা বলে-ঠিক যায়নিবাদী কবিদের মতো।’৫ তারা পবিত্র জমিনকে চাষ করার মাধ্যমে কেবল প্রার্থনা ও পবিত্র পাঠের জন্যেই নির্ধারিত পবিত্র ভুমিকে অপবিত্র করছে। স্লোভাকিয়ায় এক সভায় হেরেদিমের সবচেয়ে রেডিক্যাল মুনকাক্যার রেব্বের সাথে একমত হয়ে আগুদাতের সাথে সংশ্লিষ্টতার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নির্দেশে স্বাক্ষর করেন। সুস্পষ্টভাবে যায়নবাদের বিরোধিতা করে অস্তিত্ব লাভ করা আগুদাত সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক ছিল না; এই দলটি যারা যায়নবাদকে সমর্থন করে না আবার আগুদাতের উপর শাপিরার নিষেধাজ্ঞাকেও সমান বাড়াবাড়ি মনে করে এমন পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থডক্সের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সজাগ ছিল। তা সত্ত্বেও যায়নবাদের সহজাত ত্রাসের কারণে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতিকে তারা যুক্তিসঙ্গত মনে করেছে। নিষেধাজ্ঞায় স্বাক্ষরকারী অন্যতম প্রথম হেরেদিম ছিলেন তরুণ র্যাবাই মোশে তেইতেলবাম (১৮৮৮-১৯৭৯), পরে হাঙেরির সাতমারের হাসিদিম নেতা এবং যায়নবাদ ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রবলতম হেরেদি বিরোধীতে পরিণত হবেন তিনি।
শাপিরা ও তেইতেলবাম প্যালেস্তাইনে যায়নবাদী কিম্ভুতযিম নিয়ে ভাববার সময় লোকে পরবর্তী কালে নাৎসি মৃত্যু-শিবিরের কথা শুনলে যেমন ভীতি ও ক্রোধের অনুভূতিতে তাড়িত হত তেমনি বোধ করেছেন। এটা মোটেই বাড়াবাড়ি ছিল না। স্বজাতির সাথে আমেরিকায় অভিবাসন করে অল্পের জন্যে রেহাই পেয়েছিলেন তেইতেলবাম, হলোকাস্টের সম্পূর্ণ দায়ভার ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদি জনগণকে ভয়ানক ধর্মদ্রোহিতার পথে প্রলুব্ধকারী’ যায়নবাদীদের মহাপাপের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, ‘এমন কিছু পৃথিবীর সৃষ্টির পর আর দেখা যায়নি…তো এটা বিস্ময়ের কিছু নয় যে, প্রভু ক্রোধে আঘাত হেনেছেন। এই প্রত্যাখ্যানবাদীরা মরুভূমিতে যার ফসল ফলানো যায়নবাদীদের কৃষিখাতে সাফল্যের ভেতর বা ইহুদিদের প্রাণ বাঁচাতে লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাদের নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ইতিবাচক কিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারেননি। এটা ছিল এক ধরনের ‘উন্মত্ততা’, ‘এক ধরনের ‘অপবিত্রকরণ’, এবং অশুভ শক্তির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।’ যায়নবাদীরা ছিল নাস্তিক, অবিশ্বাসী, তাদের উদ্যোগ তারপরেও অশুভ কারণ এটা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যিনি আদেশ দিয়েছিলেন যে ইহুদিদের অবশ্যই নির্বাসনের কষ্ট ভোগ করতে হবে, তারা অবশ্যই নিজেদের উদ্ধার করার কোনও পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
শাপিরার চোখে ভূমি সাধারণ ইহুদিদের বসতি স্থাপনের পক্ষে অত্যন্ত পবিত্র, আত্মস্বীকৃত যায়নবাদী বিদ্রোহীদের কথা তো বাদই। কেবল সারা জীবন পাঠ ও প্রার্থনায় কাটিয়ে দেওয়া ধর্মীয় অত্যুৎসাহীই সেখানে নিরাপদে বাস করতে পারে। যেখানে এরেত্য ইসরায়েলের (ইসরায়েল দেশ) মতো কোনও পবিত্র বস্তু থাকে, অশুভ শক্তি সেখানেই আক্রমণ চালাতে সমবেত হয়। যায়নবাদীরা, ব্যাখ্যা করেছেন শাপিরা, স্রেফ দানবীয় প্রভাবের বাহ্যিক প্রকাশ মাত্র। সুতরাং, খোদ পবিত্র ভুমি দুষ্ট শক্তিতে ভরে উঠেছে, যা ঈশ্বরের ক্রোধ ও ক্ষোভ জাগিয়ে তুলবে।’ ঈশ্বরের বদলে এখন খোদ শয়তান জেরুজালেমে বাস করছে। ভূমিতে ‘আরোহণে’র ভানকারী যায়নবাদীরা আসলে নরকের গভীরে নেমে যাচ্ছে” পবিত্ৰ ভুমি এখন ঈশ্বর শূন্য; অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। যায়নবাদীদের বক্তব্য মোতাবেক এরেত্য ইসরায়েল মোটেই স্বদেশভূমি নয়, বরং রণক্ষেত্র। এমনি ভয়ঙ্কর সময়ে সেখানে কেবল যারা বাস করতে পারে তারা গৃহস্থ বা কৃষক নয়, বরং ‘জেরুজালেমের পবিত্র পাহাড়ে ঈশ্বরের অবশিষ্ট ঐতিহ্যের পক্ষে ন্যায়যুদ্ধ করতে অগ্রসর হওয়া যোদ্ধা, ‘অন্ধ ঈশ্বরভীরুর দল,’ ‘যুদ্ধের বীর পুরুষ’। গোটা যায়নবাদী উদ্যোগ শাপিরাকে অস্তিত্বগত ভীতিতে ভরিয়ে তুলেছিল। তেইতেলবাম যায়নবাদীদের ইহুদি জনগণের উপর লাগাতার বিপর্যয় নিয়ে আসা অশুভ অহঙ্কারের সর্বশেষ প্রকাশ হিসাবে দেখেছেন: টাওয়ার অভ বাবেল, সোনালি বাছুরের বহুঈশ্বরবাদীতা, সিই দ্বিতীয় শতাব্দীতে বার কোচবা বিদ্রোহ ও শাব্বেতেই যেভি কেলেঙ্কারী। কিন্তু যায়নাবাদই সব সেরা ধর্মদ্রোহীতা। এটা ছিল বিশ্বের খোদ ভিত্তিমুলের নাড়া দেওয়া ভীষণ ঔদ্ধত্য। ঈশ্বরের হলোকাস্ট প্রেরণের ভেতর বিস্ময়ের কিছুই নেই!৯
সুতরাং, বিশ্বাসীকে অবশ্যই নিজেদের অশুভ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে নিতে হবে। ১৯২০ ও ১৯৩০-র দশকে লেখালেখি করেছেন জেরুজালেমের অন্যতম অত্যুৎসাহী হাসিদিম র্যাবাই ইয়েশায়াহু মারগোলিস, শাপিরা ও তেইতেল বামের বিরাট ভক্ত ছিলেন তিনি, তেইতেলবামকে এদাহ হেরেদিসের নেতা হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। মারগোলিস ইসরায়েলের প্রতি-ইতিহাস নির্মাণ করেছিলেন যেখানে অবিরাম শত শত বছর ধরে ঈশ্বরের নামে রুখে দাঁড়িয়ে অন্য ইহুদিদের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াই করতে বাধ্য মনে করা যুদ্ধংদেহী একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। লেভাইরা মোজেস সিনাই পাহাড়ের চূড়ায় তোরাহ গ্রহণ করার সময় সোনালি বাছুরের উপাসনাকারী তিন হাজার ইসরায়েলিকে হত্যা করেছিল; একারণেই, মন্দিরে তাদের সেবার জন্যে নয়, ঈশ্বর অন্য গোত্রগুলোর উপরে তাদের মর্যাদা দিয়েছিলেন। মোজেস ছিলেন সারা জীবন অন্য ইহুদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া একজন মহান ধর্মোৎসাহী। আরনের পৌত্র ফিনেহাস ইসরায়েলের রাজপুত্র হওয়া সত্ত্বেও যিমরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, কারণ তিনি ব্যাভিচার করেছিলেন। এলিযাহ আহাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাআলের ৪৫০জন পয়গম্বরকে হত্যা করেছেন। এই অত্যুৎসাহী ধার্মিকরা, ঈশ্বরের প্রতি যাদের আবেগ প্রায়শঃই নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধের ভেতর দিয়ে প্ৰকাশ পায়, সত্যিকারের ইহুদি, অবশিষ্ট বিশ্বাসী। অনেক সময় জেন্টাইলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে তাঁদের, অনেক সময় সতীর্থ ইহুদিদের বিরুদ্ধে, কিন্তু যুদ্ধ বরাবর একই। বিশ্বাসী ইহুদিদের অবশ্যই ঈশ্বরকে ত্যাগ করে অশুভের দলে নাম লেখানো আগুদাতের সদস্যের মতো ইহুদিদের সাথে নিজেদের শেকড়বাকর শুদ্ধ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। যায়নবাদের সাথে সহযোগিতা করে আগুদাত ইহুদিদের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপের চেয়েও বেশি ক্ষতি করেছে।’ ওদের সাথে মেশা পাপ এবং শয়তানের সাথে চুক্তি করার মতোই।১১
