মানব চেতনায় ঈশ্বরের পরলোকগমনের ফলে আবির্ভূত বিপদেরও স্মারক ছিল হলোকাস্ট। খৃস্টতত্ত্বে নরককে ঈশ্বরের অনুপস্থিতি হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। শিবিরগুলোকে যেন অপার্থিবভাবে শত শত বছর ধরে ইউরোপিয়দের তাড়া করে ফেরা নরককুণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্নির্মাণ বলে মনে হয়েছিল। প্রহার, শূলে চরানো, চাবুকপেটা করা এবং পরিহাস, বিকৃত, বিনষ্টদেহ, অগ্নিশিখা ও গন্ধময় হাওয়া এসব কিছুই ক্রিশ্চানদের ইউরোপের কবি, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও নাট্যকারদের বর্ণিত নরকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। অশউইচ ছিল এক কৃষ্ণ এপিফ্যানি, পবিত্রতার অনুভূতি হারিয়ে গেলে জীবনের চেহারা কেমন হতে পারে মানুষকে তার একটা আভাস দিয়ে গিয়েছিল। সর্বত্তোম অবস্থায় (কেবল সর্বোত্তম অবস্থাতেই) ধর্ম মানুষকে এর মিথ, আচার ও কাল্টিক ও নৈতিক অনুশীলনের ভেতর মানবজাতির পবিত্রতার উপলব্ধি চর্চা করতে সাহায্য করেছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ মনে হয়েছে, বল্গাহীন যুক্তিবাদ পৃথিবীর বুকেই নরক নামিয়ে আনতে নিজেকে বাধ্য মনে করতে পারে, ঈশ্বরের অনুপস্থিতির সহসম্পর্কিত উদ্দেশ্য। আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি সৃজনশীলতার সাথে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানোর ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষকে আকর্ষণ করার মতো এক ধরনের বিনাশী প্রবণতা ছিল। ঈশ্বরের প্রতীক মানবীয় সম্ভাবনার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছিল; এবং রক্ষণশীল যুগে নারী-পুরুষের কর্মতৎপরতার উপর সীমা আরোপ করেছিল। আইনের নির্দেশনা তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে এই পৃথিবী তাদের খেয়ালখুশি মতো কিছু করার জায়গা নয়। আধুনিক মানব সত্তা এখন এমন ব্যাপক মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তিকে মূল্য দিচ্ছিল যে সর্বশক্তিমান স্বর্গীয় আইনপ্রণেতার ধারণাই তাদের কাছে ঘৃণ্য হয়ে উঠেছিল এই পরিবর্তন মানুষের মর্যাদার এক বিরাট অগ্রগতি চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু হলোকাস্ট ও গুলাগ দেখিয়েছে, মানুষ এধরনের সকল বাধা ছুঁড়ে ফেললে কিংবা জাতি বা রাজনীতিকে পরম মূল্যে পরিণত করলে কী ঘটতে পারে। জীবনের পবিত্রতা এবং পৃথিবীকে সম্মান দেখাতে মানুষকে ‘অতিপ্রাকৃতের’ অপুর্ণাঙ্গ প্রতীক নিয়ে আধুনিক শুদ্ধতার সাথে আপোস করবে না এমন শিক্ষা দেওয়ার নতুন উপায় বের করতে হবে।
মৃত্যু-শিবির ও মাশরুম মেঘ হচ্ছে এমন প্রতিমা যা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে ও মনে রাখতে হবে যাতে আমরা যেন উন্নত বিশ্বে আমাদের অনেকেরই উপভোগ করা আধুনিক বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির ব্যাপারে বড় বেশি শভেনিস্টিক না হয়ে উঠি। কিন্তু এইসব প্রতিমা আবার কিছু কিছু ধার্মিক মানুষ আমাদের আধুনিক সেক্যুলার সামাজকে কীভাবে দেখে সে সম্পর্কে একটা ধারণাও দেয়, যেখানে তারাও ঈশ্বরের অনুপস্থিতি বোধ করে। কোনও কোনও মৌলবাদী আধুনিকতাকে সমানভাবে অহংময়, অশুভ ও দানবীয় মনে করে; আধুনিক শহর বা সেক্যুলার মতাদর্শ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা অশউচের অন্ধকারে তাকিয়ে থাকা উদারপন্থী সেক্যুলারিস্টদের মতো একই ধরনের ভীতি ও অসহায় ক্রোধে তাদের ভরিয়ে তুলেছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের সবকটার মৌলবাদীরাই মূলধারার সমাজ থেকে সরে গিয়ে তাদের ধারণায় পরিস্থিতি কেমন হওয়ার কথা ছিল সেটাকেই তুলে ধরে প্রতি-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। তারা কেবল অহঙ্কার বশতঃ নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছিল না, বরং প্রায়শঃই ত্রাস ও ভীতির কারণে এমনটি করতে বাধ্য হয়েছিল। মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রাণকেন্দ্রে যে ভীতি ও উদ্বেগের বাস সেটা উপলব্ধি করা আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কেবল তাহলেই আমরা এর প্রবল ক্রোধ, নিশ্চয়তা দিয়ে শূন্যতাকে পূর্ণ করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং এর ক্রমাগত এগিয়ে আসা অশুভ সংক্রান্ত বিশ্বাস উপলব্ধি করতে পারব।
কোনও কোনও ইহুদি আধুনিক বিশ্বকে হলোকাস্টের আগে থেকেই দানবীয় মনে করে আসছিল। প্রকৃতপক্ষেই নাৎসি নিষ্ঠুরতা কেবল তাদের এই বিশ্বাসকেই নিশ্চিত করেছিল যে, জেন্টাইল বিশ্ব নিরাময় অতীত অশুভই নয়, বরং অধিকাংশ আধুনিক ইহুদি ভয়ঙ্করভাবে সাজা পাওয়ার যোগ্য। ১৯৩০-র দশক পর্যন্ত আধুনিক সংস্কৃতির সাথে কোনও সম্পর্ক রাখতে অনিচ্ছুক বেশিরভাগ অর্থডক্স ইহুদি ইয়েশিভা বা হাসিদিক সভায় নিজেদের মগ্ন রাখতে পারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা প্যালেস্তাইনে অভিবাসন করার ইচ্ছা বা প্রয়োজন কোনওটাই ছিল না তাদের। কিন্তু ১৯৩০ ও ১৯৪০-র দশকের আলোড়ন বুঝিয়েছিল যে, জীবিতদের ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালানো ছাড়া কোনও উপায় নেই। হেরেদিমদের অনেকে প্যালেস্তাইনে গিয়ে যায়নবাদীদের মুখোমুখি পড়ে যায়, এরা তখন ইহুদিদের আসন্ন বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর লক্ষ্য একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্যে সংগ্রাম করছিল।
জেরুজালেমের আল্ট্রা অর্থডক্স ইহুদি সম্প্রদায় এদাহ হেরেদিস বেলফোর ঘোষণার বহু আগে থেকেই যায়নবাদের প্রবল বিরোধী ছিল। ছোট দল ছিল এটি, ১৯২০-র দশকে প্যালেস্তাইনে বসবাসরত ১৭৫,০০০ জন ইহুদির মধ্যে মাত্র ৯,০০০ জনকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল তারা। পবিত্র টেক্সটে নিমগ্ন এই সম্প্রদায়টির নিজেদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার উপায় সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না, কিন্তু অচিরেই যারা আধুনিক রাজনীতির খেলার কায়দা রপ্ত করা আগুদাত ইসরায়েলের সদস্যরা তাদের সাথে যোগ দেবে। আগুদাত তখনও যায়নবাদের বিরোধী আদর্শগত মতবাদ লালন করলেও সদস্যরা পবিত্র ভূমিতে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বসতি স্থাপন করার মাধ্যমে সেক্যুলারিস্টদের প্রভাব হ্রাস করার প্রয়াস পেয়েছিল, তরুণ সম্প্রদায় যেখানে তোরাহ ও তালমুদের পাশাপাশি আধুনিক বিষয়াদি পাঠ করেছে। এমনি আপোস আগুদাত ‘সীমানা অতিক্রম’ করে গেছে, এই বিশ্বাস লালনকারী অধিকতর আল্ট্রা অর্থডক্স ইহুদিদের ভীত করে তুলেছিল। এই আল্ট্রা অর্থডক্স বিরোধ থেকেই প্রথম নজীরে প্রায়শঃই যেমন ঘটে থাকে সহধর্মাবলম্বীদের ভেতর বিবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি মৌলবাদী আন্দোলনের জন্ম ঘটেছিল।
