বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শেষ নাগাদ মনে হয়েছিল সেক্যুলারিজমের বিজয় ঘটতে যাচ্ছে। ব্যাপক ধর্মীয় কর্মকণ্ডের উপস্থিতি ছিল বটে, যদিও অধিকতর রেডিক্যাল আন্দোলনসমূহকে দমন করায় সেগুলো সেক্যুলার নেতৃত্বের জন্যে কোনও রকম হুমকি ছিল না। কিন্তু এই বছরগুলোতে রোপিত বীজ আধুনিক সেক্যুলারিস্ট পরীক্ষানিরীক্ষার কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর শেকড় ছড়াতে শুরু করবে।
০৭. প্রতি-সংস্কৃতি (১৯২৫-৬০)
নিৎশে ঈশ্বরের প্রয়াণের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই আধুনিক মানুষ নানাভাবে তাদের সংস্কৃতির মূলে একটি শূন্যতার ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র (১৯০৫-৮০) একে বলেছেন মানুষের চেতনায় ঈশ্বর আকৃতির গহবর, যেখানে স্বর্গীয় সত্তা সব সময় ছিলেন কিন্তু এখন এক শূন্যতা পেছনে ফেলে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের বিস্ময়কর সাফল্য প্রাচীন পৌরাণিক সচেতনতাকে দমন করার সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হওয়ায় খোদ ঈশ্বরের ধারণাকেই বহু পাশ্চাত্যকৃত মানুষের পক্ষে অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব করে তুলেছিল। পবিত্রতার অনুভূতি জাগানোর মতো কাল্ট ছাড়া ঈশ্বরের প্রতীক ক্ষীয়মান ও অর্থহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ আধুনিক মানুষ কোনওরকম অনুতাপ করেনি। অনেক দিক থেকেই পৃথিবী আগের চেয়ে ঢের ভালো জায়গায় পরিণত হয়েছিল। তাদের জীবনকে একটা মূল্য দেবে ও তাদের এতদিন পর্যন্ত কনফেশনাল ধর্মগুলোর মাধ্যমে প্রকাশিত সত্তার গভীর প্রবাহের কাছে পৌঁছে দিতে সাহিত্য, শিল্পকলা, যৌনতা, মনোবিশ্লেষণ, মাদক এমনকি ক্রীড়ায় দুয়ের অনুভূতির সন্ধান করে সেক্যুলারিস্ট আধ্যাত্মিকতা গড়ে তুলছিল তারা। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পাশ্চাত্য জনগণ ধরে নিয়েছিল যে, ধর্ম আর কখনওই বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারবে না। একে দৃঢ়তার সাথে ব্যক্তিগত বলয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে; আবারও ক্ষমতার বিভিন্ন অবস্থান দখল করে রাখা বা প্রচারমাধ্যম ও সরকারী ডিসকোর্সের নিয়ন্ত্রণকারী বহু সেক্যুলারিস্টের চোখে একথা সত্যি মনে হয়েছিল। পাশ্চাত্য খৃস্টজগতে ধর্ম প্রায়শঃই নিষ্ঠুর ও নিপীড়নমূলক ছিল। আধুনিক রাষ্ট্রের চাহিদা ছিল সমাজকে সহিষ্ণু হতে হবে। ক্রুসেড বা ইনকুইজিশনের যুগে ফিরে যাবার কোনও উপায় ছিল না। সেক্যুলারিজম এসেছে থাকবার জন্যে। কিন্তু একই সময়ে, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ পৃথিবীকে এও স্বীকার করে নিতে হয়েছিল যে, ‘শূন্যতা’ যে এখন আর মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা নেই, বরং একে স্পষ্ট ও ভীতিকর রূপ দেওয়া হয়েছে।
১৯১৪ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের ভেতর ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে সত্তর মিলিয়ন মানুষ সহিংস মৃত্যু বরণ করেছিল।’ ভয়াবহ কিছু নিষ্ঠুরতা সংঘটিত হয়েছিল ইউরোপের অন্যতম সংস্কৃত সমাজের বাসিন্দা জার্মানদের হাতে। যৌক্তিক শিক্ষা বর্বরতা নিশ্চিহ্ন করতে পারবে, এমনটি আর মনে করা যাচ্ছিল না; কেননা এক মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে কাছেই নাৎসি হলোকাস্ট নির্যাতন শিবিরের অস্তিত্ব প্রকাশ করেছিল। নাৎসি হলোকাস্ট বা সোভিয়েত গুলাগের ভয়ঙ্কর মাত্রা সেগুলোর আধুনিক উৎস তুলে ধরে। এর আগের কোনও সমাজই নিশ্চিহ্নতার এমনি ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ভাবেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) ভয়াবহতা শেষ হয়েছিল কেবল জাপানি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপর প্রথম অ্যাটম বোমা বর্ষণের ভেতর দিয়ে। এটাও আবার আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষমতার ভীতিকর রূপ ও আধুনিক সংস্কৃতির নিশ্চিহ্নতার বীজাণু। দশকের পর দশক নারী-পুরুষ ঈশ্বর নির্ধারিত চূড়ান্ত প্রলয়ের অপেক্ষা করে এসেছিল; কিন্তু এখন মনে হচ্ছিল যেন এই বিশ্ব ধ্বংস করার জন্যে মানবজাতির কোনও অতিপ্রাকৃত উপাস্যের প্রয়োজন পড়বে না। নিজেরাই অসাধারণ দক্ষতার সাথে একাজটি করতে খেয়ালি দক্ষতা ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছে তারা। জীবনের এইসব নতুন সত্য বিবেচনা করার সময় জনগণ আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে যৌক্তিক রীতিনীতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অতিমাত্রায় সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। এমনি ভয়াবহ মাত্রার বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে যুক্তি নীরব হয়ে গিয়েছিল; আক্ষরিকভাবেই এর বলার মতো কিছু ছিল না।
হলোকাস্ট আধুনিক কালের অশুভের প্রতিমূর্তিতে পরিণত হবে। এটা ছিল একেবারে গোড়া থেকেই যা জাতিগত শুদ্ধিকরণের কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট আধুনিকতার উপজাত। নাৎসিরা শিল্পযুগের বহু সরঞ্জাম ও সাফল্যকে মারাত্মক কার্যকারিতার সাথে প্রয়োগ করেছে। মৃত্যুশিবিরগুলো ছিল একেবারে খোদ শিল্পকারখানার চিমনি পর্যন্ত ফ্যাক্টরির প্যারোডি। তারা রেলপথ, অগ্রসর রাসায়নিক শিল্প ও দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং ব্যবস্থাপনার পূর্ণ ব্যবহার করেছে। হলোকাস্ট ছিল বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক পরিকল্পনার নজীর, যেখানে সমস্ত কিছু ছিল একক, সীমিত ও স্পষ্ট সংজ্ঞায়িত লক্ষ্যের অধীন। আধুনিক বৈজ্ঞানিক বর্ণবাদ থেকে উদ্ভুত হলোকাস্ট ছিল বিংশ শতাব্দীর ‘উদ্যান’ সংস্কৃতি নামে আখ্যায়িত সামাজিক প্রকৌশলের চরম রূপ। খোদ বিজ্ঞানই মৃত্যু-শিবিরে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল, সেখানে সুপ্রজনন বিদ্যার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। আর কিছু না হোক হলোকাস্ট দেখিয়েছে যে, সেক্যুলারিস্ট মতাদর্শ যেকোনও ধর্মীয় ক্রুসেডের মতোই মারাত্মক হতে পারে।
