তবে উলেমাদের তরফ থেকে নয় বরং নতুন সংবিধানের সবচেয়ে মারাত্মক বিরোধিতা এসেছিল নতুন শাহর কাছ থেকে; রাশিয়ান কস্যাক ব্রিগেডের সহায়তায় ১৯০৮ সালের জুনে একটি সফল অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন তিনি এবং মজলিস বন্ধ করে দেন; সবচেয়ে রেডিক্যাল ইরানি সংস্কারক ও উলেমাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তাব্রিযের পপুলার গার্ড শাহর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং বখতিয়ারি গোত্রের সহায়তায় পরের মাসে পাল্টা অভ্যুত্থান পরিচালনা করে শাহকে গদিচ্যুত করে তাঁর নাবালক পুত্র আহমাদকে একজন উদার রিজেন্টের সাথে সিংহাসনে বসায়। দ্বিতীয় মজলিস নির্বাচিত হয়, কিন্তু মিশরের মতো এই দুর্বল সংসদীয় ব্যবস্থাটি ইউরোপিয় শক্তিগুলোর হাতে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। মজলিস একজন আমেরিকান ফিনান্সিয়ার মরগান শুস্টারকে নিয়োগ দিয়ে ব্রিটেন ও রাশিয়ার দীর্ঘদিন ধরে ইরানের উপর যে শৃঙ্খল চাপিয়ে রেখেছিল সেটা থেকে বের হয়ে আসার প্রয়াস পেলে রাশিয়ান বাহিনী তেহরানে হাজির হয় ও ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে মজলিস রুদ্ধ করে দেয়। আরও তিন বছর পর মজলিসকে আবার অধিবেশন ডাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই সময়ের ভেতর অনেকেই তিক্ত ও মোহমুক্ত হয়ে গিয়েছিল। সংবিধান তাদের প্রত্যাশা মোতাবেক কোনও মহৌষধ ছিল না, বরং স্রেফ ইরানের মৌলিক অক্ষমতাকে নিষ্ঠুর ও স্পষ্ট রূপ দান করেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইরানের পক্ষে দারুণ বিঘ্নকারী ছিল, ফলে বহু ইরানি শক্তিশালী সরকারের আকাঙ্ক্ষা করতে শুরু করেছিল। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ও রাশিয়ান বাহিনী দেশটি দখল করে নেয়। বলশেভিক বিপ্লবের পর রাশিয়ানরা প্রত্যাহৃত হয়, কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলে তাদের ছেড়ে দেওয়া এলাকায় ব্রিটিশরা এগিয়ে যায়, আবার দক্ষিণে নিজেদের ঘাঁটিগুলোয়ও দখল অব্যাহত রাখে। ইরানকে একটি প্রটেক্টরটে পরিণত করতে উদগ্রীব ছিল ব্রিটিশ। ১৯০৮ সালে এদেশে তেল আবিষ্কৃত হয়েছিল, একজন ব্রিটিশ নাগরিক উইলিয়াম কক্স ডি’আরসিকে কনশেসন দেওয়া হয়েছিল; ১৯০৯ সালে অ্যাংলো-পারসিয়ান অয়েল কোম্পানি গঠন করা হয়, ইরানি তেল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জ্বালানির সরবরাহ করতে শুরু করে। ইরান পরিণত হয়েছিল এক বিরাট লোভনীয় বস্তুতে। কিন্তু মজলিস ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করতে শুরু করে। ১৯২০ সালে সারা দেশে ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, মজলিস সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠায়। ব্রিটেন পরিকল্পনা বাদ দিতে বাধ্য হয়। তবে ইরানিরা করুণভাবে সচেতন হয়ে উঠেছিল যে কেবল অন্য শক্তির শরণাপন্ন হয়েই স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারছে তারা, যাদের আবার ইরানের তেল নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানের একটি সংবিধান ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ছিল বটে, কিন্তু মজলিসের প্রকৃত কোনও ক্ষমতা না থাকায় তা ছিল অর্থহীন। এমনকি আমেরিকানরাও লক্ষ করেছিল যে, ব্রিটিশরা অব্যাহতভাবে নির্বাচনে কারচুপি করে চলেছে ও ইরানিদের ‘বর্তমান সামরিক আইন ও নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদপত্রের মাধ্যমে মতামত বা কোনওভাবে অনুভূতি প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে।’৯৪
অসন্তোষের চলমান মনোভাব জনৈক বেসামরিক ব্যক্তিত্ব সায়ীদ জিয়া আদ- দিন তাবতাবাতি ও শাহর কস্যাক ব্রিগেডের কমান্ডার রেযা খানের (১৮৭৭-১৯৪৪) নেতৃত্বে ক্ষুদ্র একটি দলের পক্ষে সরকারকে উৎখাত করা সহজ করে দিয়েছিল। ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়া আদ-দিন প্রধানমন্ত্রী হন, রেযা খান পান আইন মন্ত্রীর দায়িত্ব। জিয়া আদ-দিন বিটিশপন্থী হিসাবে পরিচিত থাকায় ব্রিটিশরা এটা মেনে নিয়েছিল, তারা আশা করেছিল তাঁর নির্বাচনের ফলে প্রটেক্টরেট বানানোর পরিকল্পনা অগ্রসর হবে। পুরোপুরি পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেনি তারা। কিন্তু দুই নেতার ভেতর রেযা খান ছিলেন অধিকতর শক্তিশালী, অচিরেই জিয়াকে নির্বাসনে পাঠাতে সক্ষম হন তিনি, একটি নতুন কেবিনেট গঠন করেন এবং পরিণত হন একক শাসকে। সাথে সাথে দেশের আধুনিকায়নের কাজে হাত দেন রেযা। জনগণ নিদারুণভাবে হতাশ ও পরিবর্তনের জন্যে প্রস্তুত থাকায় তাঁর পূর্বসুরিরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি সেখানে সফল হন। সামাজিক সংস্কার বা দরিদ্রদের নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্রেফ দেশকে কেন্দ্রিভূতকরণ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ইরানকে আরও দক্ষতার সাথে কার্যকর করে তোলা। যেকোনও ধরনের বিরোধিতাকে কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে। একেবারে গোড়া থেকেই রেযা ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করার জন্যে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তোয়াজ করে চলছিলেন। আমেরিকান কারিগরি পরামর্শ ও বিনিয়োগের বিনিময়ে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অভ নিউ জার্সিকে তেলের কনসেশন দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৫ সালে রেযা শেষ কাজার শাহকে ক্ষমতা ত্যাগে সম্মত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তবে মূল লক্ষ্য ছিল একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু উলেমারা আপত্তি তোলেন। মজলিসে আয়াতোল্লাহ মুদ্দারিস ঘোষণা করেন, প্রজাতন্ত্র অনৈসলামিক। আতাতুর্কের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে দূষিত। যাজকগোষ্ঠীর কোনও ইচ্ছাই ছিল না ইরানও তুরস্কের মতো একই পথের পথিক হোক। রেযার শাহ হওয়ার বেলায় কোনও আপত্তি ছিল না। তখনও যাজকদের দরবারকে তোয়াজ করে চলতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি। তিনি তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, সরকার ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করবে, এর বিধিবিধানসমূহ শরীয়াহর সাথে বিরোধে যাবে না। এরপর জনাকীর্ণ মজলিস পাহলভী বংশের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু শাহ রেযা পাহলভীর উলেমাদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভাঙতে দেরি হবে না, তিনি কেবল আতাতুর্কের নিষ্ঠুর সেক্যুলারাইজেশনের সমানই হয়ে উঠবেন না বরং তাঁকে অতিক্রম করে যাবেন।
