সাংবিধানিক বিপ্লব প্রাথমিকভাবে সফল ছিল। প্রধানমন্ত্রীকে জুলাইয়ের শেষের দিকে বরখাস্ত করা হয়, এবং অক্টোবরে তেহরানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উলেমা অন্ত র্ভুক্তকারী প্রথম মজলিস উদ্বোধন করা হয়। এক বছর পরে নয়া শাহ মোহাম্মদ আলি বেলজিয়ান সংবিধানের আদলে প্রস্তুত ফান্ডামেন্টাল ল’ স্বাক্ষর করেন। এর ফলে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজার মজলিসের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল: সকল নাগরিক (ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস লালনকারীসহ) আইনের চোখে সমান অধিকার ভোগ করেছে এবং সংবিধান ব্যক্তিগত অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করেছে। গোটা ইরান জুড়ে উদার কর্মকাণ্ডের একটা জোয়ার শুরু হয়েছিল। প্রথম মজলিস সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিয়েছিল, এবং অবিলম্বে সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। নতুন বিভিন্ন সমাজ গড়ে ওঠে, একটি জাতীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, একটা নতুন মিউনিপ্যাল কাউন্সিল নির্বাচিত হয়। তাব্রিযের মেধাবী তরুণ ডেপুটি সায়ীদ হাসান তাকিযাদেহ মজলিসে বামপন্থী গণতান্ত্রিক দলের নেতৃত্ব দেন, অন্যদিকে মুজতাহিদ আয়াতোল্লাহ তাবাতাবাদি ও সায়ীদ আব্দাল্লাহ বেহবেহানি শরীয়াহর মর্যাদা রক্ষা করতে কিছু ধারা সংযোজনে সক্ষম হওয়া রক্ষণশীল দলের নেতৃত্বে ছিলেন।
কিন্তু উদারপন্থী যাজকগোষ্ঠী ও সংস্কারকদের ভেতর এই সহযোগিতার প্রদর্শনী সত্ত্বেও প্রথম মজলিস এক গভীর বিভাজন তুলে ধরেছিল। সাধারণ ডেপুটিদের অনেকেই ছিলেন মালকুম খান বা কিরমানির সাথে সংশ্লিষ্ট ভিন্নমতাবলম্বী, এরা উলেমাদের প্রতি কেবল অসন্তোষই বোধ করতেন। তাঁদের প্রায়শঃই বিপ্লবী ধ্যানধারনার প্রচার চালাতে গঠিত আনজুমান-(‘গোপন গোষ্ঠী’)- এর সদস্য হতে দেখা যেত, এমনকি অধিকতর রেডিক্যাল যাজকের সাথে এইসব দলের সম্পর্ক ছিল, সংস্কারকগণ সাধারণত উলেমাদের প্রগতির পথে বাধা হিসাবে বিবেচেনা করতেন। সংস্কারকদের সাথে যোগ দেওয়া উলেমাগণ শরীয়াহকে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় বিধানে পরিণত করার প্রত্যাশা করে থাকলে হতাশ হয়েছিলেন তাঁরা। প্রথম মজলিস অবিলম্বে শিক্ষার মতো বিষয়ে যাজকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হ্রাস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে; পরিহাসের ব্যাপার, অসংখ্য মোল্লাহর সমর্থন লাভকারী সাংবিধানিক বিপ্লব দেশে তাঁদের ব্যাপক ক্ষমতার অবসানের সূচনা প্রত্যক্ষ করেছিল।৮৮
শিয়া উলেমা কখনওই এর আগে রাজনীতিতে এমন সক্রিয় ভূমিকা রাখেননি। কোনও কোনও পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে, তারা প্রধানত নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা ও বিধর্মী পশ্চিমকে ঠেকানোর আশা নিয়েই বেশি অনুপ্রাণিত ছিলেন। * অন্যরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, শাহগণের স্বৈরাচারী ক্ষমতা খর্ব করবে এমন একটি সংবিধানের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে অধিকতর উদার উলেমাগণ স্বৈাচারের বিরোধিতা করার প্রাচীন শিয়া দায়িত্বই পালন করছিলেন। সাধারণ সংস্কারকগণ উলেমাদের বিশাল ক্ষমতার কথা মনে রেখে বিপ্লবের সময় মুসলিম অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন, তবে যাজকদের প্রতি বহু আগে থেকেই বৈরী ভাবাপন্ন ছিলেন তাঁরা, তাই ক্ষমতা লাভ করামাত্র আইন ব্যবস্থা ও শিক্ষাকে সেক্যুলারাইজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এই সেক্যুলারাইজেশনের বিপদ শনাক্তকারীদের অন্যতম প্রথম ছিলেন তেহরানের প্রধান তিন যাজকের একজন শায়খ ফদলুল্লাহ নুরি (১৮৪৩-১৯০৯)। ১৯০৭ সালে তিনি সংবিধানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন। তিনি যুক্তি তুলে ধরেছিলেন যে, গোপন ইমামের অনুপস্থিতিতে সরকারের বৈধতা না থাকায় নতুন সংসদ অনৈসলামিক। মজলিস নয়, মুজতাহিদগণই ইমামের ডেপুটি, তাঁদেরই আইন প্রণয়ন ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা উচিত। এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে অবশ্য যাজকরা স্রেফ ‘অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো হয়ে দাঁড়াবেন, তাঁরা আর জনগণের প্রধান আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক থাকবেন না, ধর্ম বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে। নুরি দাবি জানালেন, মজলিস অন্ততপক্ষে শরীয়াহর উপর ভিত্তি করে আইন-কানুন প্রণয়ন করুক। তাঁর আপত্তির মুখে সংবিধানে সংশোধন আনা হয় : মজলিস কর্তৃক ইসলামি আইনের সাথে বিরোধিতাকারী আইনে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাসহ নির্বাচিত পাঁচজন উলেমার একটি প্যানেল গঠন করা হয়।৯১
তাসত্ত্বেও নুরি সংখ্যালঘুর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। নাজাফের বেশিরভাগ মুজতাহিদ সংবিধান সমর্থন করেছিলেন, তাঁরা সেটা অব্যাহত রাখবেন। তাঁরা গোপন ইমামের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছাড়া আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ সম্ভব নয় দাবি করে শরীয়াহকে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করার নুরির দাবির বিরোধিতা করেন। আরও একবার শিয়াহ অন্তর্দৃষ্টি রাষ্ট্রব্যবস্থার সেক্যুলারাইজেশনকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং এখনও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ধর্মের সাথে বেমানান বিবেচনা করেছে। বহু যাজক কাজারদের বিদেশীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য অর্থিক কনসেশন দিতে ও ব্যয়বহুল ঋণ গ্রহণে বাধ্য করা দরবারের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও সরকারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় বিতৃষ্ণ ছিলেন। তাঁরা লক্ষ করেছিলেন, এমনি অদূরদর্শী আচরণ মিশরকে সামরিক দখলদারির দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। কাজারদের নির্যাতনমূলক নীতিমালাকে সংবিধানের মাধ্যমে সীমিত করা সম্ভব বলে মনে হয়েছিল। এই শায়খ মুহাম্মদ হুসেইন নাইনি (১৮৫০-১৯৩৬)-এর অ্যডমোনিশন টু দ্য নেশন অ্যান্ড এক্সপোজিশন টু দ্য পিপল-এ এই দৃষ্টিভঙ্গি জোরের সাথে প্রকাশিত হয়। ১৯০৯ সালে নাজাফে এটি প্রকাশিত হয়। নাইনি যুক্তি দেখান যে, গোপন ইমামের পর প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারই সেরা উপায়; স্বৈরাচারী শাসককে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম সংসদ প্রতিষ্ঠা স্পষ্টতই শিয়াহদের উপযুক্ত কাজ। স্বৈরাচারী শাসক ইসলামের চরম পাপ বহুঈশ্বরবাদীতার (শিরক) অপরাধে অপরাধী, কারণ তিনি ঐশী ক্ষমতার প্রতি উদ্ধত আচরণ করেছেন এবং খোদ ঈশ্বরের মতো আচরণ করেছেন, যেন প্রজাকূলের অধিপতি। ফারাওর শক্তিকে ধ্বংস করার জন্যে পয়গম্বর মোজেসকে পাঠানো হয়েছিল। ফারাও জনগণের উপর নির্যাতন চালিয়েছেন, তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করেছিলেন। মোজেস তাঁকে আল্লাহর আইন মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন। একই ভাবে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের প্যানেলের সাহায্যে নতুন মজলিসকে শাহদের ঈশ্বরের আইন মানা নিশ্চিত করতে হবে।৯৩
