রিদাহ ছিলেন ইবন তাঈমিয়াহ ও আব্দ আল-ওয়াহাবের ধারার টিপিক্যাল মুসলিম সংস্কারক। আদ ফন্তেসে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বিদেশী হুমকির মোকাবিলা করতে চেয়েছেন তিনি। কেবল সালাফের-প্রথম প্রজন্মের মুসলিম-আদর্শে প্রত্যাবর্তনের ভেতর দিয়েই আধুনিক মুসলিমরা নতুন ও সজীব ইসলাম তৈরি করতে পারবে। কিন্তু রিদাহর সালাফিয়াহ আন্দোলন অতীতে দাসত্বমূলক প্রত্যাবর্তন ছিল না। আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ের অন্যান্য সংস্কারকের মতো ইসলামি প্রেক্ষাপটে স্থাপন করার মাধ্যমে আধুনিক পশ্চিমের শিক্ষা ও মূল্যবোধসমূহকে আত্মস্থ করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন তিনি। তিনি একটি সেমিনারি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যেখানে ছাত্ররা আন্তর্জাতিক আইন, সমাজবিজ্ঞান, বিশ্ব- ইতিহাস, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংগঠন এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে পারবে; আবার একই সময়ে ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্স নিয়েও গবেষণা করতে পারবে। এভাবে এক নতুন শ্রেণীর উলেমার বিকাশ ঘটবে, যারা হবে আযহারের পণ্ডিতদের বিপরীতে (রিদাহ তাদের হতাশাব্যঞ্জকভাবে পশ্চাদবর্তী মনে করতেন) সত্যিকারের সময়ের মানুষ, ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত উদ্ভাবনী ইজতিহাদের চর্চা করতে পারবে। একদিন এই নতুন উলেমার একজন হয়তো খলিফায় পরিণত হবেন।৮৪ রিদাহ মোটেই মৌলবাদী ছিলেন না; পাল্টা ডিসকোর্স সৃষ্টির বদলে ইসলাম ও আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতির বন্ধন সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন তিনি, কিন্তু তাঁর রচনা ভবিষ্যতের মৌলবাদীদের উপর প্রভাব বিস্তার করবে। জীবনের শেষ দিকে রিদাহ ক্রমবর্ধমানহারে মিশরিয় জাতীয়তাবাদীদের কাছ থেকে সরে যান। সেক্যুলারিজমকে সমাধান মনে করেননি তিনি। আতাতুর্কের নিষ্ঠুরতায় ভীত বোধ করেছেন। রাষ্ট্র চরম মূল্যে পরিণত হলে এবং একজন শাসককে জাতীর স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে বাস্তবভিত্তিক অথচ নিষ্ঠুর নীতি গ্রহণে বাধা দেওয়ার মতো কিছু না থাকলে এমনটাই কি ঘটে? রিদাহ বিশ্বাস করতেন, মধ্যপ্রাচ্যে-ক্রিশ্চান পাশ্চাত্যে যদি নাও হয়-ধর্মের অবনতির কারণেই নির্যাতন ও অসহিষ্ণুতার ঘটনা ঘটছে।*৫ অনেক নেতৃস্থানীয় মিশরিয় চিন্তাবিদ যখন ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন সেই সময়ে রিদাহ বিশ্বাস করেছিলেন যে, আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর আগের চেয়ে বেশি না হলেও সমান পরিমাণ ধর্মীয় বাধা থাকা প্রয়োজন।
মিশরের জনগণ যদি জাতীয়তাবাদই ইউরোপের সাফল্যের গোপন সূত্র বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে থাকে, ইরানিরা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোয় বিশ্বাস করেছে যে, ‘সাংবিধানিক’ সরকারই ছিল এই গোপন সূত্র। এই পর্যায়ে বহু মিশরিয়র মতো ইরানিরা পশ্চিমের মতো হতে চেয়েছে। ১৯০৪ সালে সম্প্ৰতি সাংবিধানিক সরকার বেছে নেওয়া জাপান রাশিয়ার উপর শোচনীয় পরাজয় চাপিয়ে দিয়েছিল। বহুদিন ধরেই জাপান ছিল ইরানের মতোই অজ্ঞ ও পশ্চাদপদ, সংস্কারকগণ যুক্তি দেখিয়েছেন, কিন্তু এখন সংবিধানের কল্যাণে তারা ইউরোপিয়দের মতো একই স্তরে উঠে এসেছে, এবং তাদের নিজস্ব খেলায় হারাতে পারছে। এমনকি কোনও কোনও উলেমা শাহদের স্বেচ্ছাচারী শাসন রুদ্ধ করার জন্যে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। উদার মুজতাহিদ সায়ীদ মুহাম্মদ তাবাতাবাদি যেমন ব্যাখ্যা করেছেন:
আমরা নিজেদের সাংবিধানিক শাসন দেখিনি। কিন্তু আমরা এর কথা শুনেছি, সাংবিধানিক সরকার প্রত্যক্ষকারীরা আমাদের বলেছেন যে, সাংবিধানিক শাসন দেশে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। এটা আমাদের মাঝে এক ধরনের তাগিদ ও উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।১৬
আত্মরক্ষামুলকভাবে মাদ্রাসার জগতে পিছু হটা মিশরিয় উলেমাদের বিপরীতে ইরানি উলেমাগণ প্রায়শঃই পরিবর্তনের পুরোধা ছিলেন, আসন্ন ঘটনাপ্রবাহে চূড়ান্ত ভুমিকা পালন করবেন তাঁরা।
১৯০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তেহরানের গভর্নর সরকারী নির্দেশ মোতাবেক মূল্য হ্রাস না করায় কয়েকজন চিনি ব্যবসায়ীর পায়ে আঘাত হানার নির্দেশ দেন। উচ্চ আমদানি শুল্কই উচ্চ মূল্য রাখা প্রয়োজনীয় করে তোলার যুক্তি দেখিয়েছিল তারা। প্রধানমন্ত্রী আইন আল-দৌলাহ কর্তৃক উৎখাত হওয়ার আগ পর্যন্ত উলেমা ও বাজারিদের এক বিশাল দল তেহরানের রাজকীয় মসজিদে আশ্রয় নেন। সাথে সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মোল্লাহ তাবাতাবাদিকে অনুসরণ করে একটা প্রধান উপাসনালয়ে উপস্থিত হয়ে দাবি করেন যে, শাহকে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক ‘হাউস অভ জাস্টিস’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শাহ সম্মত হন, উলেমাগণ আবার তেহরানে ফিরে যান, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি পূরণের কোনও রকম আভাস না দেওয়ায় দাঙ্গা বেধে যায়, সেখানে ও বিভিন্ন প্রদেশে দাঙ্গা বেধে যায় এবং জনপ্রিয় যাজকগণ মিম্বর থেকে সরকারের প্রচণ্ড নিন্দাবাদ উচ্চারণ করতে থাকেন, সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তোলেন তাঁরা। অবশেষে ১৯০৬ সালের জুলাই মাসে তেহরানের মোল্লাহরা কুমের উদ্দেশে গণঅভিযাত্রার আয়োজন করেন, অন্যদিকে প্ৰায় ১৪,০০০ বণিক ব্রিটিশ লিগেশনে আশ্রয় নেয়। বিক্ষোভকারীরা আইন আল-দৌলাহর বরখাস্ত করণ ও একটি মজলিসের (‘প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ’) প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে থাকে, আরও বিজ্ঞ সংস্কারকগণ মাশরুতেহ (‘সংবিধান’) নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।৮৭
