আতাতুর্কের তুরস্কের সেক্যুলারাইজেশন আগ্রাসীও ছিল। ইসলামকে ‘পাশ্চাত্যকৃত’ করে একে আইনি, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবহীন ব্যক্তিগত বিশ্বাসে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। ধর্মকে অবশ্যই রাষ্ট্রের অধীনে থাকতে হবে। বিভিন্ন সুফি ব্যবস্থাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়; সকল মাদ্রাসা ও কোরান স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়; আইন করে পাশ্চাত্য পোশাক চালু করা হয়; নারীদের বোরখা পরা ও পুরুষদের ফেয মাথায় দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। নকশবন্দি সুফি ব্যবস্থার নেতা শায়খ সাইদ সুরসি বিদ্রোহের নিতৃত্ব দিলে ইসলাম আত্মরক্ষার শেষ প্রয়াস পেয়েছিল, কিন্তু দ্রুত ও দক্ষতার সাথে আতাতুর্ক মাত্র দুই মাসে তা দমন করেন। পশ্চিমে সেক্যুলারাইজেশন মুক্তিদায়ী হিসাবে অনুভূত হয়েছিল; প্রাথমিক পর্যায়ে একে এমনকি ধার্মিক হওয়ার নতুন ও ভালো উপায় মনে করা হয়েছে। সেক্যুলারিজম ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃহত্তর সহিষ্ণুতার দিকে নিয়ে যাওয়া ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সেক্যুলারাইজেশন ছিল সহিংস ও নিপীড়নমূলক আক্রমণ। পরবর্তীকালের মুসলিম মৌলবাদীরা সেক্যুলারিজম ইসলামের বিনাশ ছিল দাবি করতে গিয়ে প্রায়শঃই আতাতুর্কের নজীর তুলে ধরবে।
মিশর তুরস্কের মতো দ্রুত স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের কোনওটাই পায়নি। প্ৰথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিশরিয় জাতীয়তাবাদীরা স্বাধীনতার দাবি তুলেছিল; ইংরেজদের উপর আক্রমণ চালানো হয়, রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়, টেলিগ্রাফের তার কেটে ফেলা হয়। ১৯২২ সালে ব্রিটেন মিশরকে কিছুমাত্রায় স্বাধীনতা দেয়। খেদিভ ফুয়াদ পরিণত হন নতুন রাজায়; মিশরকে একটি আদর্শ সংবিধান ও একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংসদীয় সংগঠন দেওয়া হয়। কিন্তু সত্যিকারের গণতন্ত্র ছিল না এটা। ব্রিটেন প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে দিয়েছিল, ফলে সত্যিকারের স্বাধীনতা বলতে কিছু ছিল না। ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে জনপ্রিয় ওয়াফদ পার্টি উদার সংবিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনটি বড় আকারের বিজয় লাভ করে, কিন্তু ব্রিটিশ বা রাজার তরফ থেকে চাপের কারণে প্রতিবারই পদত্যাগে বাধ্য হয়।” নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলো ছিল স্রেফ প্রসাধন, এই স্বাধীনতা আধুনিক চেতনার পক্ষে আবশ্যক স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলার বেলায় মিশরিয়দের কোনও কাজে আসত না। তাছাড়া, ব্রিটিশরা যতই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ছলচাতুরি খেলছিল ততই গণতান্ত্রিক আদর্শ দূষিত মনে হতে শুরু করেছিল।
তাসত্ত্বেও বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকে নেতৃস্থানীয় মিশরিয় চিন্তাবিদগণ যেন সেক্যুলার আদর্শের দিকেই ঝুঁকে ছিলেন বলে মনে হয়েছে। আব্দুহ’র অন্যতম শিষ্য লুফতি আল-সায়ীদের (১৮৭২-১৯৬৩) রচনাবলীতে ইসলাম খুবই সামান্য ভূমিকা রেখেছে। জাতীয়তাবাদের আদর্শই পাশ্চাত্যের সাফল্যের গোপন সূত্র থাকার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, ইসলামি ভিত্তিতে আধুনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ রোপন করা জরুরি মনে করেছেন। ইসলাম সম্পর্কে লুফতির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ প্রায়োগিক। ধর্ম অবশ্যই আধুনিক জাতীয় ঐকমত্য গড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু এটা অন্যান্য উপাদানের একটি মাত্র। ইসলামের বিশেষ বা ভিন্ন কিছু দেওয়ার নেই। অধিকাংশ মিশরিয় মুসলিম বলেই এটা মিশরের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হয়েছে; এটা তাদের নাগরিক গুণাবলী চর্চায় সাহায্য করবে, কিন্তু ভিন্ন সমাজে অন্য কোনও ধর্মবিশ্বাস ঠিক একাজই করবে।” আলি আব্দ আল-রাযিকের (১৮৮৮-১৯৬৬) আল-ইসলাম ওয়া উসুল আল-হুকুম (‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেসেস অভ পাওয়ার’, ১৯২৫) বইটি ছিল আরও রেডিক্যাল, এখানে যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, ইসলামের সাথে মিশরের সম্পর্ক চ্যুতি ঘটানো উচিত। তিনি যুক্তি তুলে ধরেন যে, খেলাফতের প্রতিষ্ঠানসমূহ কোরানে উল্লেখিত হয়নি আর পয়গম্বর মুহাম্মদ (স) বিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সারকার প্রধান ছিলেন না, সুতরাং সম্পূর্ণ সেক্যুলারিস্ট মিশরিয় ধরনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার বেলায় মিশরিয়দের ঠেকানোর মতো কোনও কারণ নেই।৮১
আল-রাযিকের বইয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বিশেষ করে সাংবাদিক রশিদ রিদাহ (১৮৬৫-১৯৩৫) ঘোষণা করেছিলেন যে, এই ধরনের চিন্তাভাবনা কেবল মুসলিম জাতির ঐক্যই দুর্বল করবে না বরং তাদের আরও সহজে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের শিকারে পরিণত করবে। সেক্যুলার পথ বেছে নেওয়ার বদলে রিদাহই প্রথম শরীয়াহ ভিত্তিক সম্পূর্ণ আধুনিকায়িত ইসলামি রাষ্ট্রের কথা উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা আল-খালিফা (১৯২২-২৩)-য় খেলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। রিদাহ ছিলেন আব্দুহর জীবনীকার ও বিশাল ভক্ত, কিন্তু পাশ্চাত্য ভাবনা সম্পর্কে ব্যাপক ওয়াকিবহাল হলেও তিনি কখনওই আব্দুহর মতো ইউরোপিয়দের সাথে স্বচ্ছন্দ বোধ করেননি। খেলাফত প্রয়োজন, কারণ তা মুসলিমদের কার্যকরভাবে পশ্চিমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করবে, কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। একটা সত্যিকারের আধুনিক খেলাফত প্রতিষ্ঠার আগে প্রস্তুতির দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। রিদাহ ভবিষ্যৎ খলিফাকে একজন মহান মুজতাহিদ হিসাবে কল্পনা করেছেন, যিনি ইসলামি আইনে এতটাই বিশেষজ্ঞ হবেন যে, শরীয়াহকে শিথিল না করেই একে আধুনিক করতে সক্ষম হবেন। এভাবে তিনি মুসলিমদের সত্যিকার অর্থে পালন করার মতো আইন-কানুন সৃষ্টি করতে পারবেন, কারণ সেগুলো সত্যিকার অর্থেই বিদেশ থেকে আমদানি করার বদলে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ভিত্তিক হবে।৮২
