কিন্তু এর জন্যে সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে নির্বাসিত ইহুদিরা জানতে পারে, প্রচলিত ইহুদি ধর্মমত তাদের জন্যে কিছুই করেনি। বিপর্যয়কে নজীরবিহীন মনে হয়েছে। তারা আবিষ্কার করে যে, পুরোনো ধার্মিকতা আর কাজে আসছে না। কেউ কেউ মেসিয়ানিজমের আশ্রয় নিয়েছে। শত শত বছর ধরে একজন মেসায়াহর অপেক্ষা করে আসছিল ইহুদিরা: রাজা ডেভিডের বংশে একজন মনোনীত রাজা, যিনি তাদের দীর্ঘ নির্বাসনের অবসান ঘটাবেন, আবার প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন তাদের। ইহুদিদের কিছু কিছু ঐতিহ্যে মেসায়াহর আবির্ভাবের ঠিক আগের একটা পর্যায়ে উত্তাল এক পর্বের উল্লেখ ছিল। বালকানে আশ্রয় নেওয়া কোনও কোনও সেফারদিক নির্বাসিতের কাছে মনে হয়েছে যে, ওদের উপর ও ইউরোপে তাদের আরও অসংখ্য স্বজাতির উপর নেমে আসা এই ভোগান্তি ও নিপীড়ন কেবল একটা জিনিসই তুলে ধরতে পারে: এটা নিশ্চয়ই পয়গম্বর ও সাধুদের মুখে উচ্চারিত সেই বিচারের কাল, একে তারা ‘মেসায়াহর প্রসব বেদনা’ আখ্যায়িত করেছে, কারণ এই যন্ত্রণাদায়ক মুক্তির ভেতর দিয়েই আবির্ভাব ঘটবে নতুন জীবনের। অন্য যারা আধুনিকতার আগমনে তাদের জগৎ ধ্বংস হয়ে গেছে মনে করেছিল, তারাও মিলেনিয়াল আশার বিকাশ ঘটাবে। কিন্তু মেসিয়ানিজম সমস্যা-সঙ্কুল, কারণ এপর্যন্ত একজন অত্যাসন্ন ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের আশা পোষণ করা প্রতিটি মেসিয়ানিক আন্দোলনই হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে। সেফারদিক ইহুদিরা আরও সন্তোষজনক সমাধান বের করে এই টানাপোড়েন এড়িয়ে গেছে। এক নতুন মিথোস গড়ে তোলে তারা।
সেফারদিকদের একটা দল বালকান্স থেকে প্যালেস্তাইনে পাড়ি জমিয়েছিল। এখানে গালিলির সেফেদে বসতি গড়ে তারা। কিংবদন্তী প্রচলিত ছিল যে, মেসায়াহর আবির্ভাব ঘটার সময় গালিলিতেই নিজেকে প্রকাশ করবেন তিনি। সবার আগে তাঁকে স্বাগত জানাতে সেখানে হাজির থাকতে চেয়েছিল স্পেনিয় নির্বাসিতরা।” তাদের কেউ কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, একজন সাধুসুলভ শীর্ণ অ্যাশকেনাযিয় ইহুদি ইসাক লুরিয়ার (১৫৩৪-৭৩) মাঝে তাঁকে পেয়েছে। সেফেদে বসতি গেড়েছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম নতুন এই মিথ উল্লেখ করেন। এভাবে তিনি এক নতুন ধরনের কাব্বালাহর প্রতিষ্ঠা করেন যা এখনও তাঁর নাম ধারণ করে আছে। আমরা আধুনিকরা বলব যে, খোদ লুরিয়াই এই মিথ সৃষ্টি করেছিলেন, মানুষের অবচেতনে আকাঙ্ক্ষা ও ভীতির সাথে যারপরনাই নিবিড়ভাবে অভ্যস্ত থাকায় এমন একটি কাল্পনিক কাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিলেন তিনি যা কেবল সেফেদের নির্বাসিতদের মাঝেই নয় বরং গোটা পৃথিবীর ইহুদিদের মাঝে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করতে পেরেছিল। কিন্তু আমাদের এমন কথা বলার কারণ, মূলত আমরা যৌক্তিক ভিত্তিতে কথা বলে থাকি। ফলে প্রাক-আধুনিক পৌরাণিক বিশ্বদৃষ্টিতে প্রবেশ কঠিন আবিষ্কার করি। লুরিয়ার শিষ্যরা তিনি সৃষ্টির এই মিথ তৈরি করেছেন’ মনে করেনি, বরং তারা মনে করেছে মিথটি নিজেই তাঁর মাঝে নিজেকে প্রচার করেছে। লুরিয়ানিক কাব্বালাহর আচার ও অনুশীলনে অভ্যস্ত নয় এমন কোনও বহিরাগতের কাছে এই সৃষ্টি-কাহিনী আজগুবী ঠেকে। তার উপর এই কাহিনীর সাথে বুক অভ জেনেসিসের সৃষ্টি কাহিনীর কোনওই মিল নেই; কিন্তু একজন কাব্বালিস্ট সেফেদের কাছে-লুরিয়া নির্দেশিত আচার ও ধ্যানমূলক অনুশীলনে মগ্ন, কিন্তু তারপরও নির্বাসনের পুরো এক প্রজন্ম পরেও সেই ঘটনার ধাক্কায় দিশাহারা-মিথোস নিখুঁত অর্থ প্রকাশ করেছে। এটা এমন এক সত্যকে তুলে ধরেছে বা ‘উন্মুক্ত’ করেছে যা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল বটে কিন্তু প্রাক-আধুনিক কালের ইহুদিদের অবস্থার সাথে এমন জোরের সাথে সাড়া দিয়েছে যে নিমেষে কর্তৃত্ব লাভ করেছে। তাদের অন্ধকার জগৎকে আলোকিত করে তুলেছে এটা ও জীবনকে কেবল সহনীয় নয়, আনন্দময়ও করে তুলেছে। লুরিয়া সৃষ্টি মিথের মুখোমুখি হওয়ামাত্র একজন আধুনিক মানুষ জানতে চাইবে, ‘সত্যিই কি এমনটা ঘটেছিল?’ ঘটনাপ্রবাহকে এতটাই অসম্ভব মনে হয় এবং যার প্রমাণ করা যাবে না বলে একে আমরা প্রমাণের দিক থেকে মিথ্যা হিসাবে নাকচ করে দেব। কিন্তু তার কারণ আমরা কেবল সত্যির যৌক্তিক ভাষ্যকে গ্রহণ করে থাকি বলে, আরও কোনও ধরন থাকতে পারার বোধ হারিয়ে ফেলায়। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ গড়ে তুলেছি, একে আমরা অসাধারণ সব ঘটনার পর্যায়ক্রমিক সংঘটন হিসাবে দেখি। কিন্তু প্রাক-আধুনিক বিশ্বে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাকে একক হিসাবে নয়, চিরন্তন বিধানের নজীর, সময়হীন স্থির বাস্তবতার প্রকাশ হিসাবে দেখা হত। কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা বারবার সংঘটিত হওয়ার কথা ছিল, কেননা সকল পার্থিব ঘটনাপ্রবাহই অস্তিত্বের মৌল বিধান প্রকাশ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলে একটি নদী অলৌকিকভাবে অন্তত দুটি ঘটনায় দুই ভাগ হয়ে ইসরায়েলিদের এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়েছে: ইসরায়েলের সন্তানগণ প্রায়শঃই মিশরে ‘যাতায়াত করে’ এবং তারপর প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরতি যাত্রা শুরু করে। বাইবেলের অন্যতম পৌনঃপৌনিক ঘটনা নির্বাসন। স্পেনিয় বিপর্যয়ের পর যা গোটা ইহুদি অস্তিত্বকে রঞ্জিত করেছে বলে মনে হয়েছে এবং অস্তিত্বের একেবারে মূল ভিত্তিতে ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। লুরিয়ানিক কাব্বালাহ সকল মিথোলজির বেলায় অবশ্যাম্ভাবী এইসব মৌল বিধানের অন্যতম মনে হওয়া নির্বাসনকে পরখ করে এর পূর্ণ তাৎপর্য উন্মোচনের জন্যে সূচনায় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সমস্যার মোকাবিলা করেছে।
