কিন্তু পশ্চিমের আগুদাতের সদস্যরা আন্দোলনকে রাশিয়ান ও পোলিশ ইহুদিদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখেছিল, প্রত্যক্ষ কর্মতৎপরতার ব্যাপারে তখনও খুবই সতর্ক বোধ লালন করছিল তারা। রাশিয়া ও পোল্যান্ডের ইহুদিরা আগুদাতকে স্রেফ একটা আত্মরক্ষামূলক সংগঠন হিসাবে দেখেছে; এর কাজ স্রেফ পূর্ব ইউরোপের সরকারের আধুনিকায়নের প্রয়াস পাওয়ার এমনি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইহুদিদের স্বার্থ রক্ষা করা। কর্মকাণ্ডকে একেবারে ন্যূনতম পর্যায়ে সীমিত রাখে তারা, আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোয় ইহুদিদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে, যায়নাবাদকে পরিহার করে ও পোলিশ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রচার করে। কিন্তু পশ্চিমে, আধুনিকায়ন যেখানে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল, ভিন্ন কিছুর জন্যে তৈরি ছিল ইহুদিরা। পশ্চিমের বেশির ভাগ আগুদাত সদস্য ছিল নিও-অর্থডক্স, এটা নিজেই ছিল ইহুদিবাদের আধুনিকায়িত ধরন। আধুনিক বিশ্বের সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল তারা, তারা কেবল এই নতুনের ধাক্কা সামাল দিতে চাওয়ার বদলে বরং একে বদলে দিতে চেয়েছে। দলকে একটি আত্মরক্ষামূলক সংগঠন হিসাবে না দেখে কেউ কেউ চেয়েছে আগুদাত আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করুক, এক প্রাথমিক মৌলবাদের বিকাশ ঘটাচ্ছিল তারা।
জ্যাকব রোসেনহেইমের (১৮৭০-১৯৬৫) চোখে আগুদাতের প্রতিষ্ঠা পুবের ইহুদিদের মতো কেবল কিছুটা অনুশোচনাযোগ্য প্রয়োজনীয়তা ছিল না, বরং এক মহাজাগতিক ঘটনা। ৭০ সিই-র পর এই প্রথমবারের মতো ইহুদিরা ‘একটা ঐক্যবদ্ধ ও ইচ্ছা-নির্ধারক কেন্দ্র’৭৫ লাভ করেছে। আগুদাত ইসরায়েলের উপর ঈশ্বরের শাসনকে প্রতীকায়িত করে, এর ইহুদি বিশ্বের কেন্দ্রে পরিণত হওয়া উচিত। তা সত্ত্বেও রাজনীতির ব্যাপারে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন রোসেনহেইম, তিনি চেয়েছিলেন আগুদাত ইহুদিদের স্কুল রক্ষণাবেক্ষণ ও ইহুদিদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার কাজে নিজেকে সীমিত রাখুক। তরুণ সদস্যরা ছিল আরও রেডিক্যাল, প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীদের অনেক কাছাকাছি ছিল তাদের চেতনা। ইসাক ব্রুয়ার (১৮৮৩-১৯৪৬) চেয়েছিলেন ইহুদি সমাজের সংস্কার ও সেক্যুলারাইজেশনের লক্ষ্যে আগুদাত উদ্যোগ নিয়ে প্রচারণায় নামুক। প্রিমিলেনিয়লিস্টদের মতো বিশ্বে ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডের ‘নিদর্শন’ দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। মহাযুদ্ধ ও বেলফোর ঘোষণা ‘মেসায়াহর পদক্ষেপ’ ছিল। ইহুদিদের অবশ্যই বুর্জোয়া সমাজের দূষিত মূল্যবোধকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, ইউরোপের সরকারগুলোর সাথে আর সহযোগিতা করা যাবে না, পবিত্র ভূমিতে তাদের নিজস্ব পবিত্র ছিটমহল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তারা তোরাহ ভিত্তিক ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে। ইহুদি ইতিহাস ওলটপালট হয়ে গেছে। পবিত্ৰ ঐতিহ্য থেকে ইহুদিরা বিচ্যুত হয়েছে। এখন সময় এসেছে ইতিহাসকে ফের আগের পথে ফিরিয়ে নেওয়ার; ইহুদিরা প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে দুর্নীতিগ্রস্ত ডায়াসপোরা থেকে নির্বাসনে গেলে ও নিজস্ব ভূমিতে তোরাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করে আদি মূল্যবোধে ফিরে গেলে ঈশ্বর মেসায়াহকে প্রেরণ করবেন।৭৬
ইহুদি পণ্ডিত অ্যালান এল. মিটেলমান উল্লেখ করেছেন যে, আগুদাতের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা মৌলবাদের কাজের ধারা তুলে ধরে। এটা আধুনিক সেক্যুলার সমাজের প্রতি কোনও অবিলম্ব প্রবল ধরনের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং আধুনিকায়ন বেশ কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পরেই এর বিকাশ ঘটে। প্রথম প্রথম ঐতিহ্যবাদীরা- আগুদাতের পূর্ব ইউরোপিয় সদস্যদের মতো-স্রেফ নতুন চ্যালেঞ্জের সাথে নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে। তারা কিছু কিছু আধুনিক ধারণা ও প্রতিষ্ঠানকে গ্রহণ করে, প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে এসব ট্র্যাডিশনের পক্ষে নতুন নয়, ধর্মবিশ্বাস এইসব পরিবর্তন আত্মস্থ করে নেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি রাখে। কিন্তু সমাজ যখন আরও অধিকতরভাবে সেক্যুলার ও যৌক্তিক হয়ে ওঠে, কেউ কেউ তখন এর উদ্ভাবনসমূহকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে। তারা বুঝতে শুরু করে সেক্যুলার আধুনিকতার সম্পূর্ণ ধাক্কা রক্ষণশীল প্রাক আধুনিক ধর্মের ছন্দের সম্পূর্ণ বিপরীত, এটা অত্যাবশ্যক মূল্যবোধকে হুমকি দিচ্ছে। তখন তারা ‘মৌলবাদী’ সমাধান খুঁজে বের করে যা প্রথম নীতিমালায় ফিরে যায় এবং পাল্টা হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
*
আমাদের বিবেচনাধীন মুসলিমরা তখনও এই পর্যায়ে পৌঁছেনি। মিশরে আধুনিকায়ন শেষ হতে তখনও ঢের বাকি ছিল, আর ইরানে সেভাবে শুরুই হয়নি। মুসলিমরা তখনও হয় ইসলামি পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ধ্যানধারণাকে আত্মস্থ করার প্রয়াস পাচ্ছিল বা সেক্যুলারিস্ট আদর্শ গ্রহণ করছিল। এইসব প্রাথমিক কলাকৌশল কোনও কোনও মুসলিমের চোখে অপর্যাপ্ত প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বে মৌলবাদের আবির্ভাব ঘটবে না। তারা সেক্যুলারিজমকে ইসলাম ধ্বংসের একটি প্রয়াস মনে করবে এবং প্রকৃতপক্ষে বিদেশী প্রেক্ষাপটেই মধ্যপ্রাচ্যে বাস্তবায়িত হতে চলা পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে প্রায়শঃই সত্যিকার অর্থেই আক্রমণাত্মক মনে হয়েছে।
নব্য সেক্যুলার রাষ্ট্র তুরস্কে এটা একেবারেই স্পষ্ট ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির পক্ষে যুদ্ধ অংশগ্রহণকারী অটোমান সাম্রাজ্য ইউরোপিয় মিত্রপক্ষের কাছে পরাস্ত হয়, সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন করে প্রাচীন অটোমান প্রদেশগুলোয় ম্যান্ডেট ও প্রটেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করে তারা। আনাতোলিয়া ও প্রাচীন অটোমান প্রাণকেন্দ্ৰে আগ্রাসন চালায় গ্রিকরা। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১-১৯৩৮) স্বাধীনতার লড়াইতে তুর্কি জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্ব দেন। তিনি ইউরোপিয়দের তুরস্ক থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হন এবং আধুনিক ইউরোপিয় কায়দায় পরিচালিত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামি বিশ্বে নজীর বিহীন পদক্ষেপ ছিল এটা। ১৯৪৭ সাল নাগাদ তুরস্ক একটি দক্ষ আমলাতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির অধিকার লাভ করে, পরিণত হয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। কিন্তু এই সাফল্য শুরুই হয়েছিল এক জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের সাথে। ১৮৯৪ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৭ সালের ভেতর অটোমান ও তুর্কি সরকারের ধারাগুলো পদ্ধতিগতভাবে বিদেশী উপাদানের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে আনাতোলিয়ার গ্রিক ও আর্মেনিয়দের বহিষ্কার, দেশান্তর বা হত্যা করে, এরা ছিল বুর্জোয়া সমাজের শতকরা ৯০ ভাগ। এই শুদ্ধিকরণ নতুন রাষ্ট্রকে কেবল স্পষ্ট তুর্কি জাতীয় পরিচয়ই দেয়নি, বরং আতাতুর্ককে সম্পূর্ণ তুর্কি বাণিজ্যিক শ্রেণী নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে যা তাঁকে আধুনিক শিল্পায়িত অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ৭৮ অন্ততপক্ষে এক মিলিয়ন আর্মেনিয়র হত্যাকাণ্ড ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম গণহত্যা, এবং র্যাবাই কুকের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ ক্রুসেড ও ধর্মের নামে পরিচালিত শুদ্ধি অভিযানের মতোই সমান ভয়ঙ্কর ও নিশ্চিতভাবেই বিপজ্জনক হতে পারে।
