রক্ষণশীল যুগের শৃঙ্খলার প্রতি নিবেদিত কুক চাননি তাঁর মিথ কোনও আদর্শ বা কর্মকাণ্ডের নীলনকশায় রূপান্তরিত হোক। সে যাই হোক, তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, জীবদ্দশায় তাঁকে অনেকটা উন্মাদ ঠাওড়ানো হয়েছিল। কুক প্যালেস্তাইনে যায়নবাদীদের কর্মকাণ্ডের চলমান সমস্যাগুলোর কোনও রাজনৈতিক সমাধান দেননি। ঈশ্বরের কাছে সবকিছু তৈরি রয়েছে। ভবিষ্যতের ইহুদি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধরন সম্পর্কে কুক যেন নিদারুণভাবে নিস্পৃহ ছিলেন। ‘আমার দিক থেকে বলতে পারি, আমি পবিত্রতায় প্রোথিত আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু নিয়েই বেশি ভাবিত,’ ছেলে ভি ইয়েহুদাকে (১৮৯১–১৯৮১) লিখেছিলেন তিনি। ‘আমার কাছে এটুকু পরিষ্কার, সরকারী পর্যায়ের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, আত্মা শক্তিশালী হলে তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছে দিতে পারবে, কারণ মুক্ত, উজ্জ্বল পবিত্রতার মহান প্রকাশের ভেতর দিয়ে আমরা সরকারের চলার পথকে আলোকিত করে তুলতে পারব।’৭১ বর্তমান নিষ্কৃতিহীন যুগে রাজনীতি দূর্নীতিগ্রস্ত, নিষ্ঠুর। ‘অশুভ কালের শাসনের ভয়ঙ্কর বৈষম্য’ দেখে বিতৃষ্ণ ছিলেন কুক। সৌভাগ্যক্রমে ৭০ সিইতে পবিত্র ভূমি হারিয়ে নির্বাসনে যাবার পর ইহুদিরা আর রাজনৈতিক ভুমিকা পালন করতে পারেনি; পৃথিবী নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত ইহুদিদের উচিত রাজনীতির বাইরে থাকা। ‘যতক্ষণ রক্তপাতের ঘটনা ঘটছে, যতক্ষণ এখানে দুষ্টবুদ্ধির প্রয়োজন থাকছে, জ্যাকোবের সরকারে সংশ্লিষ্ট হওয়া চলবে না।’ তবে অচিরেই ‘বিশ্ব পরিশুদ্ধ হবে, এবং সেটা যখন ঘটবে, ইহুদিরা তাদের ইচ্ছামতো রাজনীতি ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারবে। ‘ঈশ্বরের সকল জাতি যখন কোনও নিশ্চিত উপায়ে তাদের দেশে থিতু হবে, তখন একে খাঁদ মুক্ত করতে, এর মুখ থেকে রক্ত মুছে ফেলতে জন্যে ও দাঁতের ফাঁক থেকে সকল আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্যে [ভূ]রাজনৈতিক বলয়ে নজর দিতে পারবে তারা। প্রাক আধুনিক বিশ্বে মিথের বাস্তবক্ষেত্রে অনূদিত হওয়ার কথা ছিল না; সেটা ছিল লোগোসের কাজ—কুকের প্রকল্পে-অগ্রগামীদের
কুকের এখনও ধারণা বর্তমান কালে রাজনীতি ও ধর্ম পরস্পর মানানসই নয়, অর্থডক্স বিশ্বে এই বিশ্বাস টাবুর শক্তি ধারণ করেছিল। ধর্মকে পরিত্যাগকারী যায়নবাদীরা সমস্ত বাস্তব কাজ করছিল।
ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার তের বছর আগে, ১৯৩৫ সালে মারা যান কুক। আরব প্যালেস্তাইনে নিজেদের একটা রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্যে ইহুদিরা কী ভয়ঙ্কর কলাকৌশলের ভেতর দিয়ে যাবার অনুভূতি বোধ করেছে সেটা দেখার জন্যে বেঁচে ছিলেন না। তিনি কোনওদিনই ১৯৪৮ সালে স্বদেশভূমি থেকে ৭৫০,০০০ প্যালেস্তাইনের উৎখাত প্রত্যক্ষ করেননি, আরব ইসরায়েল যুদ্ধে আরব ও ইহুদিদের রক্ত ঝরতেও দেখেননি। তাঁকে ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির পঞ্চাশ বছর পরে পবিত্র ভূমির অধিকাংশ ইহুদি এখনও সেক্যুলারিস্ট রয়ে যাওয়ার বাস্তবতাও প্রত্যক্ষ করতে হয়নি। তাঁর ছেলে ভি ইয়েহুদা এইসব ব্যাপার প্রত্যক্ষ করবেন, এবং বুড়ো বয়সে বাবার মিথোসকে বাস্তব, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করে মৌলবাদী আন্দোলন গড়ে তুলবেন।
কিন্তু এই ভীষণ সময়ে ইহুদিদের পক্ষে রাজনৈতিক জীবন বজায় রাখা কি সম্ভব ছিল? আধুনিক সমাজ কেবল ক্রমবর্ধমান হারে অ্যান্টি-সেমিটিক হয়ে উঠছিল না, বরং সেক্যুলারিজম ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরে ভীষণভাবে ঢুকে পড়ছিল, প্রচলিত জীবনধারাকে করে তুলছিল অচল। পূর্ব ইউরোপে আধুনিকায়ন সূচিত হচ্ছিল মাত্র। রাশিয়া ও পোল্যান্ডের কিছু সংখ্যক র্যাবাই নতুন বিশ্বের দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখে নিজেদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কেমন করে ইহুদি পদবাচ্য কেউ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আধুনিক রাজনৈতিক জীবনের অবিশ্যিক অংশ দরকষাকষি ও আপোসে অংশ নিতে পারে? জেন্টাইলদের সাথে চুক্তি করে ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিয়ে ইহুদিরা সম্প্রদায়ে অপবিত্র বিশ্বকে ডেকে আনবে; অনিবার্যভাবে একে তা দূষিত করবে। কিন্তু মহান মিসনাগদিক ইয়েশিভোত ও পোলিশ শহর গারের হাসিদিম দ্বিমত পোষণ করে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে বিভিন্ন যায়নাবদী দল ও ইহুদি সমাজতান্ত্রিক দল ইহুদিদের এক ঈশ্বরবিহীন জীবনে প্রলুব্ধ করে চলেছে। সেক্যুলারিজমের দিকে এই স্রোত ও মিশেল রুদ্ধ করতে চেয়েছিল তারা। তারা বিশ্বাস করত এইসব আবিশ্যিকভাবে বিপজ্জনক আধুনিক বিপদগুলোকে তাদের কায়দাতেই আধুনিক উপায়ে মোকাবিলা করতে হবে। ধার্মিক ইহুদিদের অবশ্যই সেক্যুলারিস্টদের বিরুদ্ধে তাদের অস্ত্র দিয়েই লড়তে হবে। এর মানে ছিল অর্থডক্স স্বার্থ রক্ষার জন্যে একটা আধুনিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা। তারা যুক্তি দেখাল, এটা মোটেই আনকোরা কোনও ধারণা নয়। কিছু সময়ের জন্যে রাশিয়া ও পোল্যান্ডের ইহুদিরা ইহুদি সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা ও কল্যাণের জন্যে সরকারের সাথে শ্াদলানাত (রাজনৈতি সংলাপ বা আলোচনা)-এ যোগ দিয়েছিল। নতুন অর্থডক্সি পার্টি এই কাজটিই অব্যাহত রাখবে, তবে আরও দক্ষ ও সংগঠিতভাবে।
১৯১২ সালে মিসনাগদিক রোশি ইয়েশিভোত ও গার হাসিদিম একটা নতুন দল আগুদাত ইসরায়েল (‘দ্য ইউনিয়ন অভ ইসরায়েল’) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯০১ সালে র্যাবাই ইসাক জ্যাকব রেইনস (১৮৩৯-১৯১৫) প্রতিষ্ঠিত ‘ধার্মিক যায়নবাদীদের’ সংগঠন মিযরাচির সদস্যরা এতে যোগ দেয়। মিযরাচি প্যালেস্তাইনে সেক্যুলার যায়নাবাদী উদ্যোগকে গভীরভাবে ধর্মীয় বিকাশ বিবেচনাকারী র্যাবাই কুকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও কম রেডিক্যাল ছিল। আরও কঠোর অর্থডক্স রেইনস একমত পোষণ করেননি: যায়নবাদীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে ধর্মীয় কোনও তাৎপর্য জড়িত নেই, তবে ইহুদি স্বদেশ ভূমির সৃষ্টি নির্যাতিত মানুষের পক্ষে বাস্তব সম্মত সমাধান, সেকারণে অর্থডক্সদের সমর্থনের দাবিদার। প্যালেস্তাইনে এক সময় একটা দেশ প্রতিষ্ঠিত হলে, মিরযাচির দৃষ্টিতে তা হয়তো আধ্যাত্মিক নবায়নের দিকে চালিত করবে ও সেখানে তোরাহর আন্তরিক অনুসরণ ঘটাবে। ১৯১১ সালে অবশ্য প্যালেস্তাইনে ধর্মীয় স্কুল পরিচালনার জন্যে কংগ্রেস সমপরিমাণ তহবিল বরাদ্দ দিতে ব্যর্থ হলে মিযরাচির প্রতিনিধিরা বাসেলে অনুষ্ঠিত, দশম যায়নিস্ট কংগ্রেস থেকে বের হয়ে আসেন। রেডিক্যাল সেক্যুলারিজমের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ মনে হওয়া মূলধারার যায়নবাদের সাথে সহযোগিতা করতে না পারায় অচিরেই পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপে শাখা বিস্তারকারী আগুদাত ইসরায়েলের সাথে গাটছড়া বাঁধতে তৈরি ছিল তারা।
